সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত ‘নবম জাতীয় পে স্কেল-২০২৬’ কার্যকরের আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয়েছে| নতুন এই বেতন কাঠামোর রেজুলেশন বিজি প্রেস থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পৌঁছানোর পর তা বর্তমানে আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিং বা আইনগত পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে| আইন মন্ত্রণালয়ের এই নিরীক্ষা প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ামাত্রই একটি সুনির্দিষ্ট এসআরও বা সংবিধিবদ্ধ আদেশ নম্বর বরাদ্দ করে সরকারি প্রজ্ঞাপন বা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে| সরকারের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, প্রশাসনিক কোনো বিলম্ব ছাড়াই দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই প্রজ্ঞাপন জারি করতে সব ধরনের প্রস্তুতি রাখা হয়েছে| এর আগে সরকারের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম মন্ত্রিসভার বৈঠকে নতুন এই পে স্কেলের অনুমোদন দেওয়া হয় এবং নতুন বেতন কাঠামোর আনুষ্ঠানিক কার্যকারিতা নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে|
প্রস্তাবিত নতুন জাতীয় বেতন স্কেলে সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রচলিত মোট ২০টি গ্রেডের বিদ্যমান কাঠামো অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে| তবে প্রতিটি গ্রেডের জন্যই মূল বেতন বা বেসিকের অংকে এক অভাবনীয় উল্লম্ফন ঘটানো হয়েছে| এবারের কাঠামোতে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের, যাতে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত মূল্যস্ফীতির ধাক্কা কিছুটা হলেও সামলানো সম্ভব হয়| শতাংশের হিসাবে সর্বোচ্চ বেতন বৃদ্ধি পেতে যাচ্ছে সর্বনিম্ন অর্থাৎ ২০তম গ্রেডে| এই গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন বর্তমানের ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাফে ২০ হাজার টাকায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে, যা প্রায় ১৪২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে| অন্যদিকে প্রথম গ্রেডের শীর্ষ কর্মকর্তাদের প্রারম্ভিক মূল বেতন বিদ্যমান ৭৮ হাজার টাকা থেকে দ্বিগুণ বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে| নীতি বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিত্যপণ্যের লাগামহীন দাম বৃদ্ধির কারণে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা যে আশঙ্কাজনক হারে কমে গিয়েছিল, সেই অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়েই তৃণমূলের পদগুলোতে বেতন বৃদ্ধির অনুপাত তুলনামূলক অনেক বেশি রাখা হয়েছে|
তবে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা এবং কোষাগারের ওপর তাৎক্ষণিক চাপ সামাল দিতে পুরো বর্ধিত বেতন একবারে কার্যকর করা হচ্ছে না| বেতন বৃদ্ধির এই অতিরিক্ত অর্থ মূলত তিন ধাপে সরকারি কর্মচারীদের বেতনের সঙ্গে যুক্ত করার একটি সুনির্দিষ্ট কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে| কাঠামো অনুযায়ী, দশম থেকে শুরু করে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য মূল বেতনের বাড়তি অংশের অর্ধেক অর্থাৎ ৫০ শতাংশ প্রথম ধাপে ছাড় দেওয়া হবে| এরপর দ্বিতীয় ধাপে ২৫ শতাংশ এবং পরবর্তী তৃতীয় ধাপে অবশিষ্ট ২৫ শতাংশ অর্থ যোগ করা হবে| বিপরীতে প্রথম থেকে নবম গ্রেডের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে মূল বেতনের বর্ধিত অংশের ৪০ শতাংশ কার্যকর হবে প্রথম ধাপে| এরপর বাকি অর্থের ৩০ শতাংশ দ্বিতীয় ধাপে এবং অবশিষ্ট ৩০ শতাংশ তৃতীয় ধাপে যুক্ত হবে|
এই ধাপে ধাপে বেতন বৃদ্ধির হিসাবটি স্পষ্ট বোঝা যায় নির্দিষ্ট গ্রেডের পর্যালোচনায়| যেমন ২০তম গ্রেডের ক্ষেত্রে ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে যখন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা হবে, তখন অতিরিক্ত যে ১১ হাজার ৭৫০ টাকা দাঁড়ায়, তার ৫০ শতাংশ হিসেবে প্রথম দফায় মূল বেতনের সাথে যোগ হবে ৫ হাজার ৮৭৫ টাকা| এর ফলে প্রথম ধাপেই ওই কর্মচারীর নতুন মূল বেতন গিয়ে দাঁড়াবে ১৪ হাজার ১২৫ টাকায়| এরপর বাকি অর্থ দুই দফায় ২ হাজার ৯৩৭ টাকা ৫০ পয়সা করে যোগ হয়ে পূর্ণাঙ্গ ২০ হাজার টাকার কোটা পূর্ণ করবে| একইভাবে প্রথম গ্রেডের ক্ষেত্রে বর্তমান ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকায় উন্নীত করার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ৭৮ হাজার টাকার ৪০ শতাংশ হিসেবে প্রথম দফায় যুক্ত হবে ৩১ হাজার ২০০ টাকা| অবশিষ্ট অর্থ পরবর্তী দুই ধাপে ২৩ হাজার ৪০০ টাকা করে সমন্বয় করা হবে| সরকারের বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, মূল বেতনের এই বর্ধিত অংশ ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ১ জুলাই পর্যন্ত এক বছরের ব্যবধানে তিন ধাপে পুরোপুরি বাস্তবায়িত হবে| অন্যদিকে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও যাতায়াতসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার বর্ধিত ভাতা একযোগে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে প্রদান করার রূপরেখা রাখা হয়েছে|
বর্তমানে দেশে প্রায় ১৪ লাখের মতো নিয়মিত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত আছেন এবং এর বাইরে অবসরপ্রাপ্ত পেনশনভোগীর সংখ্যা প্রায় ৯ লাখের কাছাকাছি| চলতি অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেতন ও আনুষঙ্গিক ভাতা মেটাতেই সরকারের বরাদ্দ রয়েছে ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা| এর সঙ্গে অবসরকালীন সুবিধা যেমন পেনশন ও গ্র্যাচুইটি যোগ করলে এ খাতে সরকারের সামগ্রিক বার্ষিক ব্যয়ের পরিমাণ গিয়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকারও বেশি| এমন এক সময়ে নতুন এই পে স্কেল বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে যখন রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি চলছে এবং ব্যাংকিং খাত চরম তারল্য সংকটে ভুগছে| ফলে রাজস্ব খাতে বড় কোনো চমক দেখাতে না পারলে নতুন স্কেলের এই বিপুল ব্যয় নির্বাহ করা রাষ্ট্রীয় কোষাগারের জন্য এক বিরাট অর্থনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়াবে|
এদিকে নতুন পে স্কেলের সার্বিক অর্থনৈতিক অভিঘাত নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদরা| তাঁদের মতে, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হলে সমাজে আয়বৈষম্যের এক নতুন ও বিপজ্জনক ব্যবধান তৈরি হতে পারে| দেশের মোট শ্রমশক্তির একটি বড় অংশ যেখানে বেসরকারি ও অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত, সেখানে সরকারি খাতের আয় বিপুলভাবে বৃদ্ধি পেলে সামাজিক অসন্তোষ বাড়ার ঝুঁকি থাকে| এছাড়া সরকারি কর্মচারীদের হাতে হঠাৎ করে বিপুল পরিমাণ বাড়তি অর্থের প্রবাহ তৈরি হলে বাজারে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার চাহিদা রাতারাতি বেড়ে যাবে| বর্তমান সরবরাহ চেইনের সীমাবদ্ধতার মধ্যে এই বাড়তি চাহিদার বিপরীতে পণ্য ও সেবার সরবরাহ দ্রুত বাড়ানো সম্ভব না হলে জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি আরও অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ার তীব্র ঝুঁকি রয়েছে| বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন যে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রকৃত আয়ের যে ক্ষয় হয়েছে তা পূরণ করার যৌক্তিকতা অবশ্যই রয়েছে; কিন্তু কেবল একটি বিশেষ সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর আয় বৃদ্ধি করলেই সংকট কাটবে না| বরং বেসরকারি খাত এবং অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে নিয়োজিত কোটি কোটি সাধারণ নাগরিকের আয় কীভাবে মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাড়ানো যায়, সে ব্যাপারে সরকারকে সমান্তরাল নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে|