দেশের শিল্প উৎপাদনের প্রধান প্রাণকেন্দ্রগুলো জুড়ে জ্বালানি গ্যাসের চরম সংকটে এক ভয়াবহ স্থবিরতা নেমে এসেছে। সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ এবং ময়মনসিংহের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা সচল থাকা কারখানাগুলোতে এখন উৎপাদন প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে পাইপলাইনে যেখানে কুড়ি পিএসআই বা তারও বেশি গ্যাসের চাপ থাকার কথা, সেখানে বর্তমানে তা নামমাত্র দুই থেকে তিন পিএসআইয়ে ঠেকেছে। গ্যাসহীন এই করুণ অবস্থার কারণে বয়লার কিংবা জেনারেটর সচল রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে অনেক কারখানায় দিনে উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ রেখে কেবল গভীর রাতে গ্যাস পাওয়ার আশায় অলস সময় কাটাতে হচ্ছে শ্রমিকদের। আবার অনেক প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত ডিজেল পুড়িয়ে বিকল্প উপায়ে উৎপাদনের চেষ্টা করা হলেও অতিরিক্ত খরচের কারণে ব্যবসায়িক টিকে থাকা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সাভারের নামা গেণ্ডা ও আশুলিয়া এলাকার বিভিন্ন টেক্সটাইল এবং ওয়াশিং কারখানার উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন যে গত এক মাস ধরে তারা কোনো নিয়মিত গ্যাস পাচ্ছেন না। সিএনজি স্টেশন থেকেও সিলিন্ডারে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় বিকল্প কোনো জ্বালানি উৎস খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। উইন্টার ড্রেস লিমিটেডের মতো বড় মাপের পোশাক কারখানায় যেখানে প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিক কর্মরত আছেন, সেখানে শুধু ডিজেল ব্যবহার করে বয়লার সচল রাখতে গিয়ে প্রতি মাসে অতিরিক্ত ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ লাখ টাকা গচ্চা দিতে হচ্ছে। উৎপাদন পরিকল্পনা পুরোপুরি ভেস্তে যাওয়ায় সময়মতো বিদেশি ক্রেতাদের পণ্যের অর্ডার বা শিপমেন্ট সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে না। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নেবে এবং সুদিন হারাতে বসা এই রপ্তানিমুখী খাত চিরতরে প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে বাজার হারিয়ে ফেলবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন শিল্পপতিরা।
একই চিত্র বিরাজ করছে দেশের বৃহত্তম শিল্পাঞ্চল গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের কারখানাগুলোতেও। গাজীপুরে দৈনিক প্রায় ছয়শ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে অর্ধেকের চেয়েও কম গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে জেলার ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো তো বটেই, অনেক বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানও তাদের বিভিন্ন উৎপাদন ইউনিট বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের বা বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানিয়েছেন যে গ্যাস সংকটের তীব্রতার কারণে নারায়ণগঞ্জের প্রায় সমস্ত কারখানায় উৎপাদন গতকাল সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল এবং অনেক মিলের শ্রমিকরা কারখানায় এসে কাজ করার পরিবেশ না পেয়ে দুপুরে ছুটি নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তারা তাদের মোট উৎপাদন ক্ষমতার মাত্র ত্রিশ শতাংশের বেশি ব্যবহার করতে পারছেন না, যা পুরো শিল্প অর্থনীতিকে এক বড় ধরনের ধসের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
ময়মনসিংহের ভালুকা ও ত্রিশাল এলাকার শিল্পাঞ্চলেও গ্যাসের চাপ স্বল্পতার কারণে অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে উঠেছে। টয়ো স্পিনিং, সীমা স্পিনিং কিংবা এক্সপেরিয়েন্স টেক্সটাইলের মতো বড় সুতা ও কাপড় তৈরির কারখানায় অধিকাংশ মেশিনই জ্বালানি সংকটে বন্ধ রাখতে হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে দিনের বেলায় গ্যাসের চাপ না থাকায় দুপুরের খাবারের বিরতির পরপরই শ্রমিকদের ছুটি দিতে বাধ্য হচ্ছে কর্তৃপক্ষ। শিল্প পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, এই অঞ্চলের প্রধান কারখানাগুলোর গড় উৎপাদন ক্ষমতা অর্ধেকে নেমে এসেছে। কারখানায় পর্যাপ্ত কাজ বা উৎপাদনের সুযোগ না থাকায় মালিকপক্ষ শেষ পর্যন্ত কারখানাগুলো লে-অফ বা সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
উৎপাদন খাতজুড়ে চলা এই চরম দুর্দশার কারণে কারখানায় কর্মরত লাখ লাখ শ্রমিকের জীবন ও জীবিকা নিয়ে কালো মেঘ ঘনীভূত হয়েছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের বা বিটিএমএর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল অত্যন্ত উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে ইতিমধ্যেই তাদের সংগঠনের হাজারের বেশি কারখানায় উৎপাদন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে গেছে এবং প্রতিদিন কারখানাগুলো থেকে লে-অফের নোটিশ আসছে। কাজ না থাকায় শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়ায় তারা চাকরি হারানোর তীব্র আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। শিল্প পুলিশের পক্ষ থেকেও স্বীকার করা হয়েছে যে উৎপাদন না থাকলে মালিকরা বাধ্য হয়ে কারখানা বন্ধ ঘোষণা করবেন, যা শ্রমিকদের আশঙ্কার সত্যতা প্রমাণ করে। এমতাবস্থায় ব্যবসায়ীরা দাবি জানিয়েছেন যে যতদিন কারখানাগুলো বন্ধ থাকবে, ততদিন ব্যাংক ঋণের সুদহার মওকুফ করতে হবে এবং ঋণ পরিশোধের জন্য কমপক্ষে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ড বা বিশেষ সুবিধা দিতে হবে। অন্যথায় দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাতটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে।