-রিন্টু আনোয়ার
জ্বালানী সঙ্কট মোকাবেলায় মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সরকারি অফিস ও বানিজ্যিক ব্যাংক চলবে সকাল ৯ টা থেকে বিকেল ৪ টা পর্যন্ত,সরকারি ব্যায় কমাতে আগামী তিন মাস নতুন কোনো যানবাহন ক্রয় করা হবে না,স্কুলে ইলেকক্ট্রিক বাস চালু করা হবে, স্কুলগুলো চাইলে বিনা শুল্কে ইলেকট্রিক বাস আমদানি করতে পারবে,বিয়ে বা সামাজিক অনুষ্ঠানে আলোকসজ্জা করা যাবে না এবং শপিংমলসহ সকল দোকানপাট সন্ধ্যা ৬ টায় বন্ধ করতে হবে।
এছাড়া জ্বালানি তেলের সংকট, আতঙ্কের মাঝেই ভোক্তা পর্যায়ে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস-এলপিজির দাম বাড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন-বিইআরসি। নতুন দামে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার এক হাজার ৩৪১ টাকা থেকে ৩৮৭ টাকা বাড়িয়ে এক হাজার ৭২৮ টাকা করা হয়েছে। ঘোষণার দিনই এ বাড়তি দাম কার্যকর হয়ে যায়। এরপরও সরকারের দিক থেকে জ্বালানি সমস্যাকে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা। অভিযোগ বা বাস্তবতা আমল না দিয়ে বলা হচ্ছে, প্রতিদিন আগের মতোই তেল সরবরাহ দেয়া হচ্ছে। আতঙ্কিত ভোক্তারা বেশি পরিমাণে কেনায় বরাদ্দকৃত তেল দু’ ঘন্টাতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। সরবরাহেও কোনো সংকট নেই। তা হলে তো সমস্যাই নেই। থাকলেও মামুলি হাম জ্বরের মতো। কিন্তু, তেলের পাম্পগুলোতে কেন যানবাহনের দীর্ঘ সারি? তেল পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা? কেন অনেক পাম্পে ‘বিক্রী বন্ধ’ সাইনবোর্ড ঝুলছে? কোনো অভিযোগ বা দাবির বিষয় নয়। চোখের সামনে দেখা যাচ্ছে, ক্রেতারা প্রয়োজনীয় তেল কিনতে পারছে না। তাদের পোহাতে হচ্ছে চরম ভোগান্তি-অনিশ্চয়তা -হয়রানি।
পর্যাপ্ত পরিমাণ তেল রয়েছে সরকার থেকে এমন ঘোষণা দেয়া হলেও ডিপো থেকে তেল প্রাপ্তির ওপর ভিত্তির করে পাম্পে চলে বিক্রি। তেল সংকট নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য রীতিমতো বিনোদন–তামাশার পর্যায়ে। এর মাঝে আবার দেশের বিভিন্ন জায়গায় তেলের অবৈধ মজুদ ধরা পড়ছে। দেশের ৬৪টি জেলায় তেল মজুতের বিষয়ে পর্যবেক্ষণ ও অভিযান চলছে। ইরান যুদ্ধের কারণে কম-বেশি জ্বালানি সংকটের কবলে বিভিন্ন দেশ। বাংলাদেশও এর শিকার। গত চার দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমারা যেসব যুদ্ধ ও আগ্রাসন চাপিয়ে দিয়েছে, তার বেশিরভাগই সংঘটিত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সম্পদের উপর দখলদারিত্ব ও সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে। সাম্প্রতিক সময়ে এই যুদ্ধ ও আগ্রাসন দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলা পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়েছে। পুঁজিবাদী অর্থনীতির চাকা অনেকাংশে জ্বালানি নিরাপত্তার উপর নির্ভরশীল। আমাদের মতো উদীয়মান-উন্নয়নশীল ও আমদানি নির্ভর অর্থনীতির দেশের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তার ইস্যুটি আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। চলমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট ও নিরাপত্তা নতুনভাবে আলোচিত হচ্ছে। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের এই সময়ে বাংলাদেশে জ্বালানি নিরাপত্তার মতো ইস্যু নিয়ে বিগত সরকারগুলোর সঠিক পরিকল্পনা ও কর্মসূচির বড় ধরনের ঘাটতি ধরা পড়ছে। দক্ষিণ এশিয়ার জনবহুল মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের ভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ককে জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কৌশলগত সম্পর্কে পরিণত করা কোনো কঠিন বিষয় ছিল না। মুসলিম বিদ্বেষী ভারত মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশে রফতানি করে মুনাফা করার সুযোগ পেলেও এ সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ কেন তা গ্রহণ না করে ভারতের কাছে ধরনা দিতে বাধ্য হচ্ছে, তা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়া জরুরি নয়।
যুদ্ধের কারণে আমদানি ব্যাহত হচ্ছে, যুদ্ধ প্রলম্বিত হলে আমদানি ও মূল্য পরিস্থিতির আরো অবনতির আশংকা ঘুরছে। এ অবস্থায়ও দেশের জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়নি। বৃহস্পতিবার এলপিজির দাম চড়লো। তা ভবিষ্যতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর লক্ষণ। জ্বালানি নিরাপত্তার ব্যাপারে অতীতের সরকারগুলো খামখেয়ালি করেছে। লুটপাটের বড় সেক্টরও এ খাতটি। ফ্যাসিস্ট আমলের সাড়ে ১৫ বছরে জ্বালানি খাতকে পুরোপুরি বিদেশনির্ভর করে তোলা হয়েছে লুটপাটের ওপেনসিক্রেট খাতে। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে লুটপাট না হলেও গরজ কম করা হয়েছে। দেড়-দু’ মাসের প্রয়োজনীয় জ্বালানিও মজুত রেখে যায়নি ড. ইউনূস সরকার। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে পড়েছে বিপাকে। শুরুতেই তাকে অপ্রত্যাশিত জ্বালানিপরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়েছে। এলএনজি কিনতে স্পট মার্কেটের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। স্পট মার্কেটে এলএনজি প্রতি এমএসবিটিইউ গড়ে প্রায় ২২ ডলারে কিনতে হচ্ছে। যুদ্ধের আগে তা কেনা হতো ৯ থেকে ১০ ডলারে। চলতি অর্থ বছরে এ খাতে অন্তত ২০ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি গুণতে হতে পারে। জ্বালানির ঘাটতি বা সংকট কৃষি থেকে শুরু করে সকল পর্যায়ের উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া ফেলবে, যাতে অর্থনীতি, উন্নয়ন ও জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও ব্যাহত হবে। কেউ ঘাটতি বা ক্রাইসিসের শঙ্কায়, কেউ মুনাফার মোহে অবৈধভাবে তেল মজুদে ঝুকেছে। ধান-চালের গুদাম, বাগানবাড়ি কিংবা গর্ত খুঁড়ে তেল মজুদ করছে। এমনকি ময়দার কারখানা, কসমেটিকের দোকান, লন্ডির দোকান, মুদি দোকানেও অভিযানে মিলছে তেলের ড্রাম। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে যার যা কিছু আছে তা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে তেল মওজুদে। অনেক বাইক চালকরা নিজেদের বাসা বাড়িতেও গ্যালনের পর গ্যালন মওজুদ করেছে। অভিযান চালিয়ে অবৈধ কিছু মজুদ জব্দও করছে। জরিমানাও করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত মামলা হয়েছে ২ হাজার নয়টি । জরিমানা করা হয়েছে ১ কোটি এক লাখ চারশো ৩৫ টাকা। জ্বালানী তেল উদ্ধার হয়েছে ৩ লাখ ৭২ হাজার ৩’শ ৮৮ লিটার। কিন্তু, তা কাহাতক?
লক্ষণ বুঝে সরকার এরইমধ্যে ফিলিং স্টেশনগুলোতে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দিয়েছে। বিডিআর মোতায়েন করেছে। জ্বালানি তেল স্পর্শকাতর বিষয়। জ্বালানি তেলের হিসাব বরাবরই তেলতেলে দেখাতে চায় সরকারগুলো। তথ্য ও খাতাকলম তৈরি হয় সেই আলোকেই। সরকারের খাতা-কলমে তেলের প্রয়োজনীয় মজুদ আছে। কিন্তু, তা ক’মাসের, ক’দিনের? একদিকে এর স্পষ্ট জবাব নেই। অন্যদিকে স্টেশনগুলোতে তেল সরবরাহ নিয়ে অরাজকতা দিন দিন বাড়ছে। এ নিয়ে অসন্তোষ বিক্ষোভ হানাহানি এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। শরীয়তপুরে তেল না পেয়ে কৃষকরা একটি পাম্প ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেছেন। নড়াইলে ট্রাকচালকের সাথে ফিলিং স্টেশন ব্যবস্থাপকের বাগবিতণ্ডা হয়। পরিস্থিতি এত উত্তপ্ত হয় যে, ব্যবস্থাপককে ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যা করেছে ট্রাকচালক। ঢাকা শহরের গাড়ির চালকরা তেল পাওয়ার আশায় শহরের বাইরে গিয়ে জ্বালানি না পেয়ে ফিরে আসছেন। ফিলিং স্টেশনগুলোতে গাড়ির সারি প্রতিদিন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। পেট্রোল-অকটেনে বাংলাদেশ অনেকটাই স্বাবলম্বি। ডিজেল ও এলপি গ্যাস আমদানির ওপর নির্ভরশীল। অথচ পেট্রল ও অকটেনেও সঙ্কট। এ অবস্থায় তেল নিয়ে হাহাকারের পেছনে কৃত্রিম সঙ্কটের নমুনা রয়েছে। গুজবের বিষয়ও রয়েছে। যেকোনো সঙ্কটকে পুঁজি করে নিজের আখের গোছানোর লোক ও মহল এ দেশে বরাবরই ক্রিয়াশীল। আর তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে বিপিসি তথা সরকারের কিছুটা গরল ছড়িয়েছে ক্ষণে ক্ষণে। কতদিনের ডিজেল মজুদ আছে, কতদিনের পেট্রল মজুদ আছে এসব তথ্য উপাত্ত এত সুনির্দিষ্ট করে বলে দেয়ার ফলে জনমনে আশ্বাসের বদলে তৈরি হয় আতঙ্ক।
মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশ ও কোম্পানি বিভিন্ন সময়ে অয়েল রিফাইনারিতে বিনিয়োগের প্রস্তাব দিলেও বাংলাদেশ কেন সাড়া দেয়া হয়নি, তার যথাযথ মূল্যায়ন হওয়া জরুরি। এমনকি সম্ভাব্য আপদকালীন সময়ের জন্য জ্বালানি তেল ও এলএনজির মজুদ গড়ে তোলার পেছনেও তেমন কোনো বিনিয়োগ করা হয়নি। এর আগেও ইরানের সাথে আমেরিকা-ইসরাইলের সংঘাতপূর্ণ অবস্থায় হরমুজ প্রণালী বন্ধের ঝুঁকি, জ্বালানির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির সম্মুখীন হতে হয়েছে। যদিও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটে বাংলাদেশকে এখনো বড় ধরনের জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি হতে হয়নি। বাংলাদেশের প্রতি ইরানের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এ ক্ষেত্রে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এই দুঃসময়ে ইরান সরকারের সহযোগিতা ও যুদ্ধের মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রাসন নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছে ইরান। একমাসের যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সবগুলো জ্বালানি অবকাঠামো ও রিজার্ভার কমবেশি আক্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এহেন বাস্তবতায় জ্বালানি তেল ও এলএনজির দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে চলেছে। অত্যাবশ্যকীয় জরুরি প্রয়োজন মেটাতে দেশগুলোকে বাড়তি দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে। অন্তত দুই-তিন মাস চালিয়ে নেয়ার মতো আমাদের নিজস্ব জ্বালানি মজুদ থাকলে দেশ এখন এমন অস্থিরতা ও ঝুঁকির মধ্যে থাকতো না। ইসরাইল বাদ দিলে ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের সবগুলো দেশের সাথে বাংলাদেশের চমৎকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের কাজে লাগোনোর কোনো উদ্যোগ না থাকা বিস্ময়কর। বিগত দেড় যুগের সীমাহীন লুটপাট ও অর্থপাচারের কারণে এমনিতেই দেশের অর্থনীতি বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। এখন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থায় জ্বালানি মূল্যের উল্লম্ফন এবং অনিশ্চয়তা সামষ্টিক অর্থনীতি, উৎপাদন ব্যবস্থা, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তা ভর করেছে। জ্বালানি খাত দেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি। বিদ্যুৎ, গণপরিবহন, শিল্প-কারখানা, রফতানি বাণিজ্য, কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা জ্বালানির সহজলভ্যতা ও অবাধ প্রবাহের উপর নির্ভরশীল। ইরান যুদ্ধে ইসরাইল-আমেরিকা সুবিধাজনক অবস্থায় না থাকলেও যুদ্ধের সমাপ্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এবং তেল শোধনাগারগুলো আরো আক্রমণের শিকার হলে সামগ্রিক বিশ্ব অর্থনীতিতে ধস নামবে। তাই সংকট উত্তরণে সরকারকে হতে হবে আরো কঠোর। সমস্যা সমাধানে পাম্প স্টেশনগুলোর ইতিহাস দেখারও দরকার রয়েছে। এ বাস্তবতায় অতি তথ্য জানানো দরকার পড়ে না। তথ্য লুকোচুরিও কাম্য নয়। উপযুক্ত কর্মকৌশল নিতে দেরি হলে সর্বনাশ ঘটতে পারে। কথার বাহাদুরি বা কেবল সমালোচনাই দায়িত্ব নয়, বৈশ্বিক সংকট মোকাবেলায় সবার মিতব্যয়ী হওয়ার মানসিকতাও জরুরি।
….
লেখক ঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট।