বাংলাদেশের একসময়ের বিশ্বনন্দিত সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই আজ চরম হুমকির মুখে। বিশেষ করে গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন (গ্যাভি)-কে এই কর্মসূচি থেকে বাদ দেওয়ার ফলে দেশজুড়ে হাম ও রুবেলার টিকার মারাত্মক সংকট তৈরি হয়েছে। এর পরিণতিতে হাজার হাজার শিশু আজ হামে আক্রান্ত হচ্ছে। এই বিপর্যয়কে নিছক কোনো প্রশাসনিক ভুল নয়, বরং শিশুদের প্রতি এক ধরনের গুরুতর অপরাধ বা ক্রাইম হিসেবে আখ্যায়িত করে এর জন্য পুরো মন্ত্রিসভার কাঠামোগত গাফিলতিকেই সরাসরি দায়ী করা হচ্ছে।
অভিযোগ উঠেছে, সরকারের স্বাস্থ্য ও প্রশাসন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন অদক্ষ ব্যক্তি এবং কিছু এনজিওর অযাচিত হস্তক্ষেপে এই সফল কর্মসূচিটি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। নির্দিষ্ট কিছু এনজিও রাষ্ট্র পরিচালিত এই টিকাদান কর্মসূচির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে চাইছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অথচ আগের নিয়ম অনুযায়ী, গ্যাভি টিকার মোট খরচের ৭০ শতাংশ অর্থায়ন করত, যার পেছনে বিল ও মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার অনুদান ছিল। বাকি মাত্র ৩০ শতাংশ ব্যয়ভার বহন করত বাংলাদেশ সরকার। এই প্রক্রিয়ায় ইউনিসেফ অত্যন্ত সুরক্ষিত ও কারিগরিভাবে নিখুঁত পদ্ধতিতে বিশ্বের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান থেকে টিকা কিনে সরকারের কাছে হস্তান্তর করত এবং ইপিআই কর্মীরা তা শিশুদের শরীরে প্রয়োগ করতেন।
কিন্তু অত্যন্ত সংবেদনশীল ও প্রযুক্তিগতভাবে জটিল এই টিকাদান প্রক্রিয়ায় হঠাৎ কেন ছন্দপতন ঘটল, তার নেপথ্যে বড় ধরনের কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ সামনে আসছে। ইউনিসেফ সরাসরি টিকা কেনায় এখানে কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর অবৈধ কমিশন বা ঘুষ পাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। ধারণা করা হচ্ছে, এই আর্থিক সুবিধা বা কমিশন না পাওয়ার ক্ষোভ থেকেই ইপিআইয়ের পঞ্চম ধাপ বা ফিফথ ফেজ বাতিল করা হয়েছে। ইউনিসেফের প্রতিনিধিরা বারবার চিঠি দিয়ে এবং সরাসরি দেখা করে বিপদের বিষয়ে সতর্ক করার পরও বিষয়টিতে কর্ণপাত করা হয়নি। অথচ ২০২৫ সালের মধ্যে দুই কোটি টিকা প্রয়োগের মাধ্যমে একটি বিশাল ক্যাম্পেইন করে বাংলাদেশকে সম্পূর্ণ হামমুক্ত ঘোষণা করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত ছিল। একসময় যেখানে সারা দেশে বছরে মাত্র আড়াইশ থেকে তিনশ হামের রোগী পাওয়া যেত, সেখানে এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের কারণে আজ হাজার হাজার শিশু এই প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
এই চরম জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ের দায়ভার কার—তা নিয়ে এখন শুরু হয়েছে রাজনৈতিক কাঁদা ছোড়াছুড়ি। একটি মহল ‘উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে’ চাপানোর কৌশলে দাবি করছে যে, গ্যাভিকে বাদ দেওয়ার এই সিদ্ধান্তটি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলেই নেওয়া হয়েছিল। তবে সমালোচক ও বিশেষজ্ঞরা এই দাবিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাদের মতে, ২০২৪ সালের শেষের দিকে টিকা কেনার নতুন প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়েছিল এবং বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরই মূলত ইপিআইয়ের এই পঞ্চম ধাপটি চূড়ান্তভাবে বাতিল করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের দাবি, শিশুদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার এই ভয়াবহ ও অমানবিক সিদ্ধান্তের জন্য দ্রুত একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রকৃত দোষীদের কঠোর জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।
তথ্যসূত্র: দ্যা পোস্ট