ঢাকার প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ বা মিটফোর্ড হাসপাতাল একসময় সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীক থাকলেও বর্তমানে তা এক ভয়ংকর দালালচক্র ও অসাধু চিকিৎসকদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। সরকারি এই চিকিৎসাকেন্দ্রের মূল উদ্দেশ্য হলো গরিব ও অসহায় মানুষকে বিনামূল্যে বা স্বল্প মূল্যে উন্নত চিকিৎসাসেবা প্রদান করা। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন ও চরম হতাশাজনক। হাসপাতালের অভ্যন্তরে ও বাইরে একটি শক্তিশালী দালাল সিন্ডিকেট অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে তাদের অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় হলো, রোগীদের সেবা দেওয়ার জন্য যে চিকিৎসকদের নির্ধারিত সময়ে সরকারি হাসপাতালে উপস্থিত থাকার কথা, তারা সেই পবিত্র দায়িত্ব ফাঁকি দিয়ে অর্থের লোভে পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন অবৈধ ও মানহীন প্রাইভেট ক্লিনিকে রোগী দেখছেন। ফলে দূরদূরান্ত থেকে আসা অসহায় রোগীরা সরকারি হাসপাতালে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এর পাশাপাশি হাসপাতাল চত্বরে দালালদের সীমাহীন প্রতারণা এবং প্রতিনিয়ত চুরির ঘটনায় সাধারণ রোগীরা আর্থিকভাবে সর্বস্বান্ত হওয়ার পাশাপাশি শারীরিকভাবেও চরম ঝুঁকির মুখে পড়ছেন।
মিটফোর্ড হাসপাতালকে কেন্দ্র করে এর আশপাশের কোতোয়ালি ও চকবাজার এলাকায় রীতিমতো অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এক বিশাল জাল বিস্তার লাভ করেছে। সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, হাসপাতালের ১৫ থেকে ২০০ গজের মধ্যেই গড়ে উঠেছে প্রায় ১৫ থেকে ২০টি বেসরকারি ক্লিনিক, আর পুরো এলাকায় এই সংখ্যা অর্ধশতাধিক। হাসপাতালের ৩ নম্বর গেটের ঠিক পাশেই ভিক্টোরিয়া হাসপাতাল, মেডিসান হেলথ কেয়ার ও ডক্টরস ক্লিনিকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বীরদর্পে তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া ২ নম্বর গেটের মুখে আল আরাফাত, বাঁধন, ম্যাক্স এইড, নিউ ঢাকা মডার্ন ও ঢাকা হাসপাতাল এবং ১ নম্বর গেটসংলগ্ন মুনলাইট, ইস্টার্ন ডায়াগনস্টিক ও মেডি লাইফ স্পেশালাইজড হাসপাতালের নাম উল্লেখযোগ্য। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এসব ক্লিনিকের অধিকাংশেরই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ন্যূনতম কোনো অনুমোদন বা ভৌত অবকাঠামো নেই। বহুতল ভবনগুলোর নিচতলায় সারি সারি কেমিক্যাল গোডাউন ও দোকানপাট, আর তার ঠিক ওপরের তলাগুলোতেই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে চলছে তথাকথিত হাসপাতালের কার্যক্রম। এসব ক্লিনিকে নেই কোনো সার্বক্ষণিক ডিউটি ডাক্তার, নেই কোনো ডিপ্লোমা নার্স বা দক্ষ টেকনিশিয়ান, এমনকি চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনার ন্যূনতম ব্যবস্থাও সেখানে অনুপস্থিত।
এই অবৈধ ক্লিনিকগুলোর টিকে থাকার একমাত্র হাতিয়ার হলো মিটফোর্ড হাসপাতালের দালালচক্র এবং সরকারি হাসপাতালের কিছু অসাধু চিকিৎসক। এসব ক্লিনিকের প্রচারপত্র থেকে শুরু করে চিকিৎসকদের নামের তালিকায় মিটফোর্ড হাসপাতালের স্বনামধন্য চিকিৎসকদের নাম বড় বড় অক্ষরে ব্যবহার করে সাধারণ রোগীদের আকৃষ্ট করা হয়। সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের পরিচয় ভাঙিয়ে রোগীদের মনে একটি মিথ্যা আস্থার জায়গা তৈরি করা হয়। প্রতিদিন কাকডাকা ভোর থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত দরিদ্র রোগী উন্নত চিকিৎসার আশায় মিটফোর্ড হাসপাতালের বহির্বিভাগে এসে ভিড় জমান। এই অসহায় মানুষগুলো যখন টিকিট কেটে দীর্ঘ লাইনে ক্লান্ত হয়ে পড়েন, ঠিক তখনই দালালচক্র তাদের টার্গেট করে। দালালরা রোগীদের কাছে গিয়ে অত্যন্ত সহানুভূতিশীল আচরণ করে এবং বোঝানোর চেষ্টা করে যে সরকারি হাসপাতালে ডাক্তার দেখাতে সারাদিন লেগে যাবে এবং সঠিক চিকিৎসাও পাওয়া যাবে না। এর বদলে তারা খুব কম খরচে এবং দ্রুত সময়ে হাসপাতালের বাইরের ক্লিনিকে অভিজ্ঞ ডাক্তার দেখিয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখায়।
দালালদের এই ফাঁদে পা দেওয়ার পর শুরু হয় চিকিৎসকদের চরম নৈতিক স্খলনের মহড়া। সরকারি হাসপাতালে নির্ধারিত ডিউটি চলাকালেই অনেক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দালালদের ফোন পেয়ে চা বা শিঙাড়া খাওয়ার মিথ্যে অজুহাত দিয়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে পড়েন। এরপর তারা সোজা চলে যান ওইসব অবৈধ ক্লিনিকে। সরেজমিন পরিদর্শনে বেলা ১টা ২০ মিনিটে মিটফোর্ড হাসপাতালের বহির্বিভাগের একজন অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তানভীরকে হাসপাতালের ঠিক পাশের ডক্টরস ক্লিনিক অ্যান্ড হাসপাতালে রোগী দেখতে দেখা যায়। অথচ ওই সময়টিতে তার সরকারি হাসপাতালেই দায়িত্ব পালন করার কথা ছিল। শুধু তিনি একা নন, একই সময়ে শিশু বিভাগের চিকিৎসক প্রদীপ মালাকার এবং মেডিসিন বিভাগের আরও তিন চিকিৎসককে ওই একই ক্লিনিকে প্রবেশ করতে দেখা যায়। সরকারি বেতনভুক্ত এই চিকিৎসকরা নিজেদের পকেট ভারী করতে গিয়ে হাজার হাজার দরিদ্র রোগীর জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন, যা চিকিৎসা পেশার মহান আদর্শের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
দালালচক্র ও অসাধু চিকিৎসকদের এই নিষ্ঠুর বাণিজ্য কীভাবে একজন সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন করে তোলে, তার এক জ্বলন্ত প্রমাণ হলেন মুন্সীগঞ্জ থেকে আসা ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ আব্দুল মজিদ। পিত্তথলির পাথর এবং তলপেটের তীব্র ব্যথায় কাতর এই বৃদ্ধ বিনা মূল্যে একটি ভালো চিকিৎসার আশায় ছুটে এসেছিলেন মিটফোর্ড হাসপাতালে। বহির্বিভাগে টিকিটের লাইনে দাঁড়ানোর পর থেকেই কয়েকজন দালাল তাকে ঘিরে ধরে এবং কম খরচে দ্রুত অভিজ্ঞ ডাক্তারের মাধ্যমে চিকিৎসা করিয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখাতে শুরু করে। অসুস্থতা ও বয়সের ভারে ক্লান্ত আব্দুল মজিদ দালালদের এই চটকদার কথায় বিশ্বাস করে বসেন এবং তাদের সঙ্গে পাড়ি জমান পার্শ্ববর্তী মেডিসান ক্লিনিকে। কিন্তু সেখানে পা দেওয়ার পর থেকেই শুরু হয় প্রতারণার আরেক অধ্যায়। শারীরিক পরিস্থিতি নিরূপণের নামে কোনো কারণ ছাড়াই তাকে একের পর এক অপ্রয়োজনীয় প্যাথলজিক্যাল ও ডায়াগনস্টিক টেস্ট ধরিয়ে দেওয়া হয়। নিজের সঙ্গে থাকা সামান্য সম্বলটুকু ক্লিনিকের বিল মেটাতে গিয়ে নিঃশেষ হয়ে যায় তার। এতগুলো টাকা খরচ করার পরও তিনি কোনো চিকিৎসাসেবা পাননি। সর্বস্বান্ত হয়ে এই বৃদ্ধ আক্ষেপ করে জানান যে, সরকারি হাসপাতালে কম খরচে চিকিৎসার আশায় এসে তিনি দালালদের খপ্পরে পড়ে সবকিছু হারিয়েছেন এবং এখন তার কাছে বাড়ি ফিরে যাওয়ার মতো ভাড়ার টাকাটুকুও অবশিষ্ট নেই।
আব্দুল মজিদ মিয়ার মতো অসংখ্য গ্রামীণ ও দরিদ্র রোগী প্রতিদিন এই সিন্ডিকেটের নির্মম শিকারে পরিণত হচ্ছেন। অসাধু ক্লিনিক মালিকরা দালালদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ থাকে এবং রোগীপ্রতি মোটা অঙ্কের কমিশন প্রদান করে। এই কমিশনের টাকা তুলে আনতে রোগীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় নিম্নমানের এবং অপ্রয়োজনীয় সব ডাক্তারি পরীক্ষা। ভুল ও অসম্পূর্ণ রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসা নিতে গিয়ে রোগীরা শুধু আর্থিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না, বরং তাদের শারীরিক অবস্থাও অনেক ক্ষেত্রে আরও সংকটাপন্ন হয়ে পড়ছে। সরকারি হাসপাতালের ভেতরে থাকা ভিড় এবং চিকিৎসকদের সেবাদানের দীর্ঘসূত্রতার সুযোগটিকেই এই দালালরা তাদের ব্যবসার মূল পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করছে। এর পাশাপাশি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের স্বজনদের জন্য এক নতুন আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে চুরি। দালালদের পাশাপাশি হাসপাতালে একদল সংঘবদ্ধ চোর চক্র সক্রিয় রয়েছে, যারা প্রতিনিয়ত রোগী ও তাদের স্বজনদের টাকা, মোবাইল ফোন ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে।
চিকিৎসকদের এই দায়িত্বহীনতা এবং অবৈধ ক্লিনিকের রমরমা ব্যবসার বিষয়ে স্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসক নেতারাও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ বা ড্যাব এর নেতা এবং বিশিষ্ট নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞ ডা আবদুল্লাহ আল মামুন এই পরিস্থিতির কড়া সমালোচনা করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, সরকারি হাসপাতালে ডিউটির সময় বা অফিস চলাকালীন কোনো চিকিৎসকের এভাবে প্রাইভেট ক্লিনিকে রোগী দেখা ১৯৮২ সালের দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ রেগুলেশন অর্ডিনেন্স এর ৪ নম্বর ধারার সুস্পষ্ট ও চরম লঙ্ঘন। গুটি কয়েক চিকিৎসকের এই চরম নৈতিক অবক্ষয় ও অনিয়মের কারণে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা রোগীরা সারাদিন লাইনে দাঁড়িয়েও চিকিৎসাসেবা না পেয়ে খালি হাতে বাড়ি ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে সামগ্রিকভাবে চিকিৎসাব্যবস্থা এবং দেশের সব সৎ চিকিৎসকের সুনাম দারুণভাবে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। তিনি অবিলম্বে এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করে জড়িত চিকিৎসক ও দালালচক্রকে কঠোর আইনি শাস্তির আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন।
মিটফোর্ড হাসপাতালের এই বেহাল দশা এবং অনিয়মের বিষয়ে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ এইচ এম এ রুস্তম কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন যে, অফিস চলাকালীন কোনো চিকিৎসক যদি ডিউটি ফাঁকি দিয়ে বাইরের কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে রোগী দেখেন, তবে সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বর্তমান সরকারের এই বিষয়ে অত্যন্ত কড়া নির্দেশনা রয়েছে এবং তদন্ত সাপেক্ষে কোনো অভিযুক্তকেই বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না বলে তিনি আশ্বস্ত করেন। হাসপাতালে দালালদের উপদ্রব এবং চুরির বিষয়ে তিনি জানান যে, এই অপরাধগুলো দমনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নিয়মিত অভিযান চলমান রয়েছে। তবে অনেক সময় চোর ও দালালরা রোগীর আপনজন বা স্বজন সেজে অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে হাসপাতালের ভেতরে প্রবেশ করে, যার ফলে নিরাপত্তারক্ষী বা আনসার সদস্যদের পক্ষে তাদের আলাদাভাবে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তা সত্ত্বেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিয়মিতভাবে দালাল ও চোরদের হাতেনাতে ধরে পুলিশের হাতে সোপর্দ করছে। পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে তিনি রোগী ও তাদের স্বজনদের দালালদের বিষয়ে আরও বেশি সতর্ক ও সচেতন হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন।
তথ্যসূত্র: যুগান্তর