• শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:২৩ অপরাহ্ন
Headline
নতুন টার্মিনাল নির্মাণের তোড়জোড়: এলএনজি আমদানির আর্থিক বোঝা ছাড়াতে পারে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা বিপন্ন হতে পারে রাষ্ট্রীয় ইস্টার্ন রিফাইনারি: আবেদন নাকচের পরেও রিফাইনারি বানাতে কারসাজি পাড়ার নিরাপত্তা মানে নিজের নিরাপত্তা: কিছু পরামর্শ নভোথিয়েটারের সাবেক মহাপরিচালক আরশাদের দেশত্যাগ নিষেধাজ্ঞা স্থানীয় প্রকল্পে বৈদেশিক মুদ্রায় ব্যাংক গ্যারান্টির সুযোগ অবকাঠামো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে চীনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চাই : এলজিআরডি মন্ত্রী রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ দলনিরপেক্ষভাবে কাজ করব : রাষ্ট্রপতি আমরা তার ছাত্র হওয়ার জন্য আসিনি: সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা এভাবে নিয়ম ভঙ্গ করা হলে সংসদ বেশি দিন চলবে না: স্পিকার সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে বিরোধীদের প্রতিবাদ, পরিস্থিতি উত্তপ্ত

ডিগ্রিধারীর ভিড়ে কর্মদক্ষতার হাহাকার

Reporter Name / ৫ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬

সংখ্যাগত কিংবা কাঠামোগত দিক থেকে বাংলাদেশ ক্রমাগত সামনের দিকে অগ্রসর হলেও গুণগত মানের ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে এক বিশাল শূন্যতা। ১৮ কোটি মানুষের এই জনবহুল দেশে প্রায় প্রতিটি খাতেই এখন দক্ষ জনবলের তীব্র ঘাটতি এক সর্বগ্রাসী জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। রাজনীতিতে স্লোগান দেওয়া কর্মীর প্রাচুর্য থাকলেও দূরদর্শী, দেশপ্রেমিক ও যোগ্য নীতিনির্ধারকের সংখ্যা নগণ্য। অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে হিসাব মেলানোর মতো লোক থাকলেও উদ্ভাবনী চিন্তার অভাব প্রকট। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে জনবল কাঠামো পূরণ থাকলেও আধুনিক অপরাধ তদন্ত ও পেশাদার পুলিশিংয়ে অদক্ষতা দৃশ্যমান। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষকরা গবেষণার বদলে দলীয় লেজুড়বৃত্তিতে ব্যস্ত। গণমাধ্যমে কর্মীর ভিড় বাড়লেও নীতিবান, নির্মোহ ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্র সংকুচিত হচ্ছে। এমনকি দেশের প্রধান চালিকাশক্তি বেসরকারি শিল্প খাতে কারখানা থাকলেও তা পরিচালনার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে উপযুক্ত ব্যবস্থাপক মিলছে না। বিশ্লেষকদের মতে, মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা এবং মেধার চেয়ে তদবির, সংযোগ ও রাজনৈতিক আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সংস্কৃতিই আজকের এই চরম সংকটের মূল কারণ।
সংকটটিকে আরও জটিল করে তুলছে অব্যাহত মেধা পাচার। বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক মেধাবী শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে বিদেশ পাড়ি দিচ্ছেন এবং দেশে নিজেদের উপযোগী ও সম্মানজনক কর্মসংস্থানের অভাবে তারা আর ফিরছেন না। ফলে রাষ্ট্রকাঠামোর সর্বত্র এক ধরনের অগোছালো ভাব ও অদক্ষতার ছাপ ফুটে উঠছে। কিছু দক্ষ পেশাজীবী থাকলেও রাজনৈতিক সুবিধাভোগীদের ভিড়ে তারা ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, মেধা ও দক্ষতা এক বিষয় নয়; দক্ষতা হলো তাত্ত্বিক জ্ঞান, বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং সমস্যার সমাধানমূলক চিন্তার সমন্বিত রূপ। দেশে শিক্ষা খাতে বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ হলেও মানের উন্নয়ন হয়নি। মেডিকেল কিংবা ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার পুরোটাই পাঠ্যবইয়ে সীমাবদ্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এর পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সংকীর্ণতা ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোর নির্লজ্জ দলীয়করণের কারণে দেশে দক্ষ মানুষের যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে না।
দেশি-বিদেশি বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও জরিপে বাংলাদেশের মানবসম্পদের এই করুণ চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ৯ লাখ ৬ হাজার, যা বিগত এক দশকের তুলনায় প্রায় আট গুণ বেশি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ২৮ শতাংশ। আন্তর্জাতিক ‘কিউএস ওয়ার্ল্ড ফিউচার স্কিলস ইনডেক্স-২০২৫’-এ চাকরিদাতাদের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরির তালিকায় ৮১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান তলানিতে—৬৭তম। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী দেশের ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী প্রায় ৫৫ লাখ তরুণ শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা কোনো ধরনের প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত নেই (এনইইটি), যার সামগ্রিক হার প্রায় ৪১ শতাংশ এবং নারীদের ক্ষেত্রে তা প্রায় ৬২ শতাংশ। যেখানে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) বৈশ্বিক এনইইটি গড় মাত্র ২২ শতাংশ। আইএলওর অপর এক জরিপ বলছে, দেশে কর্মভিত্তিক প্রশিক্ষণের প্রবল চাহিদা থাকা সত্ত্বেও গত তিন বছরে প্রায় ৯৩ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক কারিগরি প্রশিক্ষণ নেননি।
এই অদক্ষতার সরাসরি আর্থিক মাশুল গুনতে হচ্ছে দেশের অর্থনীতি ও শিল্প খাতকে। তৈরি পোশাকসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় রফতানিমুখী শিল্পগুলোর উচ্চ ও মধ্যম স্তরের ব্যবস্থাপনা পদে বিপুল সংখ্যক বিদেশি কর্মী, বিশেষ করে ভারত ও শ্রীলঙ্কার নাগরিকদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ফলে দেশীয় ব্যবস্থাপকের অভাবে প্রতি বছর মোটা অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও সাবেক সচিব আলী ইমাম মজুমদার এবং ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি আবুল কাশেম খানের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শ্রমবাজারের চাহিদামতো ব্যবহারিক জ্ঞান ও ভাষা দক্ষতা (বিশেষ করে স্পোকেন ইংলিশ) শেখাতে ব্যর্থ হওয়ায় স্থানীয় তরুণরা বড় পদগুলোতে জায়গা করে নিতে পারছেন না। একই চিত্র প্রবাসী শ্রমবাজারেও। বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়া মোট শ্রমিকের মধ্যে মাত্র সাড়ে ২৩ শতাংশ দক্ষ, আর ৫৪ শতাংশেরও বেশি যাচ্ছেন অদক্ষ বা স্বল্প দক্ষ হিসেবে। এর ফলে ফিলিপাইন বা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো সমপরিমাণ বা কম কর্মী পাঠিয়ে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় করলেও বাংলাদেশ সেই অনুপাতে পিছিয়ে পড়ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণ, যা অর্থনীতির ভাষায় একটি বিরল ও স্বর্ণালি ‘জনমিতিক লভ্যাংশ’ বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড। কিন্তু এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে যদি দ্রুত বাজারমুখী কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা (টিভিইটি), তথ্যপ্রযুক্তি, নার্সিং এবং আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর বাস্তবমুখী দক্ষতায় গড়ে তোলা না যায়, তবে এই সম্ভাবনা উল্টো জাতির জন্য এক স্থায়ী বোঝায় পরিণত হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মুখস্থনির্ভর কারিকুলাম পরিবর্তন করে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পের মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপন, ইন্টার্নশিপ বাধ্যতামূলক করা এবং মেধার ভিত্তিতে যোগ্য ব্যক্তিকে মূল্যায়নের নীতিগত সংস্কার এখনই শুরু করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও সততাভিত্তিক জাতীয় দক্ষতা কৌশল বাস্তবায়ন ছাড়া এই তীব্র মেধা ও দক্ষতার খরা দূর করা সম্ভব নয়।
তথ্যসূত্র: যুগান্তর


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category