• মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৩২ অপরাহ্ন

ডিজিটাল বাতায়নে তথ্যের অনুপস্থিতি: কাগুজে প্রচারের সাথে বাস্তবতার বিস্তর ফারাক

Reporter Name / ০ Time View
Update : মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন ও প্রশাসনিক আধুনিকায়নের বড় বিজ্ঞাপন জাতীয় তথ্য বাতায়ন হলেও বাস্তবে তা সাধারণ নাগরিকের তথ্য পাওয়ার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারছে না| নাগরিক সেবার মানোন্নয়ন, সরকারি কর্মকাণ্ডের সার্বিক হিসাব এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিতে মন্ত্রণালয়গুলোর নিজস্ব ওয়েবসাইটে হালনাগাদ তথ্য থাকা বাধ্যতামূলক হলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে বিপরীত চিত্র| খাদ্যশস্যের সরকারি মজুত, আমদানির পরিমাণ, অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ অভিযান, সাইলো ও গুদামের ধারণক্ষমতা কিংবা খোলা বাজারে বিক্রি বা ওএমএস কর্মসূচির বিস্তারিত হিসাব জানতে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করলে প্রয়োজনীয় তথ্যের দেখা মেলা ভার| কেবল খাদ্য মন্ত্রণালয়ই নয়, সরকারের প্রায় অধিকাংশ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ওয়েবসাইটে মৌলিক তথ্য প্রকাশের এই বেহাল দশা দীর্ঘদিন ধরে অব্যাহত রয়েছে| আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকার পরও বছরের পর বছর ধরে নিয়মিত বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ থেকে বিরত থাকছে সরকারি দপ্তরগুলো, যার ফলে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড ও নীতি নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ও নজরদারির সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে|
বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়নে অন্তর্ভুক্ত ৩৭টি মন্ত্রণালয় ও ৯টি বিভাগের ওপর সম্প্রতি পরিচালিত এক বিশদ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে সরকারি সংস্থাগুলোর তথ্য গোপনীয়তার সংস্কৃতি| বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আইনি বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও অর্ধেকেরও বেশি মন্ত্রণালয় তাদের ওয়েবসাইটে নিয়মিত বার্ষিক প্রতিবেদন হালনাগাদ করেনি| অন্তত ২০টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের পোর্টালে কেবল ২০২৩ সাল পর্যন্ত বার্ষিক প্রতিবেদন পাওয়া গেছে, এর পরবর্তী বছরগুলোর কোনো নথি বা বিবরণী সেখানে আপলোড করা হয়নি| কোনো কোনো মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে বার্ষিক প্রতিবেদনের তালিকা প্রদর্শিত হলেও লিংকে ক্লিক করলে তা ডাউনলোড বা পড়া সম্ভব হচ্ছে না| এমনকি কিছু কিছু মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ওয়েবসাইটে কোনো দিন কোনো বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশের ইতিহাসই খুঁজে পাওয়া যায়নি| অনেক সরকারি বাতায়নে বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো মেন্যু বা সেকশনই রাখা হয়নি, যা রাষ্ট্রীয় তথ্য প্রকাশ কাঠামোর গুরুতর দুর্বলতা ও আইনের প্রতি চরম উদাসীনতার স্পষ্ট প্রমাণ দেয়|
আইনি প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, এই প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা সরাসরি তথ্য অধিকার আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন| তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর ধারা ৬ অনুযায়ী সব সরকারি কর্তৃপক্ষের স্বপ্রণোদিত হয়ে তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতা রয়েছে| আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, সার্বিক কার্যক্রম, কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং প্রধান প্রধান নীতিগত সিদ্ধান্তের পূর্ণাঙ্গ বিবরণী সম্বলিত বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে| এছাড়া তথ্য কমিশনের ‘স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশ নির্দেশিকা ২০১৪’-তেও মন্ত্রণালয় ও সরকারি দপ্তরগুলোর দাপ্তরিক ওয়েবসাইটে নিয়মিত বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে| ফলে নিয়মিত বার্ষিক প্রতিবেদন উন্মুক্ত না করা নিছক কোনো দাপ্তরিক অবহেলা নয়, বরং বিদ্যমান আইনের সরাসরি অবমাননার শামিল|
রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে তথ্য উন্মুক্ত করার এই সংকটের কারণে গবেষণা, নীতি পর্যালোচনা ও নীতিনির্ধারণ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে| জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক মো. তারিকুল ইসলাম এই পরিস্থিতির গভীরতা তুলে ধরে জানিয়েছেন, সরকারের স্বচ্ছতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার মূল ভিত্তিই হলো স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশ| তথ্য অধিকার আইন কেবল নাগরিকদের তথ্য চাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করেনি, বরং জনগণের কাছে তথ্য পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর একটি বাধ্যতামূলক প্রাতিষ্ঠানিক দায়ভারও অর্পণ করেছে| মন্ত্রণালয়গুলোর বার্ষিক প্রতিবেদন নিয়মিত প্রকাশিত না হলে সরকারি কর্মকাণ্ডের সামগ্রিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে| এর ফলে বাজেটের যথাযথ বাস্তবায়ন, লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা তৈরি হয় না| তথ্যের এই কৃত্রিম সংকট বস্তুনিষ্ঠ ও প্রমাণভিত্তিক নীতি প্রণয়নের পথকে অবরুদ্ধ করে তোলে এবং রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড সম্পর্কে নাগরিক ধারণাকে বিভ্রান্তির মুখে ফেলে দেয়|
তথ্য প্রাপ্তির এই অচলাবস্থা দেশের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকেও মারাত্মক প্রতিবন্ধকতার মুখে ফেলেছে| গণমাধ্যমকর্মীদের তথ্যমতে, সরকারি ওয়েবসাইটগুলো নিয়মিত হালনাগাদ না থাকায় পেশাগত কাজে প্রায়ই বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়| দ্য ডেইলি অবজার্ভারের সাবেক প্রতিবেদক হিমেল হাসনাত রফি এই প্রসঙ্গে জানান, সরকারি পোর্টালে তথ্যের অনুপস্থিতির কারণে সাংবাদিকদের বাধ্য হয়ে অনানুষ্ঠানিক সূত্রের ওপর নির্ভর করতে হয় অথবা তথ্য অধিকার আইনে আনুষ্ঠানিক আবেদন করতে হয়| তবে দীর্ঘ আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় তথ্য পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়, যার ফলে খবরের সাময়িক গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা অনেকাংশেই নষ্ট হয়ে পড়ে| এছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বাজেট বরাদ্দ, পরিচালন ব্যয় এবং গৃহীত প্রকল্পের অগ্রগতি সংক্রান্ত তথ্য হালনাগাদ না থাকায় উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে স্বচ্ছতা যাচাই করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়| এর ফলে সম্ভাব্য দুর্নীতি বা আর্থিক অনিয়মের বিষয়গুলো অনুসন্ধান করে জনসমক্ষে আনা আরও জটিল আকার ধারণ করে|
এই অনিয়মের পেছনের কারণ অনুসন্ধানে প্রশাসনিক আমলাতন্ত্রের সমন্বয়হীনতা ও সমন্বিত তদারকির অভাবই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে| জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব রাহেদ হোসেন জানান, প্রতি অর্থবছর তথ্য অধিকার আইনের অধীনে বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরি ও প্রকাশের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে সব মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়| প্রতিটি মন্ত্রণালয় নিজস্ব কমিটি গঠনের মাধ্যমে এই প্রতিবেদন প্রস্তুত ও তদারকির দায়িত্ব পালন করে থাকে| তবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব পালনকালে এই সংক্রান্ত কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা জারি করা হয়নি| কিছু কর্মকর্তা দাবি করেছেন, কারিগরি ত্রুটি এবং তথ্য কমিশনের সদস্য নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতার কারণে বার্ষিক প্রতিবেদন সময়মতো ওয়েবসাইটে তোলা সম্ভব হয়নি|
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা ইমদাদুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রতি অর্থবছরে চিঠি পাঠানো হলেও এবার কোনো দাপ্তরিক নির্দেশনা পাওয়া যায়নি| অন্যদিকে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বক্তব্যে ফুটে উঠেছে তথ্যের প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক অনীহার চিত্র| তাদের মতে, অগ্রাধিকারের অভাব, আইন সম্পর্কে পর্যাপ্ত সচেতনতা না থাকা এবং প্রতিবেদন প্রকাশের দায়িত্ব কার ওপর বর্তায় সে বিষয়ে অস্পষ্টতার কারণে এই কাজ ঝুলে রয়েছে| মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব আহমেদ আলী তথ্য কমিশনের সদস্য নিয়োগে বিলম্ব এবং তথ্য অধিকার আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনীর বিষয়টিকেও দেরির জন্য দায়ী করেছেন| কার্যত তথ্য কমিশনে নিয়মিত শীর্ষ কর্মকর্তা না থাকায় মন্ত্রণালয়গুলোর তথ্য গোপনের এই সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কোনো জবাবদিহি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না|
সরকারি পোর্টালে তথ্যের এই ঘাটতি কোনো নতুন সংকট নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির অংশ| বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) পরিচালিত ২০২১ সালের এক গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, দেশের ১৫৩টি সরকারি ওয়েবসাইটের মধ্যে ৫৪ শতাংশের তথ্য প্রকাশের মান ছিল নিতান্তই ‘অপ্রতুল’| টিআইবির পক্ষ থেকে তখন নিয়মিত বাজেট, কর্মকর্তাদের যোগাযোগের তথ্য এবং বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশের সুপারিশ করা হলেও তা বাস্তবায়নে কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি|
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এই পরিস্থিতিকে আইনি দায়ের চরম অবমাননা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন| তিনি উল্লেখ করেন, নিয়মিত বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশে ব্যর্থতা প্রমাণ করে যে সামগ্রিকভাবে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা কীভাবে সুনির্দিষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতাকে লঙ্ঘন করে চলেছেন| তিনি মনে করেন, নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার যেহেতু শাসনব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনগণের ম্যান্ডেট লাভ করেছে, সেহেতু তাদের এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি| ঔপনিবেশিক আমলের গোপনীয়তার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে প্রশাসনিক উন্মুক্ততার আধুনিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার কাজে সরকারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি| ডিজিটাল বাতায়নগুলো যেন নিছক প্রদর্শনীতে পরিণত না হয়ে জনগণের তথ্যের প্রকৃত প্ল্যাটফর্ম হতে পারে, সেই লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি|
তথ্যসূত্র: ডেইলি স্টার


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category