সারাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ার প্রায় ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতির আশানুরূপ কোনো উন্নতি হয়নি| উল্টো প্রতিদিন লাফিয়ে বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিল| রোগটি ইতোমধ্যে দেশের সবকটি (৬৪টি) জেলাতেই হানা দিয়েছে, তবে রাজধানী ঢাকাসহ ১০টি জেলায় সংক্রমণের তীব্রতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে| স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, হাম ও এর আনুষঙ্গিক উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা প্রায় দুই লাখের কাছাকাছি এবং মৃত্যুর সংখ্যাও হাজার ছাড়ানোর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে| সরকারের পক্ষ থেকে গণটিকাদান চালিয়ে শতভাগেরও বেশি কাভারেজের দাবি করা হলেও মাঠপর্যায়ে সংক্রমণ না কমে উল্টো জটিলতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সার্বিক টিকাদান কর্মসূচির কার্যকারিতা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা|
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, হাম ও এর উপসর্গে এ পর্যন্ত সারাদেশে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার ৬০ জনে, যার মধ্যে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৮৩১ জন সুস্থ হয়েছেন| তবে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৯৯৭ জন| আক্রান্ত ও মৃত্যুর পরিসংখ্যানে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে রাজধানী ঢাকা| জেলায় মোট হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা ৫৮ হাজার ৬৬৬ জন, যার মধ্যে নিশ্চিত রোগী ১০ হাজার ৮০৫ জন এবং মারা গেছেন ৪১৪ জন| আক্রান্তের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চট্টগ্রামে মোট রোগী ৮ হাজার ২৭ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ১৬ জনের| এর বাইরে বরিশালে আক্রান্ত ৭ হাজার ২০৮ জন ও মৃত্যু ৫৫ জন, কক্সবাজারে আক্রান্ত ৬ হাজার ৪২০ জন ও মৃত্যু ২০ জন এবং সিলেটে আক্রান্ত ৬ হাজার ৯৮ জনের মধ্যে ৬৪ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে| সংক্রমণের শীর্ষ তালিকায় থাকা বাকি জেলাগুলো হলো নোয়াখালী (৫ হাজার ৮৯৯ জন), ফরিদপুর (৫ হাজার জন), কুমিল্লা (৪ হাজার ৫০৩ জন), পটুয়াখালী ও ময়মনসিংহ|
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য বিভাগ গত এপ্রিল ও মে মাসে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের লক্ষ্য করে দেশব্যাপী জরুরি গণটিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করে| সেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ ১৬ হাজার শিশু| স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দাবি অনুযায়ী, ওই ক্যাম্পেইনে ১ কোটি ৯৬ লাখ ৬১ হাজারেরও বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে, যা কাভারেজের হিসাবে ১০৩ শতাংশেরও বেশি| কিন্তু কাভারেজ শতভাগ ছাড়িয়ে যাওয়া সত্ত্বেও পাঁচ মাস ২৩ দিন পর এসেও সংক্রমণের লাগাম টানা সম্ভব হয়নি| বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের জনসংখ্যাভিত্তিক হিসাবেই বড় ধরনের গলদ ছিল| কারণ, একই বয়সী শিশুদের লক্ষ্য করে জুন মাসে পরিচালিত ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল বিতরণ কর্মসূচিতে দেখা গেছে শিশুর সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ| ফলে কয়েক লাখ ঝুঁকিপূর্ণ শিশু যে প্রাথমিক ক্যাম্পেইনে টিকার বাইরে রয়ে গেছে, তা স্পষ্ট|
হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসার পেছনে শুরুতেই সংকট অস্বীকার করা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় টিকা সংগ্রহে বিলম্বকে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা| রোগতত্ত্ববিদ ও জাতীয় হাম-রুবেলা নির্মূল যাচাই কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, প্রাদুর্ভাবের শুরুতেই এটিকে জরুরি স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়া ছিল বড় ভুল| হামের সংক্রমণ আটকাতে হলে কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর অন্তত ৯৫ শতাংশকে টিকার আওতায় আনা বাধ্যতামূলক| অথচ ঘোষিত ১০৩ শতাংশ কাভারেজ কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ ছিল, বাস্তবে তৃণমূল পর্যায়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নজরদারি করা হয়নি| এছাড়া পাঁচ থেকে পনেরো বছর বয়সী বড় শিশুরাও এই দফায় সংক্রমণের শিকার হচ্ছে, যাদের টিকার আওতায় আনা হয়নি|
টিকা ব্যবস্থাপনার গভীর সংকটের বিষয়টি সম্প্রতি জাতীয় সংসদেও উঠেছে| স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে ইউনিসেফ ও গ্যাভির (GAVI) মাধ্যমে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইনের আওতায় হামের টিকা সংগ্রহ করা হতো| কিন্তু ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার এই প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি বদলে সরাসরি উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা কেনার নীতি নেয়| আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে জরুরি জীবনরক্ষাকারী টিকার ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি না নেওয়ার সতর্কবার্তা দেওয়া হলেও তা উপেক্ষা করা হয়| এর পরিণতিতে ফাইল ও কাগজপত্রের জটিলতায় আন্তর্জাতিক গুদামে মজুত থাকা সত্ত্বেও অর্থ ছাড় ও অনুমোদনের অভাবে দীর্ঘদিন দেশে টিকার চালান পৌঁছায়নি| একই সঙ্গে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ২০২৫ সালে একটি বিশেষ সম্পূরক ক্যাম্পেইন বাতিল করায় নিয়মিত রুটিন টিকাদানও বড় ধরনের ধাক্কা খায়|
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বর্তমানে হাসপাতালে আসা শিশুদের মধ্যে সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করতে না পারায় মৃত্যুর হার বাড়ছে| বিশেষ করে ঢাকার বাইরের জেলাগুলো থেকে সংকটাপন্ন অবস্থায় দেরিতে নিয়ে আসা শিশুদের অনেকেই দ্রুত প্রাণ হারাচ্ছে| বিশেষজ্ঞদের স্পষ্ট তাগিদ, কোনো নির্দিষ্ট বয়সভিত্তিক বিভ্রান্তিতে না থেকে অবিলম্বে বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে বাদ পড়া শিশুদের জন্য জরুরি বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম শুরু করতে হবে এবং হাসপাতালগুলোতে হামের জটিল রোগীদের জন্য সেকেন্ডারি ও টারশিয়ারি স্তরের চিকিৎসা সুবিধা দ্রুত নিশ্চিত করতে হবে|