সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় একের পর এক ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল চিহ্নিত হওয়ার ঘটনা জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ভৌগোলিক অবস্থান এবং ভূতাত্ত্বিক কাঠামোর কারণে ঢাকা বরাবরই ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকা একটি শহর হিসেবে পরিচিত। তবে গত কয়েক বছরে ঢাকার ১৬ থেকে ৪০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে নিয়মিতভাবে ছোট ও মাঝারি মাত্রার কম্পন অনুভূত হওয়া ভূ-তাত্ত্বিকদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। এই ঘনঘন কম্পন কি কেবল সাধারণ ভূ-প্রাকৃতিক পরিবর্তনের অংশ, নাকি এটি ভবিষ্যতে বড় কোনো ভূমিকম্পের পূর্বাভাস—তা নিয়ে এখন চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
সবশেষ ২২ জুন ২০২৬ তারিখে অনুভূত ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল ঢাকা থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার দূরে। এর আগে ২০২৫ সালের নভেম্বরে নরসিংদীর মাধবদীতে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার শক্তিশালী এক কম্পন অনুভূত হয়েছিল, যা ছিল গত কয়েক দশকের মধ্যে দেশের অভ্যন্তরে হওয়া অন্যতম ভয়াবহ ভূমিকম্প। ওই কম্পনের প্রভাবে ঢাকা, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জ মিলিয়ে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল এবং শত শত মানুষ আহত হয়েছিল। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বড় ওই ভূমিকম্পের ঠিক পরপরই ওই অঞ্চলটিতে আরও কয়েকটি ছোট কম্পন অনুভূত হয়েছিল। এই ঘনঘন কম্পনের ধারাটি বিশেষজ্ঞদের নিকট বিশেষ সতর্কবার্তার মতো মনে হচ্ছে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত দেড় বছরে ঢাকা, গাজীপুর, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জকে কেন্দ্র করে অসংখ্যবার ভূমি কেঁপে উঠেছে। প্রতিটি ঘটনাই ঢাকা শহর থেকে খুব কাছাকাছি দূরত্বে ঘটছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের গবেষকরা মনে করছেন, এগুলো নতুন কোনো চ্যুতি রেখা বা ফল্টের সক্রিয় হওয়ার বহিঃপ্রকাশ হতে পারে। অনেক সময় ভূ-অভ্যন্তরে দীর্ঘকাল নিষ্ক্রিয় থাকা পুরোনো ফল্টগুলোও হঠাৎ সক্রিয় হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ইউরেশীয়, ইন্ডিয়ান ও বার্মিজ—এই তিন বিশাল টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলের কাছে হওয়ায় এখানে অস্থিরতা থাকাটাই স্বাভাবিক।
তবে ঢাকার জন্য আসল ভয়ের কারণ সাত বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প তৈরি করতে সক্ষম চ্যুতি রেখাগুলো। বুয়েটের ভূমিকম্প গবেষকদের মতে, ঢাকার দেড়শো থেকে দু’শো কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে এমন বেশ কিছু ফল্ট রয়েছে যেগুলোতে ঐতিহাসিকভাবে বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়েছে। যেমন, ১৯১৮ সালে শ্রীমঙ্গলে ৭ দশমিক ৬ মাত্রার এবং ১৮৮৫ সালে বগুড়ার শেরপুরে ৭ দশমিক ১ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প ঘটেছিল। এসব শক্তিশালী ভূমিকম্পের এক একটি ‘রিটার্ন পিরিয়ড’ বা ফিরে আসার চক্র থাকে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, বড় মাত্রার ভূমিকম্পগুলোর জন্য নির্ধারিত সময়সীমা যেকোনো সময় পূর্ণ হতে পারে। ঢাকা শহর যদি এই বড় কম্পনের শিকার হয়, তবে তা যে ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত বিপর্যয় ডেকে আনবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
ঢাকার ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার পেছনে ভূতাত্ত্বিক গঠনের পাশাপাশি নগরায়নের ধরনকেও দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। ভূতত্ত্ববিদদের মতে, রমনা, মগবাজার বা ধানমন্ডির মতো এলাকার মাটি তুলনামূলকভাবে শক্ত লাল মাটির স্তরের ওপর অবস্থিত, যা কিছুটা নিরাপদ। অন্যদিকে, ঢাকার পূর্ব ও পশ্চিমের নতুন আবাসিক এলাকাগুলো মূলত বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদীর তীরবর্তী নিচু জলাভূমি ভরাট করে তৈরি করা হয়েছে। এসব এলাকায় মাটি নরম হওয়ায় ভূমিকম্পের সময় ‘লিকুইফ্যাকশন’ বা মাটি তরল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। ফলে সঠিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া এসব এলাকার ভবনগুলো ভূমিকম্পের সময় কতটা টিকে থাকবে, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন থেকেই যায়।
ঢাকাকে ঘিরে সবচেয়ে বড় বিপদের নাম ‘ব্লাইন্ড ফল্ট’ বা গোপন চ্যুতি রেখা। এই ফল্টগুলো ভূ-পৃষ্ঠ পর্যন্ত বিস্তৃত না হওয়ায় সাধারণ ম্যাপে বা স্যাটেলাইট ইমেজে এদের অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন। বাংলাদেশে এমন দুটি চিহ্নিত ব্লাইন্ড ফল্ট রয়েছে ময়মনসিংহে ও রংপুরে। এগুলো শনাক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় ভূমিকম্পের আগে কোনো পূর্বাভাস পাওয়া যায় না। এছাড়া নরসিংদীর ওপর দিয়ে চলে যাওয়া প্লেট বাউন্ডারি বা ডাউকি ফল্টগুলোর দিকেও নজর রাখতে হচ্ছে গবেষকদের। অতীতের তথ্য বলছে, ডাউকি ফল্টে ১৮৯৭ সালে ৮ দশমিক ১ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়েছিল, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম স্মরণীয় দুর্যোগ।
ভূমিকম্প গবেষক অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারী মনে করেন, ঢাকার ঝুঁকি মোকাবিলায় কেবল এলাকা নির্বাচন করলেই হবে না, বরং প্রতিটি ভবনের কাঠামোগত মান নিশ্চিত করা জরুরি। পুরান ঢাকার সরু রাস্তাগুলো দুর্যোগের সময় ত্রাণ ও উদ্ধারকাজ পরিচালনায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। একইভাবে, নতুন ঢাকার তথাকথিত পরিকল্পিত এলাকাগুলোতে যদি নিয়ম না মেনে বহুতল ভবন তৈরি করা হয়, তবে তা হবে আত্মঘাতী। প্রতিটি এলাকাতেই ভবনগুলোর ভূমিকম্প সহনশীলতা নিয়মিত পরীক্ষা করা উচিত।
সাম্প্রতিক ভূমিকম্পগুলো সরাসরি বড় কোনো ধ্বংসের বার্তা না দিলেও, এগুলো আমাদের অবহেলার প্রতি এক ধরনের সতর্কবার্তা। ঢাকা শহরকে ভূমিকম্পমুক্ত রাখা হয়তো সম্ভব নয়, কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা, বিল্ডিং কোড মেনে নির্মাণকাজ পরিচালনা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। সরকার ও নগর পরিকল্পনাবিদদের এখনই সময় ঢাকার ভূ-তাত্ত্বিক ঝুঁকিগুলোকে মাথায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ করা। অন্যথায়, বড় কোনো দুর্যোগের মুখে পড়লে আমাদের প্রস্তুতিহীনতা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হিসেবে গণ্য হবে। এখনকার ছোট ছোট কম্পনগুলো যেন সেই ভবিষ্যতের বড় কোনো ঝড়ের আগে সংকেত হয়ে না আসে—এটাই এখন সাধারণ মানুষের কাম্য।

তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা