বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের মধ্যকার ঐতিহাসিক সম্পর্ককে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে আরও সুদৃঢ় করার তাগিদ দিয়েছেন দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিরা। বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পর বাণিজ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে একটি নিশ্ছিদ্র মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রোববার (১৭ মে) জাতীয় সংসদ ভবনে স্পিকারের কার্যালয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম-এর সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত ফরাসি রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শারলে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এলে এই বিষয়গুলো প্রধান হয়ে ওঠে।
বৈঠকে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ফ্রান্সের অসামান্য অবদানের কথা স্মরণ করে বলেন, স্বাধীনতার পর যে কয়েকটি দেশ খুব দ্রুত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়ে অনন্য বন্ধুত্বের পরিচয় দিয়েছিল, ফ্রান্স তাদের মধ্যে অন্যতম। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ফ্রান্স হচ্ছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ও সার্বিক বাণিজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম অংশীদার। কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, এলডিসি থেকে বাংলাদেশের চূড়ান্ত উত্তরণ ঘটলে ইইউ বাজারে চলমান শুল্কমুক্ত সুবিধা বা ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ (ইবিএ) সুবিধা বাতিল হয়ে যেতে পারে। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ইউরোপের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ হিসেবে ফ্রান্সের নীতিগত সমর্থন এবং ইইউ’র সঙ্গে একটি কার্যকর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি, যা নিয়ে আজকের বৈঠকে উভয় পক্ষই জোরালো একমত পোষণ করেছেন।
অর্থনৈতিক এই কৌশলগত আলোচনার পাশাপাশি দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও গণতান্ত্রিক উত্তরণের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। স্পিকার ফরাসি রাষ্ট্রদূতকে জানান, বাংলাদেশের মানুষ স্বভাবতই গণতন্ত্রকামী এবং তারা সব সময়ই স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে আপসহীন লড়াই করে এসেছে। গত ১৬ বছর ধরে বিগত শেখ হাসিনা সরকারের মাফিয়াতান্ত্রিক শাসন এদেশের গণতন্ত্রকে চরমভাবে বিপন্ন করে তুলেছিল। কিন্তু নিজেদের বাকস্বাধীনতা ও ভোটাধিকার রক্ষায় হাজারো সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে দেশে আজ পুনরায় প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফরাসি রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শারলে বাংলাদেশের এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রশংসা করেন। তিনি দেশে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অত্যন্ত স্বচ্ছ, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ আখ্যা দিয়ে বলেন, এই সফল আয়োজনের মাধ্যমেই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা আবার সঠিক পথে ফিরে এসেছে। পাশাপাশি তিনি নবনির্বাচিত স্পিকার হিসেবে হাফিজ উদ্দিন আহমদকে ফরাসি সরকারের পক্ষ থেকে উষ্ণ অভিনন্দন জানান।
দ্বিপক্ষীয় এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বৈঠকে দুই দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধি, আন্তঃসংসদীয় সম্পর্ক জোরদার, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং রাজনীতিতে নারীদের ক্ষমতায়ন নিয়ে বিস্তারিত ও খোলামেলা মতবিনিময় হয়। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, আকাশপথের নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মতো ফ্রান্স ও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক যৌথ স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর প্রেক্ষাপটে এই আলোচনা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও একধাপ এগিয়ে নেবে বলে মনে করা হচ্ছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর পেশাদারিত্ব ও গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন ফরাসি রাষ্ট্রদূত। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুসংহত করতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের আগামী অধিবেশনে সভাপতি পদে বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাবশালী রাষ্ট্র হিসেবে ফরাসি সরকারের আন্তরিক সমর্থন ও নিবিড় সহযোগিতা কামনা করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।