জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগের নতুন ফিটলিস্ট তৈরি নিয়ে এক নজিরবিহীন ও বিতর্কিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক প্রথা ভেঙে, মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক নোটিশ প্রকাশ না করেই সরাসরি ফোনে ডেকে পছন্দের প্রার্থীদের ভাইভা বা মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এমন চরম লুকোচুরি ও গোপনীয়তার কারণে সচিবালয়ের ভেতরে-বাইরে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। বঞ্চিত ও নিরপেক্ষ কর্মকর্তারা মনে করছেন, মেধা ও পেশাদারি যোগ্যতার চেয়ে উচ্চপর্যায়ের আমলাদের ব্যক্তিগত পছন্দ এবং রাজনৈতিক আনুগত্যকেই ডিসি নিয়োগে নিয়ামক হিসেবে দাঁড় করানো হচ্ছে।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর, পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া ২১ জন ডিসিকে বেছে বেছে প্রত্যাহার করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, প্রত্যাহার হওয়া এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জামায়াতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এবং নির্বাচনে নির্দিষ্ট দলের পক্ষে কাজ করার গুরুতর অভিযোগ ছিল। এই রদবদলের পর শূন্য পদ পূরণের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তৈরি করা ডিসি ফিটলিস্ট বাতিল করে সম্পূর্ণ নতুন করে তালিকা প্রণয়নের উদ্যোগ নেয় বর্তমান সরকার। তবে নতুন এই তালিকা তৈরির প্রক্রিয়াও এখন চরম বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। স্মরণযোগ্য যে, এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কোটি টাকার বিনিময়ে ডিসি নিয়োগের অভিযোগ প্রশাসনে ব্যাপক কলঙ্কের জন্ম দিয়েছিল; আর বর্তমানের এই ‘গোপন ভাইভা’ সেই প্রশাসনিক আস্থার সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।
অনুসন্ধান এবং বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, গত মঙ্গলবার ও রোববার কোনো প্রকাশ্য বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ২৮তম ব্যাচের ৪৮ জন এবং ২৯তম ব্যাচের ২১ জন মিলিয়ে মোট ৬৯ জন কর্মকর্তাকে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের দোহাই দিয়ে ফোনে ডেকে ভাইভা নেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এই তালিকায় এমন অনেক কর্মকর্তার নাম রয়েছে, যারা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং সেই সরকারের প্রথম সারির সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত। এমনকি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে, ভাইভায় ডাক পাওয়া ২৯তম ব্যাচের অন্তত চারজন কর্মকর্তা রয়েছেন যারা তৎকালীন ছাত্রলীগের সুপারিশ এবং ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদে অবৈধভাবে চাকরি পেয়েছিলেন। জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়ায় বর্তমানে তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলাও চলমান রয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে ডিসি ফিটলিস্ট তৈরির জন্য মুখ্য সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব, জনপ্রশাসন, স্বরাষ্ট্র ও ভূমি সচিবদের নিয়ে একটি অত্যন্ত উচ্চপর্যায়ের মূল্যায়ন কমিটি রয়েছে। কিন্তু প্রশাসনের সাধারণ কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই কমিটির ভাইভা নিছক ‘লোক দেখানো’ একটি আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। মূলত সচিবালয়ের প্রভাবশালী আমলা কোরাম বা সরকার আগে থেকেই যাদের ডিসি হিসেবে চূড়ান্ত করে রেখেছে, তাদের নিয়োগকে হালাল করতেই এই ভাইভার আয়োজন করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় মাঠ প্রশাসনে পরীক্ষিত, নিরপেক্ষ, সৎ এবং দক্ষ কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভাইভায় ডাকাই হয়নি। কিসের ভিত্তিতে এই বাছাই করা হলো এবং কেন যোগ্যদের বঞ্চিত করা হলো— সে বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের কাছে পুরোপুরি নীরবতা পালন করছেন এবং বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
অথচ ডিসি পদে পদায়নের জন্য সরকারের একটি সুনির্দিষ্ট ও কঠোর নীতিমালা রয়েছে। সেই নীতিমালা অনুযায়ী— উপসচিব পদে পদোন্নতি পাওয়ার অন্তত এক বছর পর কোনো কর্মকর্তা ডিসি হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন। এছাড়া অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা স্থানীয় সরকার বিভাগে কমপক্ষে দুই বছরের বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা, বিগত ৫ বছরের সন্তোষজনক বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর) এবং ক্লিন রেকর্ড থাকা বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, তথ্যপ্রযুক্তি, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও ম্যাজিস্ট্রেসিতে গভীর অভিজ্ঞতা থাকার শর্ত রয়েছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এই নীতিমালার তোয়াক্কা না করে, যোগ্যতা ও অতীত রেকর্ডের বদলে অদৃশ্য ইশারায় এবং ফোনে ডেকে যেভাবে জেলা প্রশাসক বাছাই করা হচ্ছে, তা পুরো মাঠ প্রশাসনের চেইন অব কমান্ড ও সুশাসনের জন্য এক বড় অশনিসংকেত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সূত্র: বায়ান্ন নিউজ