• সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ১১:১৩ পূর্বাহ্ন
Headline
বাড়ছে সশস্ত্র ছিনতাই-হত্যা, ওপারে পাচারের শিকার নারীরা পাবিপ্রবিতে কর্মকর্তাদের ‘অফিস ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড প্রফেশনালিজম’ বিষয়ক প্রশিক্ষণ চিকিৎসক নাসিরের ওপর হামলার প্রতিবাদ: কর্মস্থলে নিরাপত্তার দাবিতে পাবনায় চিকিৎসকদের মানববন্ধন মসজিদে মানত দিতে গিয়ে অপহৃত তরুণ-তরুণী: ২৪ ঘণ্টার যৌথ অভিযানে উদ্ধার, পালাল দুর্বৃত্তরা গবেষণাধর্মী ও সবুজ ক্যাম্পাসের প্রত্যয়ে পাবিপ্রবির নতুন উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নিলেন ড. শামীম স্লিপ ডিভোর্স নোটিশ ছাড়াই ফোনে ডাক: ডিসি নিয়োগের ফিটলিস্ট ঘিরে প্রশাসনে তোলপাড় সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা তলানিতে ঠেকছে: হাসনাত আব্দুল্লাহ সব বাধা কাটল আইভীর: ১২ মামলাতেই জামিন বহাল, শিগগিরই কারামুক্তি প্রবাসীদের অধিকার আদায়ে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি: দক্ষিণ কোরিয়ায় আসিফ মাহমুদকে নাগরিক সংবর্ধনা

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তাপে এশিয়ায় হাহাকার: জ্বালানি ও খাদ্য সংকটে বদলাচ্ছে ভূরাজনীতি

Reporter Name / ৪ Time View
Update : রবিবার, ১৭ মে, ২০২৬

ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে বেজে ওঠা যুদ্ধের দামামা পুরো এশিয়ার অর্থনীতি ও রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে এক গভীর খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান ধমনী হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালী ও উপসাগরীয় অঞ্চলে অস্থিতিশীলতার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামে যে আগুন লেগেছে, তার সরাসরি আঁচ এসে পড়ছে এশিয়ার দেশগুলোতে। জ্বালানির তীব্র সংকট, লোডশেডিং, কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং আকাশছোঁয়া মূল্যস্ফীতির কারণে এশিয়া মহাদেশ এখন এক ভয়াবহ বাঁক বদলের মুখোমুখি। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট কেবল সাময়িক কোনো ধাক্কা নয়; বরং এটি দীর্ঘমেয়াদে এশিয়ার দেশগুলোর জ্বালানি নীতি, অর্থনৈতিক কাঠামো এবং পারস্পরিক ভূরাজনৈতিক সম্পর্ককে আমূল পাল্টে দিতে যাচ্ছে। পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ, তা বোঝা যায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাম্প্রতিক এক পদক্ষেপে। করোনা মহামারির পর গত ১০ মে তিনি আবারও দেশবাসীকে ঘরে থেকে কাজ করার ও বিদেশ ভ্রমণ কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন। শুধু ভারত নয়, থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনসহ এশিয়ার অধিকাংশ দেশই এখন নাগরিকদের ব্যয় সংকোচন ও সংযমের পথে হাঁটার নির্দেশ দিচ্ছে।

জ্বালানির এই তীব্র হাহাকার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে শুরু করে খাদ্যনিরাপত্তাকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলেছে। পাকিস্তান ও ফিলিপাইনের মতো যেসব দেশে জ্বালানির দামে সরকারি নিয়ন্ত্রণ নেই, সেখানে দাম সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে। সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে মজুত তলানিতে নেমে আসা। আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকদের তথ্যমতে, বিশাল অর্থনীতির দেশ ইন্দোনেশিয়ার হাতে বর্তমানে মাত্র তিন সপ্তাহের এবং ভিয়েতনামের হাতে এক মাসেরও কম সময়ের জ্বালানি মজুত রয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের এলএনজি (LNG) ও জ্বালানি তেলের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে দীর্ঘায়িত হচ্ছে লোডশেডিং। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে কৃষকরা মাত্র দুই লিটার ডিজেলের জন্য পেট্রলপাম্পে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করছেন। জ্বালানির পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলে উৎপাদিত ইউরিয়া সারের দাম যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় কৃষি খাতে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। উৎপাদন খরচ অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় এশিয়ার লাখ লাখ কৃষক ধান চাষের পরিধি কমিয়ে দিচ্ছেন। আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (IRRI) গবেষকরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে পুরো এশিয়ায় অচিরেই এক ভয়াবহ খাদ্য সংকট বা দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে।

কৃষির পাশাপাশি এশিয়ার শিল্প খাতও এক অভূতপূর্ব স্থবিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাতের (RMG) উৎপাদন ব্যয় ইতিমধ্যে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সামগ্রিক কারখানা উৎপাদন প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। জাপানের বিখ্যাত খাদ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ক্যালবি পেট্রোকেমিক্যাল কাঁচামাল ‘ন্যাফথা’-এর দাম বেড়ে যাওয়ায় খরচ বাঁচাতে তাদের প্যাকেজিংয়ের রং রঙিন থেকে সাদাকালোতে রূপান্তর করেছে। ন্যাফথার তীব্র সংকটে এশিয়ার অনেক প্লাস্টিক কারখানা ইতিমধ্যে তাদের উৎপাদন চুক্তি বাতিল করে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে। অর্থনীতির এই পক্ষাঘাতগ্রস্ত অবস্থায় ফিলিপাইনে মূল্যস্ফীতি ৭.২ শতাংশে পৌঁছেছে এবং ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি মহামারির পর সর্বনিম্ন ২.৮ শতাংশে নেমে এসেছে। জাতিসংঘ ও জার্মান গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিয়েল ইনস্টিটিউটের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে দক্ষিণ এশিয়ার জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৬ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে এবং ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। দেশীয় বাজারে দাম স্থিতিশীল রাখতে ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোকে প্রতিদিন যথাক্রমে ১৫ কোটি ও ৬ কোটি ডলার ভর্তুকি গুনতে হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে কোনোভাবেই টেকসই নয়।

অর্থনৈতিক এই চরম অস্থিরতা এশিয়ার দেশগুলোতে রাজনৈতিক বিস্ফোরণেরও ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে। জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে ইতিমধ্যে পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ফিলিপাইন এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় ব্যাপক বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে, যা অনেককেই ২০২২ সালের শ্রীলঙ্কার সরকার পতনের স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে। তবে এই দুর্যোগের মধ্যেও কিছু দেশ বিকল্প পথে নিজেদের লাভবান হওয়ার সুযোগ খুঁজছে। প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লার বিশাল মজুত থাকা অস্ট্রেলিয়া তাদের সম্পদ রপ্তানি করে ব্রুনেই, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে নতুন অর্থনৈতিক সমীকরণ তৈরি করছে। অন্যদিকে, সবচেয়ে বড় চমক দেখাচ্ছে চীন। জ্বালানি তেলের বিশাল কৌশলগত মজুত কাজে লাগিয়ে বেইজিং এখন তাদের মিত্রদেশ ভিয়েতনাম ও লাওসে পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি শুরু করেছে। এমনকি বেইজিংয়ের প্রভাব এতটা বিস্তৃত হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম মিত্র অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকেও জেট ফুয়েল নিশ্চিত করতে বেইজিংয়ের দ্বারস্থ হতে হয়েছে।

এই চরম সংকট এশিয়ার দেশগুলোকে একটি বড় ইতিবাচক শিক্ষাও দিচ্ছে—আর তা হলো আঞ্চলিক ঐক্যের অপরিহার্যতা। হাজার মাইল দূরের এক যুদ্ধের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ার পর এশিয়ার দেশগুলো এখন নিজেদের পুরোনো বিরোধ ভুলে পারস্পরিক সহযোগিতার দিকে ঝুঁকছে। সম্প্রতি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ানের (ASEAN) নেতারা একটি যৌথ জ্বালানি মজুত গড়ে তোলার বিষয়ে নিবিড় আলোচনা শুরু করেছেন। এর পাশাপাশি এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) ২০৩৫ সালের মধ্যে পুরো এশিয়ার বিদ্যুৎ গ্রিডকে একটি একক নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে ৫ হাজার কোটি (৫০ বিলিয়ন) ডলারের সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এতদিন প্রতিবেশীর ওপর নির্ভরশীল হওয়ার ভয়ে যে দেশগুলো নিজেদের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থা ভাগাভাগি করতে নারাজ ছিল, অস্তিত্বের সংকটে পড়ে আজ তারাই এক হয়ে একটি সমন্বিত ও সুরক্ষিত এশিয়া গড়ার স্বপ্ন দেখছে।

তথ্যসূত্র: দ্যা ইকোনমিস্ট


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category