• শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৩০ পূর্বাহ্ন
Headline
বিএনপি সর্বশক্তি দিয়ে নিশ্চিত করবে আইন সবার জন্য সমান: প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল চালাবে বিদেশি অপারেটররা রাশিয়া থেকে সরাসরি ইউরিয়া সার আমদানির প্রস্তাব অনুমোদন ২শ’ বছরের ইতিহাসে প্রথমবার টেনেসিতে নারী বন্দির মৃত্যুদণ্ড জুলাই-আগস্টের ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের সময় বাড়াল এনবিআর রাড্ডা দখলের ঘটনায় সাংগঠনিক পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়: বিএনপিকে জামায়াত আমির ৫ অগাস্টের পরে যদু-মধু-কদু ‘সর্বেসর্বা’ হয়ে গেছে উমামা পুলিশের এন্টি টেররিজম ইউনিটের নাম পরিবর্তন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তারিখ চূড়ান্ত হয়নি: ইসি সচিব তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ আগামী অর্থবছরে শুরু হবে: ত্রাণমন্ত্রী

তথ্য অধিকার আইন: কাগজে আছে, প্রয়োগে নেই

Reporter Name / ৬ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় যেকোনো সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো তথ্য অধিকার আইন। রাষ্ট্রের যেকোনো সাধারণ নাগরিক এই আইনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য জানার অধিকার রাখেন। কিন্তু আমাদের দেশে এই আইনটি প্রণীত হওয়ার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সাধারণ মানুষের মাঝে এর ব্যবহার ও সচেতনতা নিয়ে যে ভয়াবহ ও হতাশাজনক চিত্র উঠে এসেছে, তা যেকোনো সচেতন নাগরিককে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলবে। সম্প্রতি পরিচালিত একটি বিস্তৃত জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে যে, বাংলাদেশের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ দেশের তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। একটি যুগান্তকারী আইন থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ যদি সেটির অস্তিত্ব সম্পর্কেই না জানেন, তবে সেই আইনের সুফল কখনোই তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে না। কাগজ-কলমে আইন থাকলেও বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে যে আমরা কতটা পিছিয়ে আছি, এই পরিসংখ্যানটি তারই এক নগ্ন প্রতিচ্ছবি।

২০২৫ সালে পরিচালিত একটি বিশেষ জরিপের ভিত্তিতে এই উদ্বেগজনক তথ্যগুলো সামনে এসেছে। গত মঙ্গলবার রাজধানীর দ্য ডেইলি স্টার সেন্টারে ‘আন্তর্জাতিক তথ্য জানার অধিকার দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে এই জরিপের ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হয়। ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই) দেশব্যাপী প্রায় ৩ হাজার ২০০ জন মানুষের ওপর এই বিশদ জরিপটি পরিচালনা করে। জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, দেশের মাত্র ১০ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে অবগত আছেন। যদিও ২০১৯ সালে পরিচালিত আগের একটি জরিপে এই সচেতনতার হার ছিল মাত্র ৭ দশমিক ৭ শতাংশ। সেই তুলনায় সচেতনতা কিছুটা বাড়লেও, দীর্ঘ কয়েক বছরে এই বৃদ্ধির হার একেবারেই নগণ্য এবং হতাশাব্যঞ্জক।

সম্মেলনে এই জরিপের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ‘আরটিআই সার্ভে ২০২৬’-এর প্রধান গবেষক অনন্যা রায়হান। তিনি তার উপস্থাপনায় তথ্য অধিকার আইনের বর্তমান অবস্থা, সাধারণ মানুষের ধারণা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাগুলোর নানা দিক অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তুলে ধরেন। জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এই আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে মূলত দুটি পক্ষ রয়েছে—একদিকে সাধারণ নাগরিক বা তথ্যপ্রত্যাশী, অন্যদিকে তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা বা আপিল কর্তৃপক্ষ। জরিপে উঠে এসেছে যে, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং আপিল কর্তৃপক্ষ সাধারণত তথ্য অধিকার আইনটিকে ইতিবাচক হিসেবেই মূল্যায়ন করেন। কিন্তু আইনটিকে তারা গুরুত্ব দিলেও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে তাদের নানামুখী সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। বিশেষ করে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের চরম অভাব, তথ্যের দুর্বল নথিপত্র ব্যবস্থাপনা বা ডকুমেন্টেশন এবং অত্যন্ত দুর্বল ডিজিটাল অবকাঠামোর কারণে তারা চাইলেও অনেক সময় সঠিক সেবা প্রদান করতে পারেন না।

অন্যদিকে, সাধারণ নাগরিকদের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং তা বেশ নেতিবাচক। নাগরিকরা মনে করেন যে, যখনই তারা কোনো সরকারি বা বেসরকারি দপ্তরে তথ্য চাইতে যান, তখন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে চরম অনীহা প্রকাশ করেন। অনেক ক্ষেত্রে তথ্যপ্রত্যাশীকে সন্দেহের চোখে দেখা হয় এবং তাদের সাথে একেবারেই অসহযোগিতামূলক আচরণ করা হয়। নাগরিকদের এই অভিযোগ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, আমাদের আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এখনো গোপনীয়তার সংস্কৃতি প্রবলভাবে বিরাজমান। সাধারণ মানুষকে তথ্য দেওয়াটা তারা তাদের দায়িত্ব মনে করার পরিবর্তে একধরনের উপদ্রব হিসেবেই বেশি বিবেচনা করেন।

তথ্য চাওয়ার পর প্রাতিষ্ঠানিক যে স্বীকৃতি বা আনুষ্ঠানিক প্রাপ্তিস্বীকার পত্র দেওয়া হয়, সেটির ক্ষেত্রেও এক ভয়াবহ অবনতি লক্ষ্য করা গেছে। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে যেখানে ৭৫ দশমিক ৪ শতাংশ ক্ষেত্রে তথ্য অধিকারের আবেদনের আনুষ্ঠানিক প্রাপ্তিস্বীকার বা অ্যাকনলেজমেন্ট দেওয়া হতো, ২০২৫ সালে তা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়ে ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এসেছে। এটি একটি অত্যন্ত গুরুতর সমস্যা। কারণ, একজন আবেদনকারী যদি তার আবেদনের বিপরীতে কোনো আনুষ্ঠানিক রসিদ বা প্রাপ্তিস্বীকার পত্র না পান, তবে তিনি কখনোই জানতে পারবেন না যে তার আবেদনের সময়সীমা কবে শেষ হচ্ছে। এর চেয়েও বড় কথা হলো, রসিদ না থাকলে নির্দিষ্ট সময়ের পর তথ্য না পেলে তিনি আইনিভাবে আপিল করার সুযোগ থেকেও সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত হন।

এই আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে সরবরাহকারী বা সরকারি কর্মকর্তাদের দিক থেকেও একটি অবাক করা তথ্য উঠে এসেছে। জরিপে দেখা গেছে, তথ্য প্রদানের জন্য নিযুক্ত বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রায় ৬৪ শতাংশ কর্মকর্তা তাদের কর্মজীবনে কখনোই কোনো তথ্য অধিকারের আবেদন পাননি। এই পরিসংখ্যানটি প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের মাঝে সচেতনতার কতটা অভাব রয়েছে। অন্যদিকে, এই দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে অন্তত ৫১ শতাংশের এই আইনটি সঠিকভাবে প্রয়োগ করার মতো কোনো প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণই নেই। যে কর্মকর্তার কাছে মানুষ তথ্য চাইবে, সেই কর্মকর্তা নিজেই যদি আইনটি সম্পর্কে সম্যক ধারণা না রাখেন এবং আবেদনই না পান, তবে এই পুরো আইনি কাঠামোটিই এক প্রকার অকেজো হয়ে পড়ে।

এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার পাশাপাশি আরও একটি বড় শঙ্কার জায়গা হলো খোদ তথ্য কমিশনের বর্তমান অবস্থা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সম্মেলনে তথ্য কমিশন পুনর্গঠনে দীর্ঘসূত্রতার বিষয়ে তার গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে বলেন যে, বিশ্বের আর কোথাও এমন কোনো দেশ খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে আইনি বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও একটি দেশের তথ্য কমিশন দুই মাস বা দুই বছরের মতো দীর্ঘ সময় ধরে সম্পূর্ণ অকার্যকর বা নিষ্ক্রিয় অবস্থায় পড়ে থাকে। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, তথ্য কমিশনের এই দীর্ঘস্থায়ী নিষ্ক্রিয়তা দেশের সাধারণ নাগরিকদের তথ্য জানার মৌলিক অধিকারকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করেছে। একটি রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানটি যদি নিজেই বিকল হয়ে থাকে, তবে সাধারণ মানুষ কার কাছে গিয়ে ন্যায়বিচার চাইবে, সেটি এক বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তথ্য কমিশনের এই অকার্যকর অবস্থা সম্পর্কে বাংলাদেশ তথ্য কমিশনের সচিব মো. শাহ আলম সম্মেলনে উপস্থিত সবাইকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। তিনি জানান যে, কমিশনকে নতুন করে পুনর্গঠন করার জন্য ইতিমধ্যেই একটি সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ খুব দ্রুত সম্পন্ন করা হবে বলে তিনি প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, অতি অল্প সময়ের মধ্যেই দেশে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর তথ্য কমিশন পুনরায় গঠিত হবে এবং সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষায় কাজ শুরু করবে।

সম্মেলনে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের (এমজেএফ) নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে নাগরিকদের যে বাস্তব সংগ্রাম ও প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়, তার একটি নির্মম চিত্র তুলে ধরেন। তিনি দেশের বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কথা উল্লেখ করে বলেন যে, আমাদের দেশে প্রতিটি বড় মেগা প্রকল্প একটি নির্দিষ্ট বাজেট নিয়ে শুরু হয়, কিন্তু কাজ শেষ হতে হতে সেই বাজেট রহস্যজনকভাবে চার গুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়। এই ধরনের বড় ও সংবেদনশীল জায়গাগুলোতে সাধারণ মানুষ কখনোই তথ্য অধিকার আইনের প্রয়োগ করতে পারে না। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, মানুষ এসব বিষয়ে জানতে চাইলেও পদে পদে অসংখ্য প্রাতিষ্ঠানিক বাধা তৈরি করা হয়। সবচেয়ে বড় কথা হলো, ক্ষমতাশালীদের রোষানলে পড়ার একটি অদৃশ্য ভয় সাধারণ মানুষকে সবসময় তাড়া করে ফেরে। এই ভয়ের সংস্কৃতির কারণেই মানুষ দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রশ্ন করতে সাহস পায় না।

সব মিলিয়ে বলা যায়, তথ্য অধিকার আইন আমাদের দেশের জন্য একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হলেও, এর সফল বাস্তবায়ন এখনো বহু যোজন দূরে। একদিকে যেমন প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে, কর্মকর্তাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিতে হবে এবং ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন করতে হবে; ঠিক তেমনি অন্যদিকে সাধারণ মানুষকে তাদের অধিকার সম্পর্কে ব্যাপকভাবে সচেতন করে তুলতে হবে। নাগরিকদের মন থেকে ভয় দূর করে একটি তথ্যবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারলে, এই আইনটি কেবল কাগজের পাতাতেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে, বাস্তবে এর কোনো সুফলই দেশের সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে না।

তথ্যসূক্র: নিউ এজ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category