ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের পর যে বিরল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে, তাকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য এক বিশাল ‘কৌশলগত পরাজয়’ এবং রাজনৈতিক বিপর্যয় হিসেবে দেখছে বিশ্বখ্যাত সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে নেতানিয়াহু ক্ষমতায় টিকে ছিলেন, এক মাসের সম্মুখ সমরে সেই লক্ষ্যের একটিও পূরণ করতে না পারা তাকে চরম জনরোষের মুখে ফেলেছে।
গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় চমক ছিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকা। যুদ্ধবিরতির আগ মুহূর্ত পর্যন্ত নেতানিয়াহু চুক্তি স্বাক্ষর না করার জন্য ট্রাম্পকে প্রচণ্ড চাপ দিলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট তা অগ্রাহ্য করেছেন। ট্রাম্প কার্যত ইসরায়েলকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে সরিয়ে রেখে সরাসরি তেহরানের সাথে সমঝোতায় পৌঁছেছেন, যা নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত ও কূটনৈতিক পরাজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের উগ্রবাদী অংশ আশা করেছিল এই যুদ্ধের ফলে ইরানে ‘শাসন পরিবর্তন’ বা নতুন বিপ্লব ঘটবে। কিন্তু মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো শুরু থেকেই এই ধারণাকে ‘হাস্যকর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিল। নেতানিয়াহুর ঘোষিত তিনটি মূল লক্ষ্যের একটিও অর্জিত হয়নি: ১. ইরানের থিওক্র্যাটিক শাসনের পতন হয়নি। ২. ইউরেনিয়ামের মজুদ দখল করা সম্ভব হয়নি। ৩. ইরানের রাষ্ট্রীয় বা সামরিক কাঠামো ধ্বংস হয়নি। উল্টো বিশ্বের দুই সামরিক পরাশক্তির (যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল) টানা এক মাসের হামলা সামলে নিয়ে ইরানের রেভোল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি) এখন রাজনৈতিকভাবে আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।
ইসরায়েলের ভেতরেও নেতানিয়াহু এখন প্রচণ্ড চাপের মুখে। দেশটির বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার)-এ কঠোর সমালোচনা করে বলেন, “এটি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিপর্যয়। জাতীয় নিরাপত্তার মূল সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ইসরায়েল আলোচনার টেবিল থেকে সম্পূর্ণ অদৃশ্য ছিল। নেতানিয়াহুর অহংকার ও পরিকল্পনাহীনতার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে বছরের পর বছর সময় লাগবে।”
একইভাবে বামপন্থি নেতা ইয়ার গোলান এই যুদ্ধবিরতিকে ‘চরম কৌশলগত ব্যর্থতা’ বলে অভিহিত করেছেন। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘হারেৎজ’-এর সামরিক বিশ্লেষক আমোস হারেলও মনে করেন, বিশেষজ্ঞদের তোয়াক্কা না করে নেতানিয়াহুর হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণেই আজ ইসরায়েলকে এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে।
নির্বাচনের মুখে দাঁড়িয়ে নেতানিয়াহু এখন তাঁর হারানো ইমেজ ফিরে পেতে দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর হামলা বাড়িয়ে কৃতিত্ব জাহির করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, গাজা এবং লেবাননের পর এখন ইরানের ক্ষেত্রেও তাঁর ‘চূড়ান্ত বিজয়’-এর বুলি কেবল ফাঁকা প্রতিশ্রুতি হিসেবেই প্রমাণিত হয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে—ইসরায়েলি জনগণের কাছে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক উপযোগিতা আর কতটুকু অবশিষ্ট আছে?