সারাদেশের জ্বালানি তেলের বাজারে চরম অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। রাজধানীর পাম্পগুলোতে দীর্ঘ সারি আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও মানুষ চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছে না। সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত মজুত ও সরবরাহের দাবি করা হলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। একদিকে দেশের ডিপোগুলোতে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত তেলের ঘাটতি দেখা দিয়েছে, অন্যদিকে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও যুদ্ধের প্রভাবে হরমুজ প্রণালিতে আটকে আছে বাংলাদেশের জ্বালানিবাহী একাধিক জাহাজ। সব মিলিয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন কোম্পানি— পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েলের ১৫টি প্রধান ডিপোর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ একটি বিশেষ প্রতিবেদন তৈরি করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিপোগুলোতে দৈনিক চাহিদার তুলনায় গড়ে ৪০.২৩ শতাংশ জ্বালানি তেলের ঘাটতি রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা ডিজেলের ক্ষেত্রে, যার সরবরাহ কমেছে ৪০.১০ শতাংশ। অকটেনের সরবরাহ ৩৮.৮০ শতাংশ এবং পেট্রোলের সরবরাহ ৪১.৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণে ডিপোগুলো পাম্প পর্যায়ে তেল পাঠাতে হিমশিম খাচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ গ্রাহকদের ওপর।
জ্বালানি তেলের সংকট নিয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) এবং মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের তথ্যে ব্যাপক গরমিল লক্ষ্য করা গেছে। বিপিসির তথ্যমতে, গত বছরের তুলনায় চলতি বছরের মার্চে অকটেনের দৈনিক গড় বিক্রি সামান্য বাড়লেও ডিজেল ও পেট্রোল সরবরাহ কমেছে যথাক্রমে ১০ ও ১৫ শতাংশ। তবে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ও খুলনার দৌলতপুর ডিপোর ইনচার্জরা দাবি করেছেন, কোম্পানিগুলো থেকে তাদের চাহিদা অনুযায়ী তেল দেওয়া হচ্ছে না। কর্মকর্তাদের মতে, কৃত্রিম সংকট ও কালোবাজারি ঠেকাতে ২০ শতাংশ হারে কম তেল দেওয়ার ‘অঘোষিত রেশনিং’ চালু করা হয়েছে। এর ফলে অধিকাংশ পাম্পে চাহিদার মাত্র ৬০-৭০ শতাংশ তেল সরবরাহ করা হচ্ছে, যা জনদুর্ভোগ বাড়িয়ে দিয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়। দাম আরও বেড়ে যাওয়া এবং তেল পাওয়া যাবে না—এমন আশঙ্কা থেকে দেশের সাধারণ মানুষ মার্চ মাস থেকেই অতিরিক্ত জ্বালানি কেনা শুরু করে। পাম্পগুলোতে সাধারণ সময়ের চেয়ে হুট করে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সরকার সরবরাহ ও বিক্রি পর্যায়ে রেশনিং শুরু করলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বরং পাম্প পর্যায়ে রেশনিং তুলে নেওয়ার পরও ডিপো পর্যায় থেকে তেলের প্রবাহ স্বাভাবিক না হওয়ায় হাহাকার বেড়েই চলেছে। মানুষের এই ‘প্যানিক বায়িং’ বা অতিরিক্ত কেনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক জলসীমায় সৃষ্ট যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে হরমুজ প্রণালি। বর্তমানে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ ‘নরডিক পোলক্স’ এবং ৬২ হাজার টন এলপিজি বোঝাই ‘এমভি লিরেথা’ সংশ্লিষ্ট বন্দরে আটকে আছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’ হরমুজ প্রণালি থেকে মাত্র ৬০ নটিক্যাল মাইল দূরে অবস্থান করেও পারাপারের অনুমতি পাচ্ছে না। জাহাজের প্রধান প্রকৌশলী রাশেদুল হাসান জানিয়েছেন, অনুমতি চাওয়া হলেও তা মেলেনি। এই জাহাজগুলোতে বাংলাদেশের জন্য বিশাল পরিমাণ জ্বালানি পণ্য বুকিং করা রয়েছে, যা সময়মতো না পৌঁছালে দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট আরও তীব্র হবে।
জ্বালানি তেলের এই ঘাটতিকে পুঁজি করে একদল অসাধু চক্র সারাদেশে কালোবাজারি ও মজুতদারিতে মেতে উঠেছে। নওগাঁর বদলগাছিতে নির্ধারিত ১০২ টাকার বদলে ১৩০ টাকায় ডিজেল বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। জয়পুরহাটের কালাইয়ে ৮০ লিটার তেল অবৈধভাবে পাচারের সময় স্থানীয় জনতা দুজনকে আটক করেছে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে সাড়ে ১৩ হাজার লিটার অবৈধ ডিজেল জব্দ করেছে। প্রশাসন নজরদারি বাড়ানোর দাবি করলেও পাম্পের দীর্ঘ লাইন আর তেলের চড়া দাম নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
জ্বালানি সংকটের অভিঘাত কেবল পাম্প বা সড়কের যানবাহনেই সীমাবদ্ধ নেই, এর প্রভাব পড়েছে পর্যটনসহ বিভিন্ন খাতেও। যাতায়াত সংকট ও বাড়তি খরচের কারণে কুয়াকাটা ও কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় পর্যটকের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। অনেকে তেলের অভাবে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে দূরপাল্লার যাত্রা বাতিল করছেন, ফলে চরম আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। বিজয় সরণি, মহাখালী ও তেজগাঁও এলাকার পাম্পগুলোতে ছুটির দিনেও যানবাহনের দীর্ঘ লাইন নাগরিক দুর্ভোগের এক করুণ চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে।