• সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:৪৩ অপরাহ্ন
Headline
আমাদের মোহিত কামাল ভাই জেলা পরিষদের প্রশাসক-চেয়ারম্যানদের রাষ্ট্রীয় প্রটোকল নিশ্চিতে ডিসিদের নির্দেশ পাবনায় চোর সন্দেহে গণপিটুনিতে যুবকের মৃত্যু বরিশালের বাকেরগঞ্জে বোমাসদৃশ বস্তুর বিস্ফোরণে দগ্ধ ৩ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কৃতিত্ব এককভাবে কারও নয়: রিজভী স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সরকারের নির্দেশনার অপেক্ষায় ইসি: ইসি সচিব প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানেই উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর টেকসই জীবিকা: প্রতিমন্ত্রী জুলাইয়ে রেকর্ড বৃষ্টির পর আগস্টে তাপপ্রবাহ ও বন্যার ঝুঁকি খেলাধুলার মাধ্যমে মাদক-অপরাধ থেকে দূরে থাকবে তরুণরা: ত্রাণমন্ত্রী ওজন কমাতে কোন ব্যায়ামে মিলবে বেশি উপকার

আমাদের মোহিত কামাল ভাই

বাদল সৈয়দ / ১ Time View
Update : সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬

১) ১৯৭৭-৭৮
আমরা ক্লাস ফোর- ফাইভে পড়ি। কলোনির মুরুব্বিরা, স্কুলের স্যাররা সবাই কথায় কথায় মোহিত কামাল নামের এক বড়ভাইয়ের কথা বলতেন। আমাদের চেয়ে কয়েক বছরের বড়। তিনি নাকি পড়াশোনায় ‘ফাটাফাটি’ টাইপ মেধাবী। দুর্দান্ত ফুটবলার। আগ্রাবাদ নওজোয়ান ক্লাবের হয়ে বি ডিভিশনে ফুটবল খেলেন। ক্রিকেটেও নাকি দারুণ। আবার কচিকাঁচার আসরেও তাঁর অনেক ভূমিকা। লেখালেখিও নাকি করেন।
মজার ব্যাপার হলো, মোহিত কামাল ভাইকে তখনো আমি চোখে দেখিনি। তিনি সবসময় ব্যস্ত থাকেন। পড়াশোনা ছাড়া, খেলাধুলা, কচিকাঁচার আসর…। তাঁর কত্ত কাজ!
একদিন আমাদের ফুটবল টিমের ক্যাপ্টেন সেলিম ভাইকে দেখলাম বেশ সুদর্শন এক কিশোরের সাথে রিকশায় চেপে কোথায় জানি যাচ্ছেন।
বিকেলে তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার সাথে রিকশায় কে ছিল।‘
তিনি নির্লিপ্ত গলায় বললেন, ‘আমার সেঝ ভাই। মোহিত কামাল।‘
‘কী! মোহিত কামাল আপনার ভাই! আগে তো কখনো বলেননি! আমরা ওনার কত গল্প শুনি!’
সেলিম ভাই আরো নির্লিপ্ত গলায় বললেন, ‘এটা বলার মতো কিছু নাকি?’
আমি অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলাম। এতো দেখি, ‘পাড়ার যোগী ভিখ পায় না অবস্থা।‘ এত বিখ্যাত বড় ভাইকে তাঁর ছোট ভাই পাত্তা দিচ্ছে না!
যাই হোক, সে-ই প্রথম আমি আজকের বিখ্যাত লেখক এবং দেশবরেণ্য মনোরোগবিশেষজ্ঞ মোহিত কামালকে স্বচক্ষে দেখি।
২) আমরা যখন তরুণ তখন মোহিত কামাল ভাই আরেক চাঞ্চল্যের জন্ম দিলেন। লোকমুখে শুনি হুমায়ূন আহমেদ তাঁর খুব ঘনিষ্ট। তিনি তখন টেকনাফে ডাক্তার হিসেবে কর্মরত । হুমায়ূন আহমেদ তাঁর বাসায় বেড়াতে যান। তাঁর সাথে সেন্ট মার্টিন দ্বীপে বেড়াতে গিয়েই নাকি এই বিখ্যাত লেখক সেখানে বাড়ি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
হুমায়ূন আহমেদ তখন একধরনের রহস্যঘেরা গল্পগাঁথার নায়কে পরিণত হয়েছেন। আমাদের কামাল ভাই তাঁর এত ঘনিষ্ঠ! এটি শুনে আমরা খুবই রোমাঞ্চিত। রহস্যঘেরা হুমায়ূন আহমেদের মতো তিনিও আমাদের কাছে রহস্যময় হয়ে উঠলেন। কিন্তু তখনও তাঁর সাথে আমার সে অর্থে ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেনি। রাস্তাঘাটে দেখা হলেও কথা বলার সাহস হয়নি। মনে হতো খুব গম্ভীর। পাত্তা দেবেন না।
এভাবে আমাদের কলোনির সোনার টুকরাটি আমার কাছে অধরাই রয়ে গেলেন!
৩) কামাল ভাইয়ের সাথে আমার যোগাযোগ শুরু হয় ১৯৯৫ সালের দিকে। তিনি এবং তাঁর চিকিৎসক স্ত্রী তখন চট্টগ্রামে বদলি হয়েছেন। থাকেন হালিশহরে। আমিও একই এলাকায় থাকি। মূলত চিকিৎসার উদ্দেশ্যেই প্রথম তাঁর কাছে যাওয়া। প্রথম দিনেই বিনা পয়সায় চিকিৎসা ছাড়াও গরম গরম সিঙ্গারা জুটলো। সাথে অনেক গল্প। বের হয়ে মনে হলো, এত চমৎকার মানুষটিকে অযথা ভয় পেতাম কেন?
একদিন ছুটির দিনে খুব ভোরে আমার স্ত্রী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। কোনো উপায় না পেয়ে তাঁকে নিয়ে কামাল ভাইয়ের বাসায় ছুটলাম। মনে খুব অস্বস্তি- অসময়ে যাওয়ায় তাঁরা বিরক্ত হবেন না তো! তাও ছুটির দিনে?
সেদিন ভাবি এবং কামাল ভাই খুব যত্ন করে আমার স্ত্রীর চিকিৎসা করলেন। সে মোটামুটি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত বাসায় যেতে দিলেন না। ভাবি এত ঝামেলার মধ্যে কয়েকবার চা বানিয়ে খাওয়ালেন। দুপুরের দিকে কিছুটা সুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে বাসায় ফিরে এলাম।
৪) এর কিছুদিন পর কামাল ভাই উচ্চতর পড়াশোনা করতে ঢাকায় চলে এলেন। একই সাথে তাঁর লেখক খ্যাতি দিন দিন বাড়তে লাগল। তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেলেন। আমিও টুকটাক লিখি। তবে ব্যস্ততার কারণে দুজনের যোগাযোগ আবার কমে গেলো। অনেকদিন পর হঠাৎ একদিন কামাল ভাইয়ের ফোন পেলাম। আমার একটি গল্পের নাম করে বললেন, ‘ওই গল্পটা তোমার লেখা না?’
আমি উত্তর দিলাম, ‘জি।‘
‘ও! আচ্ছা। পরে কথা হবে।‘ বলে তিনি ফোন রেখে দিলেন।
আমার একটু মন খারাপ হলো। ভদ্রতা করেও তো তিনি গল্পটার ভালো-মন্দ কিছু একটা বলতে পারতেন! ভাবলাম বড় লেখকেরা এভাবেই ছোট লেখকদের অবজ্ঞা করেন।
কয়েকদিন পর এক অপরিচিত ভদ্রলোক ফোন করলেন। পরিচয় বলার পর আমি খুব অবাক। তিনি দেশের অন্যতম জাতীয় দৈনিকের সাহিত্য সম্পাদক। আমাকে আরো অবাক করে দিয়ে তিনি বললেন, ‘মোহিত কামাল ভাই আপনার একটি গল্প আমাকে পাঠিয়েছেন। খুব ভালো লেগেছে। আমরা ঠিক করেছি এবারের ঈদ সংখ্যায় আপনার গল্প ছাপাব।’
একমাত্র উঠতি লেখকেরা বোঝেন, এরকম একটি ফোন কত আনন্দের!
আমি কামাল ভাইকে ধন্যবাদ দেওয়ার জন্য ফোন করলাম। তিনি নিস্পৃহ গলায় বললেন, ‘তোমার লেখার হাত ভালো। তাই তাঁকে গল্পটা পাঠিয়েছি। কলোনির ছেলে হিসেবে আলগা খাতির করি নাই।’
৫) মোহিত কামাল ‘শব্দঘর’ নামে একটি খুব ভালো সাহিত্য পত্রিকা বের করেন। এটি বের করতে গিয়ে তাঁকে অনেক টাকা লোকসান দিতে হয়। একবার তাঁর এক বন্ধু ভাবিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘কামাল যে পত্রিকা বের করতে গিয়ে এত টাকা জলে ঢালে আপনি কিছু বলেন না?’
ভাবি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘ও কষ্ট করে রোজগার করা টাকা নিজের ভোগ-বিলাসে খরচ করে না। পত্রিকাটি ওর খুব প্রিয়। এরকম বিশুদ্ধ শখের পেছনে কিছু টাকা ও ঢালতেই পারে।’
৬) আমাদের জীবনে কিছু জ্যোতির্ময় মানুষের সাথে দেখা হয়। তাঁদের কথা ছড়িয়ে দিলে অন্যরাও আলোকিত হয়- এই সব অসাধারণ মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করা হয়। সে জন্য আমি এ ধরনের মানুষের কথা মাঝে মাঝে বলি।
মোহিত কামাল ভাই গল্প করার মতো জ্যোতির্ময় একজন মানুষ। যার আলোর ছটায় আমার মতো অনেকেই আলোকিত হয়েছিল।
ছবি- কামাল ভাই এবং আমি। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ সিজিএস কলোনির পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে।
#আসুন মায়া ছড়াই


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category