• সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৪৫ অপরাহ্ন

পথ চেয়ে থাকা স্বজনদের কাছে ফিরছে শিশুদের নিথর ও বিকৃত দেহ

Reporter Name / ৩ Time View
Update : সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

নিখোঁজ হওয়ার পর আদরের সন্তানটি হয়তো নিরাপদে ফিরে আসবে—এমন বুকভরা আশা নিয়ে পথ চেয়ে থাকেন পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু দিন শেষে সেই আশা রূপ নেয় চরম হতাশায়, যখন নিখোঁজ সন্তানের ক্ষতবিক্ষত বা পচনশীল লাশ উদ্ধার হয় পুকুর, নদী কিংবা নির্জন জঙ্গল থেকে। দেশে নিখোঁজ শিশুদের মৃতদেহ উদ্ধারের এই ভয়াবহ প্রবণতা এখন জনমনে চরম আতঙ্ক ও গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) একটি পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত পাঁচ বছরের কিছু বেশি সময়ে নিখোঁজ হওয়া অন্তত ২২০ জন শিশুর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২১ সালে ৩৮ জন, ২০২২ সালে ১৬ জন, ২০২৩ সালে ৩৯ জন, ২০২৪ সালে ৪৩ জন, ২০২৫ সালে ৪৮ জন এবং ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসেই ৩৬ জন শিশুর লাশ পাওয়া গেছে।
দেশে শিশু নিখোঁজের ঘটনা এখন কতটা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা পুলিশের পরিসংখ্যান দেখলেই স্পষ্ট বোঝা যায়। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসেই নিখোঁজ শিশুদের নিয়ে দেশজুড়ে ১৫ হাজার ৭১৭টি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৩৮ জন শিশুর আজও কোনো সন্ধান মেলেনি, যা মোট জিডির প্রায় ১৩ শতাংশ। পাড়া-মহল্লায় মাইক লাগিয়ে রিকশায় করে শিশুদের গায়ের রং, উচ্চতা ও পোশাকের বর্ণনা দিয়ে নিখোঁজ সংবাদ প্রচার করা এখন এক পরিচিত দৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সন্তানের সন্ধান চেয়ে স্বজনদের আকুতি প্রতিনিয়ত চোখে পড়ছে।
নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম ৪৮ ঘণ্টা যেকোনো শিশুকে জীবিত উদ্ধারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু মানবাধিকারকর্মী ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো, এই মহামূল্যবান সময়ে পুলিশ প্রয়োজনীয় ও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ সমন্বয়ক আবু আহমেদ ফয়জুল কবীর বলেন, পুলিশের কাছে নিখোঁজ শিশুদের উদ্ধারের জন্য পর্যাপ্ত ও কার্যকর কোনো মেকানিজম আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই পুলিশের পরামর্শে পরিবারগুলো সন্তান নিজে থেকে ফিরে আসবে—এমন আশায় মূল্যবান সময় নষ্ট করে ফেলে।
পুলিশের এই ধীরগতির সাড়াদানের সর্বশেষ ও মর্মান্তিক শিকার হয়েছে কুমিল্লার ১৩ বছর বয়সী স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের সন্তান অপ্রতিম শুক্রবার বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে কোটবাড়ীর বাসা থেকে বের হয়েছিল। এরপর সে আর ফিরে আসেনি। বাবা থানায় জিডি করার পর শনিবার দুপুর একটার দিকে লালমাই পাহাড়ের একটি নির্জন জঙ্গল থেকে তার রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ দ্রুত আলামত সংগ্রহ ও আসামি গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের প্রশংসা করে দ্রুত বিচারের আশ্বাস দিলেও আসকের ফয়জুল কবীর পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ২২ ঘণ্টা পর লাশ উদ্ধার হওয়াটা কোনোভাবেই কাম্য নয়; রাষ্ট্র নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আবারও চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের মাত্র তিন দিন আগে পাবনায় উদ্ধার হয় ১০ বছর বয়সী শিশু কামরুন্নাহার কলির লাশ। নিখোঁজ হওয়ার সাত দিন পর বাড়ির পাশের একটি পুকুর থেকে তার মৃতদেহ পাওয়া যায়। ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. রশিদুল ইসলাম জানান, ধর্ষণের পর শিশুটিকে হত্যা করা হয়েছে বলে তারা সন্দেহ করছেন এবং এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শিশু কলির বাবা কামাল প্রামাণিক জানান, একদম ছোটবেলায় দত্তক নিয়ে কলিকে তারা নিজেদের সন্তানের মতোই বড় করেছিলেন। মেয়ে ফিরে আসবে এই আশায় বুক বেঁধে থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। এই মর্মান্তিক ঘটনার পর তিনি তার নয় মাস বয়সী ছেলের নিরাপত্তায় চরম শঙ্কায় দিন পার করছেন।
শিশু সুরক্ষার এমন নাজুক পরিস্থিতিতে গত ৬ সেপ্টেম্বর জিরো মিসিং চিলড্রেন ফাউন্ডেশন আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো অভিযোগ করে, নিখোঁজ হওয়ার ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও অনেক সময় পুলিশ মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানায়। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মুহাম্মদ নুরুল হুদা মনে করেন, দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চরম দুর্বলতার কারণেই এসব ঘটনা বারবার ঘটছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মো. নুরুল ইসলাম এই পরিস্থিতির জন্য নৈতিক অবক্ষয় এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে দায়ী করেছেন। তিনি শিশু সুরক্ষায় পরিবার, সমাজ ও প্রাতিষ্ঠানিক মেকানিজম আরও শক্তিশালী করার তাগিদ দিয়েছেন।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিশু নিখোঁজের ঘটনাগুলোকে সাধারণ জিডি হিসেবে না দেখে তাৎক্ষণিক জরুরি অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। পুলিশের সাড়াদানের গতি বৃদ্ধি, সিসিটিভি ক্যামেরার ব্যাপক ব্যবহার, ডিজিটাল ট্র্যাকিং প্রযুক্তি এবং পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। তবে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এএইচএম সাহাদাত হোসাইন দাবি করেছেন, অভিযোগ পাওয়ার পরপরই পুলিশ তা যাচাই করে ছবি সংগ্রহ, সম্ভাব্য স্থানে তল্লাশি এবং প্রযুক্তির সহায়তায় কাজ শুরু করে। দীর্ঘ সময় পার হলেও নিখোঁজ শিশুর তদন্ত বন্ধ হয় না দাবি করে তিনি বলেন, পুলিশের কোনো গাফিলতি প্রমাণ হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। তবে বাস্তবতা হলো, রাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজের সম্মিলিত ও দ্রুত উদ্যোগ ছাড়া শিশুদের জন্য এই অনিরাপদ পরিবেশ কোনোভাবেই দূর করা সম্ভব নয়।
তথ্যসূত্র: নিউএজ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category