বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে নারীরা শিক্ষার ক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করলেও কর্মক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণ ও মূল্যায়নের চিত্রটি অত্যন্ত হতাশাজনক ও বৈষম্যমূলক। দেশের মোট উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর প্রায় ৩৫ শতাংশ নারী হওয়া সত্ত্বেও তাদের মধ্যে মাত্র ৫ শতাংশ নারী আয়ভিত্তিক কর্মে বা পেশাগত জীবনে যুক্ত রয়েছেন। অর্থাৎ, মেধা ও শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বিপুলসংখ্যক উচ্চশিক্ষিত নারী দেশের মূল অর্থনীতিতে কোনো দৃশ্যমান অবদান রাখতে পারছেন না। যে স্বল্পসংখ্যক নারী কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছেন, তাদের জন্যও পরিস্থিতি খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়, কারণ পুরুষদের তুলনায় তাদের আয় ২১ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কম। প্রায় প্রতিটি খাতেই নারী ও পুরুষের মধ্যে এই প্রকট মজুরি বৈষম্য স্পষ্টভাবে বিদ্যমান রয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সাম্প্রতিক এক গবেষণাপত্রে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের এই কাঠামোগত দুর্বলতা ও বৈষম্যের চিত্রটি অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৩ সালের শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে ‘বাংলাদেশে নারী-পুরুষের মজুরি ব্যবধান: প্রবণতা, কারণ ও নীতিগত করণীয়’ শীর্ষক এই বিশেষ প্রতিবেদনটি গত বৃহস্পতিবার প্রকাশ করা হয়।
আইএলও-এর এই প্রতিবেদনে দেশের সামগ্রিক কর্মসংস্থানে নারী ও পুরুষের অংশগ্রহণের হারের মধ্যকার বিশাল ব্যবধানের কথা তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে পুরুষদের কর্মসংস্থানের হার ছিল ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ, যেখানে নারীদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল মাত্র ৪০ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ, নারী ও পুরুষের কর্মসংস্থানের হারের মধ্যে ৩৭ দশমিক ৭ শতাংশীয় পয়েন্টের এক বিশাল ও উদ্বেগজনক ব্যবধান রয়ে গেছে। শুধু কর্মসংস্থানের হারেই নয়, কাজের ধরন ও গুণগত মানের দিক থেকেও নারীরা অনেক বেশি পিছিয়ে রয়েছেন। পরিসংখ্যান বলছে, দেশে কর্মরত নারীদের মধ্যে মাত্র ১৯ শতাংশ মজুরিভিত্তিক বা নিয়মিত বেতনভুক্ত কর্মী হিসেবে কাজ করেন, অথচ পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ৪৮ শতাংশ। নারীরা তুলনামূলকভাবে নিম্ন মজুরির পেশায় এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতেই বেশি কাজ করতে বাধ্য হন। মজুরিভিত্তিক কর্মসংস্থানে থাকা নারীদের ৪১ শতাংশই উৎপাদন খাতে নিয়োজিত রয়েছেন, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ২৩ শতাংশ। এছাড়া কর্মরত নারীদের ১৯ শতাংশ গৃহস্থালি বা গৃহকর্মের মতো অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে এবং ১২ শতাংশ নারী শিক্ষা খাতে নিজেদের নিয়োজিত রেখেছেন।
কর্মক্ষেত্রে নারীদের নীতিনির্ধারণী বা ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে পৌঁছানোর হার অত্যন্ত নগণ্য, যা শ্রমবাজারে তাদের পিছিয়ে থাকার আরেকটি বড় ও কাঠামোগত প্রমাণ। দেশের সরকারি ও বেসরকারি খাতের ব্যবস্থাপনা পদগুলোতে কর্মরত নারীদের সংখ্যা মাত্র ৬ দশমিক ২ শতাংশ। এই হার শুধু বৈশ্বিক গড়ের চেয়েই কম নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার গড় হারের চেয়েও বেশ হতাশাজনক। যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ব্যবস্থাপনা পদে নারীদের গড় উপস্থিতি ১০ দশমিক ৮ শতাংশ এবং বৈশ্বিক গড় ৩০ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশের এই ৬ দশমিক ২ শতাংশ হার দেশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে নারীদের অগ্রগতির পথে বিদ্যমান অদৃশ্য বাধা বা ‘গ্লাস সিলিং’-এর উপস্থিতিকে জোরালোভাবে নির্দেশ করে। উচ্চপদে নারীদের এই নগণ্য উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, পর্যাপ্ত শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রে নারীরা তীব্র বৈষম্য ও বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন।
নারীদের কর্মক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া এবং নিম্ন মজুরির কাজ বেছে নেওয়ার পেছনে পরিবারের গৃহস্থালি কাজের অসম বণ্টন একটি প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে। আইএলও-এর প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, গৃহস্থালির অবৈতনিক কাজে দিনের একটি বড় অংশ ব্যয় করার কারণে নারীদের পক্ষে উচ্চ মজুরির কাজ নেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ারে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ চরমভাবে সীমিত হয়ে যায়। সমাজ ও পরিবারের প্রথাগত কাঠামোর কারণে বাসা-বাড়িতে নারীরাই মূলত বেশি কাজ করে থাকেন। এমনকি যারা বাইরে চাকরি বা পেশাগত কাজ করেন, বাসায় ফিরে সেই কর্মজীবী নারীদেরও সপ্তাহে গড়ে ২৭ দশমিক ৭ ঘণ্টা গৃহস্থালির কঠোর শ্রমে ব্যয় করতে হয়। এর বিপরীতে, পুরুষরা গৃহস্থালির কাজে সপ্তাহে মাত্র ৭ দশমিক ৭ ঘণ্টা সময় দিয়ে থাকেন। কর্মক্ষেত্রের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, পুরুষরা সপ্তাহে গড়ে ৫১ দশমিক ৯ ঘণ্টা কাজ করেন এবং নারীরা ৪৬ ঘণ্টা কাজ করেন। কর্মরত নারীদের ৭৭ শতাংশ সপ্তাহে অন্তত ৪০ ঘণ্টা কাজ করেন, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ৯০ শতাংশ। মূলত গৃহস্থালির কাজের এই বাড়তি চাপের কারণেই নারীরা কর্মক্ষেত্রে পুরুষদের সমান সময় ও নিরবচ্ছিন্ন শ্রম দিতে পারেন না, যা তাদের ন্যায্য মজুরি ও পদোন্নতিকে সরাসরি বাধাগ্রস্ত করে।
নারী ও পুরুষের মধ্যকার এই মজুরি বৈষম্যের বিষয়টি শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতা বা পেশার ভিন্নতা দিয়ে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। প্রতিবেদনে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বলা হয়েছে যে, মজুরিভিত্তিক কর্মীদের আয়ের এই পার্থক্যের বড় একটি অংশের পেছনে কোনো দৃশ্যমান বা যৌক্তিক উপাদান দিয়ে ব্যাখ্যা দাঁড় করানো সম্ভব নয়। শিক্ষা, পেশা বা কাজের খাতের ভিন্নতা দিয়ে এই বৈষম্যের কেবল একটি আংশিক কারণ তুলে ধরা সম্ভব হলেও, মূল বৈষম্যের জায়গাটি আজও পুরোপুরি ব্যাখ্যাতীত রয়ে গেছে। তবে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের এই মজুরি বৈষম্য বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে কিছুটা বেশি হলেও, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ যেমন—পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ভারত ও শ্রীলঙ্কার চেয়ে বাংলাদেশের লিঙ্গভিত্তিক মজুরি বৈষম্যের হার কিছুটা কম। যদিও এটি কোনো স্বস্তির বিষয় হতে পারে না, কারণ একই কাজের জন্য ভিন্ন মজুরি প্রদান সরাসরি শ্রম অধিকার ও মানবিক মর্যাদার পরিপন্থি।
নারী-পুরুষের এই প্রকট মজুরি বৈষম্যকে মৌলিক মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে জোরালোভাবে আখ্যায়িত করেছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ। তিনি সমকালকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে জানান যে, কৃষিসহ দেশের বিভিন্ন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতেই এই ধরনের অমানবিক মজুরি বৈষম্য সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, বরেন্দ্র অঞ্চলে কৃষিকাজে নারী শ্রমিকদের প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে পুরুষ শ্রমিকদের তুলনায় ঠিক অর্ধেক মজুরি প্রদান করা হয়। কৃষিকাজে এমনিতেই প্রচলিত মজুরির হার অনেক কম, তার ওপর এই চরম বৈষম্য নারী শ্রমিকদের জীবনযাত্রাকে আরও বেশি দুর্বিষহ করে তোলে। সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ আরও উল্লেখ করেন যে, এই অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে নারীরা পারিবারিকভাবে নিগৃহীত হন এবং সমাজে পুরুষদের একাধিক বিয়ের প্রবণতা বৃদ্ধির পেছনেও এটি একটি অন্যতম বড় কারণ হিসেবে কাজ করে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য তিনি শ্রম সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক, অপ্রাতিষ্ঠানিক, সরকারি ও বেসরকারি নির্বিশেষে সব খাতের জন্য একটি অভিন্ন ও জাতীয় মজুরি কাঠামো গঠনের জোর সুপারিশ করেছেন। যেন একজন শ্রমিক তার ন্যায্য মজুরি দিয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে একটি মর্যাদাপূর্ণ ও সুস্থ জীবনযাপন করতে পারেন। এছাড়া, শ্রমিকদের জন্য একটি তথ্য ব্যাংক বা ডাটাবেজ তৈরি, নির্দিষ্ট পরিচয়পত্রের ব্যবস্থা করা এবং যেকোনো শ্রমবিষয়ক অভিযোগের দ্রুত প্রতিকার দেওয়ার জন্য জেলা পর্যায়ে নির্দিষ্ট সরকারি দপ্তর প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন তিনি, যাতে শ্রমিকরা তাদের যেকোনো বঞ্চনার কথা জানিয়ে সহজেই আইনি সহায়তা ও প্রতিকার পেতে পারেন।
মজুরি বৈষম্যের গভীর কাঠামোগত কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে আইএলও প্রতিবেদন দেখিয়েছে যে, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রেও দেশের সব খাতকে সমানভাবে বা ন্যায্যতার ভিত্তিতে বিবেচনা করা হয় না। শ্রমবাজারে নারীরা যেসব নির্দিষ্ট খাতে বেশি অংশগ্রহণ করেন, সেই খাতগুলোর কাজের মূল্যায়নে এবং মজুরি নির্ধারণে একধরনের অদৃশ্য লিঙ্গভিত্তিক পক্ষপাত রয়ে গেছে। বর্তমান মজুরি নির্ধারণ ব্যবস্থায় এই পক্ষপাতিত্বের বিষয়টি স্পষ্টভাবে বিবেচনা বা সংশোধন করা হয় না। নারী ও পুরুষের মজুরি ব্যবধানের পেছনে শুধু একই কাজের জন্য ভিন্ন মজুরি দেওয়ার বিষয়টিই এককভাবে দায়ী নয়। বরং মজুরি নির্ধারণ প্রক্রিয়ার কাঠামোগত দুর্বলতা, নিম্ন মজুরির কাজগুলোতে নারীদের অতিরিক্ত ও বাধ্যবাধকতামূলক অংশগ্রহণ, ঘরের অবৈতনিক কাজের অমানবিক বাড়তি চাপ এবং সামগ্রিকভাবে দেশের নিম্ন মজুরির শ্রমবাজার—এই সবকিছু মিলেই মজুরি ব্যবধানের পেছনে কাঠামোগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক কারণ হিসেবে জোরালো ভূমিকা পালন করছে।
দেশের শ্রমবাজারের এই চরম বৈষম্যমূলক অবস্থার পরিবর্তনে এবং সমমজুরি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আইএলও তাদের প্রতিবেদনে বেশ কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত সুপারিশ তুলে ধরেছে। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক শ্রমবাজার গড়ে তোলার জন্য সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন ও তার কঠোর বাস্তবায়নের তাগিদ দেওয়া হয়েছে আন্তর্জাতিক এই সংস্থাটির পক্ষ থেকে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে একই ধরনের কাজের জন্য সমান মজুরির নীতি অবিলম্বে কার্যকর করা, কাজের মূল্যায়নে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ পদ্ধতি চালু করা এবং ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের সময় লিঙ্গবৈষম্যের বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনায় নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে মাতৃত্বকালীন ছুটির পাশাপাশি পিতৃত্বকালীন ছুটির বিদ্যমান বিধানগুলো পুনর্বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে। সর্বোপরি, কর্মক্ষেত্রে নারীদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যেকোনো ধরনের হয়রানি কঠোরভাবে প্রতিরোধ করা এবং শ্রম পরিদর্শন ও বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাকে আরও বেশি জোরদার করার জোরালো আহ্বান জানিয়েছে আইএলও। এই কাঠামোগত পরিবর্তনগুলো সামগ্রিকভাবে বাস্তবায়িত হলেই কেবল image_478a57.jpg ফাইলে উল্লিখিত উচ্চশিক্ষিত নারীদের মেধার প্রকৃত মূল্যায়ন নিশ্চিত হবে এবং শ্রমবাজারে নারী-পুরুষের একটি সমতাভিত্তিক ও ন্যায্য পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।