‘ইট’স অ্যান অর্ডার।’
এ বাক্যটির শাব্দিক অর্থ বুঝিয়ে বলার দরকার নেই। সবাই জানেন।
কিন্তু আমাদের পরিবারে এর একটি আলাদা অর্থ আছে, তা হলো—‘মাইনাস মি ফ্রম ইয়োর লাইফ—অর ওবে মি।’
তোমার জীবন থেকে আমাকে বাদ দাও—নয়তো আমার আদেশ মানো।
বাক্যটি ব্যবহার করতেন আমার বাবা।
তবে কথাটির জনক তিনি নন। এটির জনক আমার দাদা।
তিনি বলতেন, ‘এরফর হথা নাই, উনিলে উন, নয় দূর অ।’ (এরপর কথা নেই, শুনলে শোন, নয় দূর হ)
বাবার মতো আমিও বলি—’ইট’স অ্যান অর্ডার।’
এটি আমার মেয়ের জন্য প্রযোজ্য, ভাগ্নে-ভাগ্নিদের জন্য প্রযোজ্য, ভাতিজা-ভাতিজিদের জন্য প্রযোজ্য।
কখন এ কথা বলা হয়?
সহজে বলা হয় না।
তাদের সব আবদার, আহ্লাদ রাখার চেষ্টা করা হয়। প্রতিটি মুহূর্তে চেষ্টা করা হয় তাদের শৈশব আনন্দময় করতে। কিন্তু তারা যদি এমন কোনো জেদ ধরে, যেটি রাখা হলে তাদের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা আছে, তখন একেবারে শেষ পর্যায়ে কথাটি বলা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে না যাওয়া পর্যন্ত তারা কেউ স্মার্টফোন চাইলে অবশ্যই বলা হবে—ইট’স অ্যান অর্ডার।
ইউনিভার্সিটি লাইফের আগে অনলাইনে পড়াশোনার ব্যাপার থাকলে তারা তা ডেস্কটপ বা ল্যাপটপে করবে। স্মার্ট ফোনে নয়। ছয় ইঞ্চি মনিটরে পড়াশোনা হয় না —বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ফাজলামি হয়।
স্কুল বা কলেজপড়ুয়া ভাগ্নে বা ভাতিজা যদি মোটরসাইকেল চায়, তাকেও বলা হবে—ইট’স অ্যান অর্ডার।
আমার কন্যা, ভাগ্নে-ভাগ্নি, ভাতিজা -ভাতিজি যদি অযথা রাত করে বাড়ি ফেরে, প্রথমে বোঝানো হবে। তাদের সব যুক্তি শোনা হবে। গ্রহণযোগ্য না হলে বলা হবে, ‘তোমার সব কথা শুনলাম, কিন্ত ইট’স অ্যান অর্ডার।’
তাদের মা-বাবা যদি তাদের সাথে সায় দেয়, তাহলে আমি খাস চাঁটগাইয়া ভাষায় তাদেরও বলব, ‘এরফর হথা নাই, উনিলে উন, নয় দূর অ।’
নিজের সন্তানের ভালো বোঝে না, এমন ভাই-বোন আমার দরকার নেই।
কেউ কেউ হয়তো বলবেন, ‘এই জেদ কি আপনি সারাজীবন রাখতে পারবেন?’
উত্তরে বলি, ‘আমার দাদা ষোল-সতের বছর বয়সে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, ‘আজিয়ার থুন গোস্ত হাইতাম ন—গুল্লি মারি গোস্তর।’
(আজ থেকে মাংস খাব না, গুল্লি মারি মাংসের।’)
এরপর তিনি সত্তর বছর বেঁচে ছিলেন—কোনো দিন মাংস খাননি!
আমি তাঁর নাতি—একশ বছর বেঁচে থাকলেও প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে পারব।
এত কথা বললাম কেন?
কারণ আমরা অনেকেই সন্তানের জেদের কাছে পরাজিত হয়ে তাদের সব আবদার পূরণ করি এবং এটি করে তাদের সর্বনাশ করি।
মোটরসাইকেল অ্যাক্সিডেন্ট করে কয়টা বাচ্চা মারা গেছে হিসাব নিন।
স্মার্টফোন ব্যবহার করে কয়টা বাচ্চা উচ্ছন্নে গেছে খবর নিন।
বেকাজে রাত করে বাড়ি ফিরে আসা কিশোর-কিশোরীদের কতজন বিপথে গেছে খবর নিন।
কতজন মাদকাসক্ত হয়েছে খবর নিন।
কতজন কিশোর গ্যাঙয়ের সাথে জড়িয়েছে খবর নিন।
তাহলেই বুঝবেন, কেন মা-বাবার পৃথিবীর সবচেয়ে জেদি মানুষ হতে হয়।
অল্পবয়সে মোটরসাইকেল কিংবা স্মার্টফোন চাইলে সোজা বলে দিন, নিজে মজুরি খেটে রোজগার করে তা কিনতে—আপনার টাকায় নয়।
নিজের রক্তপানি করা টাকায় সন্তানের বিপদ কিনবেন না।
ওদের আদরে-সোহাগে ভরিয়ে রাখুন, কিন্তু অন্যায় আবদার রক্ষা করে ভবিষ্যৎ গোল্লা বানাবেন না।
তাদের পরিষ্কার বুঝিয়ে দিন, তারা দুনিয়ার সবচেয়ে জেদি বাবা-মায়ের সন্তান। বুঝিয়ে দিন, আপনি ভেঙে খান খান হয়ে যাবেন, কিন্তু মচকাবেন না।
আপনার জেদ মাঝে মাঝে অপত্য স্নেহের অংশ।
এই জেদ তাদের রক্ষা করবে—আপনাকেও রক্ষা করবে।
অতি নরম বাবা-মায়ের সন্তান তাঁদের ব্ল্যাকমেইল করে। বাচ্চাকে ব্ল্যাকমেইলার বানাবেন না।
তাদের প্রতিটি যৌক্তিক আবদার রাখুন—একটি অযৌক্তিক আবদারও রাখবেন না।
প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত কতদূর পর্যন্ত তাদের আবদার রাখা হবে তার সীমারেখা টানুন।
সে সীমা না মানলে তাদের কানে খুব ঠাণ্ডা সীসা ঢেলে দিয়ে বলবেন—
‘ইট’স অ্যান অর্ডার।’
আমার দাদার ভাষায়—’উনিলে উন, নয় দূর অ।’
এটি একটি লাইন অব কন্ট্রোল—যা অতিক্রম করা যাবে না।
কেউ কেউ ভিন্নমত পোষণ করতে পারেন, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা। তবে যে যাই বলুন, আমার কথা হচ্ছে—‘শালিস মানি, কিন্তু তালগাছ আমার।’
আমাদের সন্তান থাকুক দুধেভাতে।
#আসুন মায়া ছড়াই