• রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:০২ অপরাহ্ন
Headline
জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান জাতিসংঘে নতুন সরকারের বার্তা দেবেন তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী কাল নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ছেন সরকার স্টার্টআপ, উদ্যোক্তা তৈরি ও উদ্ভাবনে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে : জনপ্রশাসন উপদেষ্টা বাংলাদেশ সফরে আগ্রহী চীনা কমিউনিস্ট পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতা: রাষ্ট্রদূত মাকসুদ কামাল-জাফর ইকবালসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মন্ত্রিসভায় পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অধ্যাদেশের সংশোধনী অনুমোদন রামিসার মতো অপ্রতিম হত্যারও দ্রুত বিচার হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংবিধান সংশোধনের বিশেষ কমিটি প্রত্যাখ্যানসহ ৬ দাবি ১১-দলীয় ঐক্যের আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে ভূরিভোজ, ওসি প্রত্যাহার

নজরদারিতে অনেক পুলিশ কর্মকর্তা: নাশকতার ছক বিদেশে ঢাকায় বাস্তবায়ন

Reporter Name / ০ Time View
Update : রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

গত ৫ আগস্টের অবিস্মরণীয় ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশে যে ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেছিল, তার পর থেকে একটি দীর্ঘ সময় পর্যন্ত রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ধরনের থমথমে নীরবতা ও স্থবিরতা বিরাজ করছিল। কিন্তু সম্প্রতি সেই আপাত শান্ত পরিস্থিতি ভেদ করে নতুন করে রাজনৈতিক অঙ্গনে এক অপ্রত্যাশিত ও গভীর উত্তাপের সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগ এবং এর বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা, যারা এতদিন প্রবল জনরোষের ভয়ে সম্পূর্ণ আত্মগোপনে ছিলেন, তারা হঠাৎ করেই নতুন উদ্যমে নাশকতার এক ভয়ংকর গোপন ছক আঁকতে শুরু করেছেন। বিশেষ করে দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথিত প্রত্যাবর্তনের নানা গুজবকে কেন্দ্র করে এই আত্মগোপনে থাকা চক্রটি পুনরায় সংঘবদ্ধ হওয়ার দুঃসাহস দেখাচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক দায়িত্বশীল ও বিশ্বস্ত সূত্র অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে নিশ্চিত করেছে যে, খোদ রাজধানী ঢাকাকে মূল কেন্দ্রবিন্দু বানিয়ে এই অপতৎপরতা ও নাশকতার জাল বোনা হচ্ছে। এই পরিকল্পিত নাশকতার মূল উদ্দেশ্য হলো বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন বা নতুন সরকারকে দেশি-বিদেশি মহলে চরমভাবে বিব্রত করা এবং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে একটি অস্থিতিশীল ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে নিজেদের হারানো অস্তিত্বের জানান দেওয়া। আর এই ভয়ংকর ছকটি বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে কাজ করছে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পালিয়ে এসে রাজধানী ঢাকায় ঘাপটি মেরে থাকা দলটির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা।
গোয়েন্দা তথ্যের চুলচেরা বিশ্লেষণে যে চিত্রটি উঠে এসেছে, তা যেকোনো সচেতন নাগরিকের জন্যই অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও ভাবিয়ে তোলার মতো। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর সাধারণ মানুষের তীব্র গণরোষ থেকে বাঁচতে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায় থেকে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কয়েক হাজার মাঝারি ও তৃণমূল সারির নেতাকর্মী পালিয়ে এসে রাজধানী ঢাকায় নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে নিয়েছেন। ঢাকার মতো একটি মেগাসিটির বিশাল আয়তন এবং বিপুল জনসংখ্যার ভিড় তাদের জন্য এক আদর্শ আত্মগোপনের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে, যা মফস্বল শহর বা জেলা শহরগুলোতে কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। এই পলাতক নেতাকর্মীরা বর্তমানে ঢাকার বিভিন্ন সাধারণ আবাসিক এলাকা, ব্যাচেলর মেস, সস্তা আবাসিক হোটেল এবং আত্মীয়স্বজনদের বাসাবাড়িতে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ছদ্মবেশে অবস্থান করছেন। গোয়েন্দা নজরদারি ও সাধারণ মানুষের সন্দেহ এড়াতে তারা কখনো দিনমজুর, কখনো হকার, আবার কখনোবা সাধারণ চাকরিপ্রার্থীর বেশ ধারণ করে সমাজে মিশে থাকার চেষ্টা করছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গোপন সূত্রে জানা যায়, রাজধানীর মিরপুর, উত্তরা, বাড্ডা, খিলগাঁও, মুগদা, শাহজাহানপুর, সবুজবাগ, ধানমন্ডি, যাত্রাবাড়ী এবং পুরান ঢাকার সূত্রাপুর থেকে কোতোয়ালি এলাকার মতো জনবহুল স্থানগুলোর কিছু নির্দিষ্ট মেস ও ফ্ল্যাট বাড়িতে এদের ঘন ঘন যাতায়াত এবং গোপন বৈঠকের অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেছে।
এই পুরো নাশকতার প্রক্রিয়াটি কোনোভাবেই স্বতঃস্ফূর্ত বা স্থানীয়ভাবে পরিচালিত হচ্ছে না; বরং এর মূল মাস্টারমাইন্ডরা অবস্থান করছেন দেশের সীমানার বাইরে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, এই নাশকতার মূল পরিকল্পনা প্রণয়ন, দিকনির্দেশনা প্রদান এবং এর পেছনে বিপুল অঙ্কের অর্থের জোগান আসছে মূলত ভারত, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ এবং ইউরোপের কয়েকটি রাষ্ট্র থেকে। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে ক্ষমতার নগ্ন অপব্যবহার করে ফুলেফেঁপে ওঠা ধনাঢ্য ব্যক্তি, পলাতক সাবেক এমপি এবং প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতারাই বিদেশ থেকে এই অপতৎপরতার কলকাঠি নাড়ছেন। তারা দেশের ভেতরে আত্মগোপনে থাকা তাদের অনুসারীদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সিগন্যাল, টেলিগ্রাম এবং হোয়াটসঅ্যাপের মতো এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপ্টেড অ্যাপস ব্যবহার করছেন, যাতে গোয়েন্দারা তাদের কথোপকথন সহজে নজরদারি বা ইন্টারসেপ্ট করতে না পারেন। তাদের বর্তমান কৌশলটিও বেশ অভিনব ও সম্পূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক। তারা খুব ভালো করেই জানেন যে, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ঢাকার রাজপথে বড় ধরনের কোনো রাজনৈতিক সমাবেশ বা শোডাউন করার মতো সাংগঠনিক শক্তি বা জনসমর্থন তাদের বিন্দুমাত্র অবশিষ্ট নেই। তাই তারা ‘হিট অ্যান্ড রান’ বা আকস্মিক ঝটিকা মিছিলের মতো চোরাগোপ্তা কৌশল বেছে নিয়েছেন। তাদের প্রধান লক্ষ্য হলো হঠাৎ করে ত্রিশ থেকে চল্লিশ জনের একটি ছোট দল নিয়ে ব্যানার হাতে রাস্তায় নেমে পড়া, দ্রুত কিছু ছবি ও ভিডিও ধারণ করা এবং মুহূর্তের মধ্যে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে নিজেদের একটি কৃত্রিম উপস্থিতির জানান দেওয়া।
তবে এই পুরো ষড়যন্ত্রের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও উদ্বেগজনক দিকটি হলো খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভেতরের একটি অসাধু চক্রের গোপন আঁতাত। গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিগত ফ্যাসিবাদের দীর্ঘ শাসনামলে যে পুলিশ প্রশাসনকে নগ্নভাবে দলীয় ক্যাডার বাহিনীর মতো ব্যবহার করা হয়েছিল, সেই প্রশাসনের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা কিছু সুবিধাভোগী কর্মকর্তা এখনো এই নাশকতাকারীদের মদত দিয়ে যাচ্ছেন। গুরুতর অভিযোগ রয়েছে যে, পুলিশের ভেতরে বৈষম্যের শিকার হওয়ার মিথ্যা ও বানোয়াট দাবি তুলে অনেকেই বর্তমান সরকারের আমলে ভালো ও গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নিয়েছেন। অথচ অতীতে তারা আওয়ামী লীগের অন্ধ সুবিধাভোগী ছিলেন এবং নিজেদের অপকর্মগুলো সুকৌশলে আড়াল করে রেখেছেন। এখন তারা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে বসেই অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিষ্ক্রিয় রাখার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন এবং গোপনে আওয়ামী লীগের ওই চক্রটিকে পুলিশের বিভিন্ন অভিযানের আগাম গোপন তথ্য সরবরাহ করে তাদের নির্বিঘ্নে পালিয়ে যেতে সাহায্য করছেন। এর পাশাপাশি, বিগত সরকারের আমলে সুবিধাভোগী এবং বর্তমানে বিদেশে পলাতক বেশ কয়েকজন সাবেক উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা নিয়মিতভাবে হুন্ডি বা অন্যান্য অবৈধ চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে বড় অঙ্কের টাকা পাঠাচ্ছেন। এই কালো টাকাই মূলত ঝটিকা মিছিল, ককটেল বিস্ফোরণ এবং মাঠপর্যায়ের কর্মীদের আত্মগোপনে থাকার খরচ হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এই বহুমুখী ও সুগভীর গোপন ষড়যন্ত্রের সবচেয়ে বড় বহিঃপ্রকাশ ঘটে সম্প্রতি রাজধানীর গুলশানের মতো একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর, অভিজাত ও কূটনৈতিক এলাকায়। জুমার নামাজের ঠিক আগে আগে সেখানে আকস্মিকভাবে বের হওয়া একটি ঝটিকা মিছিল থেকে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয় এবং গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে জনমনে ত্রাস সৃষ্টি করা হয়। এই ঘটনাটি শুধু সাধারণ মানুষের মনেই আতঙ্ক ছড়ায়নি, বরং খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা ও গোয়েন্দা তৎপরতার ওপর একটি বড় ধরনের ঝাঁকুনি দিয়েছে। কীভাবে এতগুলো স্তরের কঠোর নিরাপত্তা বলয় এবং সিসিটিভি ক্যামেরার নিবিড় নজরদারি এড়িয়ে গুলশানের মতো সুরক্ষিত কূটনৈতিক এলাকায় এমন একটি দুঃসাহসিক নাশকতার ঘটনা ঘটল, তা নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে তীব্র অসন্তোষ ও চরম বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘটনা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে যে, মাঠপর্যায়ের চেইন অব কমান্ডে এখনো বড় ধরনের সমন্বয়হীনতা ও শিথিলতা রয়ে গেছে। এই চরম গোয়েন্দা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায়ভার চাপিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার এবং গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে তাদের দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ও প্রশাসনে গতিশীলতা আনতে গতকাল গুলশান জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনারকেও সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
গুলশানের এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও নজিরবিহীন ঘটনার পর সরকারের টনক নড়েছে এবং রাজধানী ঢাকাজুড়ে এক অভূতপূর্ব ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ এবং র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন যৌথভাবে নাশকতাকারীদের আস্তানাগুলো গুঁড়িয়ে দিতে সাঁড়াশি ও চিরুনি অভিযান শুরু করেছে। শুধুমাত্র গুলশানের ওই নাশকতার ঘটনায় দায়ের করা মামলাতেই এ পর্যন্ত ১৭৯ জন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ। ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তারকৃতদের ব্যাপকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং তাদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের কললিস্ট ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের লেনদেনের তথ্য অত্যন্ত নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য বেরিয়ে আসছে। গোয়েন্দারা নিশ্চিত হয়েছেন যে, এই ছন্নছাড়া কর্মীদের পেছনে অত্যন্ত শক্তিশালী, সুসংগঠিত ও আর্থিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি চক্র কাজ করছে। নাশকতাকারীদের এই পুরো নেটওয়ার্কটিকে সমূলে উৎপাটন করতে এখন ঢাকার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশমুখ, বিশেষ করে গাবতলী, সায়েদাবাদ, আব্দুল্লাহপুর এবং বাবুবাজার ব্রিজে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য ও আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন মোতায়েন করে কড়া তল্লাশি চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে রাতের বেলা ঢাকার বিভিন্ন সন্দেহভাজন ব্যাচেলর মেস, সস্তা আবাসিক হোটেল এবং বস্তি এলাকাগুলোতে পুলিশ ও র‌্যাবের যৌথ ‘ব্লক রেইড’ পরিচালিত হচ্ছে। বৈধ পরিচয়পত্র বা ঢাকায় অবস্থানের যৌক্তিক কারণ দেখাতে ব্যর্থ হলে বহিরাগতদের কঠোর জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি করা হচ্ছে। একটি সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত ও সংস্কারমুখী রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরে থাকা ‘সর্ষের ভূত’দের দ্রুততম সময়ের মধ্যে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার কোনো বিকল্প নেই।
তথ্যসূত্র: মানব জমিন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category