• সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০৮ পূর্বাহ্ন
Headline
বাংলাদেশের মতো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিশ্বে আর কোথাও নেই: রাষ্ট্রপতি সওজের ৪০০ স্থাপনায় বসছে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল রুফটপ সোলারে অর্থায়নে ইডকল ও সরকারের মধ্যে ৫০০ কোটি টাকার ঋণচুক্তি জাল সনদ চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা চায় এপিইউবি ৩২৯ কোটি টাকা বরাদ্দ পেল ২৫৩ ইউনিয়ন পরিষদ বিএনপির মুখে হচ্ছে জুলাই সনদ আর অন্তরে আ. লীগ: হাসনাত ৬৬৬ কোটি টাকা কর পরিশোধের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলো গ্রামীণ কল্যাণ সেনাসদস্যদের ‘ওয়ান র‍্যাংক ওয়ান পেনশন’ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াধীন: সাভারে প্রধানমন্ত্রী অস্ত্র উঁচিয়ে ধরার ব্যাখ্যা দিলেন ইশরাক হোসেন পিস্তল হাতে অভিযানে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক, আইনের ব্যত্যয় হলে ব্যবস্থা: ডিবিপ্রধান

পর্যটকদের বিনোদনযাত্রায় মৃত্যুঝুঁকির স্থায়ী চক্র: কক্সবাজারে অনুমোদনহীন পাঁচ শতাধিক হোটেল-রিসোর্ট

Reporter Name / ২ Time View
Update : রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬

বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক বালুকাময় সমুদ্রসৈকতকে ঘিরে গড়ে ওঠা দেশের প্রধান পর্যটন কেন্দ্র কক্সবাজারে পর্যটকদের পদচারণা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ধর্মীয় উৎসব, জাতীয় ছুটির দিন কিংবা দীর্ঘ অবকাশে দেশের নানা প্রান্ত থেকে লাখো মানুষ ছুটে আসছেন সুনীল সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ আর প্রকৃতির সান্নিধ্যে। ২০২৩ সালের শেষের দিকে বহুল প্রতীক্ষিত রেল যোগাযোগ চালু হওয়ার পর যাতায়াত ব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে এবং পর্যটকদের আগমনও অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু পর্যটকদের এই বিপুল উপস্থিতির সঙ্গে সংগতি রেখে পর্যটন নগরীর সামগ্রিক নিরাপত্তা ও আধুনিক নাগরিক ব্যবস্থাপনার কোনো দৃশ্যমান ও টেকসই উন্নয়ন ঘটেনি। মহাসড়কে বেপরোয়া গতির প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা, রেলপথে পাথর নিক্ষেপ ও লেভেল ক্রসিং অব্যবস্থাপনা, সৈকতের গভীরে নেমে জোয়ারের তোড়ে সলিলসমাধি এবং সর্বশেষ মানহীন অনুমোদনহীন রিসোর্টে আগুনে অঙ্গার হয়ে মৃত্যুর মতো মর্মান্তিক ঘটনা যেন এখানকার নৈমিত্তিক বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। ফলে বেড়াতে আসা ভ্রমণপিপাসুদের মনে এখন অবকাশ যাপনের আনন্দের চেয়ে জীবনের নিরাপত্তাহীনতার গভীর আতঙ্কই বেশি ভর করছে।

কক্সবাজারে পৌঁছানোর দীর্ঘ পথ থেকেই শুরু হয় পর্যটকদের জন্য মৃত্যুঝুঁকি। রাজধানীর সঙ্গে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম হয়ে কক্সবাজারের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা যুগ যুগ ধরে চলে আসলেও অত্যন্ত ব্যস্ত, সংকীর্ণ ও বিপজ্জনক বাঁকযুক্ত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কটি আজও চার কিংবা ছয় লেনে উন্নীত করা সম্ভব হয়নি। এই সরু মহাসড়কে দূরপাল্লার বাস ও ভারী যানবাহনের বেপরোয়া ওভারটেকিংয়ের কারণে প্রতিনিয়ত প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটছে। বাংলাদেশ পুলিশ ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সরকারি পরিসংখ্যানেই সড়কপথের এই রক্তক্ষয়ী চিত্র স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। সরকারি তথ্যমতে, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে বিগত ২০২৫ সালেই ১০৬টি বড় ধরনের সড়ক দুর্ঘটনা রেকর্ড করা হয়, যাতে ১৩৪ জন মানুষ প্রাণ হারান এবং মারাত্মকভাবে আহত হন আরও কয়েকশ যাত্রী। অন্যদিকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসেই অন্তত ৬১টি দুর্ঘটনায় ৭৪ জনের অকালমৃত্যু হয়েছে এবং পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন শতাধিক যাত্রী। তবে সড়ক নিয়ে কাজ করা বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি এবং রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের দাবি, বাস্তব ক্ষেত্রে এই মহাসড়কে প্রাণহানির সংখ্যা সরকারি খতিয়ানের চেয়েও অনেক বেশি।

সড়কপথের এই অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির বিপরীতে সাশ্রয়ী, দ্রুত ও আরামদায়ক বাহন হিসেবে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা-কক্সবাজার রেলসেবা চালু হলে সাধারণ মানুষের মনে অনেক বড় আশার সঞ্চার হয়েছিল। বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে পর্যটকদের জন্য প্রতিদিন চার জোড়া ট্রেন চলাচল করছে এবং যাত্রীচাপ সামলাতে আগামী ২৬ অক্টোবর থেকে আরও একটি নতুন আন্তঃনগর ট্রেন যুক্ত করার ঘোষণা রয়েছে। তবে রেলসেবা চালুর পর থেকেই এক নতুন ও অপ্রত্যাশিত সংকটের মুখে পড়েছেন যাত্রীরা। রেলপথের বিভিন্ন অরক্ষিত অংশে চলন্ত ট্রেনে দুষ্কৃতকারীদের পাথর নিক্ষেপের ঘটনা যেন থামানোই যাচ্ছে না। রেলওয়ের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে চলাচলকারী ট্রেনে অন্তত ৫০টি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে, যাতে জানালার কাঁচ ভেঙে ভেতরে থাকা শতাধিক যাত্রী রক্তাক্ত ও মারাত্মক আহত হয়েছেন। এছাড়া এই দীর্ঘ রেলপথের লেভেল ক্রসিংগুলোতে প্রয়োজনীয় স্থায়ী গেটম্যান ও পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক অবকাঠামো না থাকায় ট্রেনে কাটা পড়ে ও ধাক্কায় এ পর্যন্ত অন্তত ১০৪ জন পথচারী ও যাত্রীর মৃত্যু হয়েছে এবং ছোট-বড় মিলিয়ে ২২টি ট্রেন মারাত্মক দুর্ঘটনার মুখোমুখি হয়েছে।

যাতায়াতের এই কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ পথ পেরিয়ে পর্যটকরা যখন সমুদ্রের সান্নিধ্যে পৌঁছান, সেখানেও তাদের জীবন কোনোভাবেই নিরাপদ থাকছে না। অপার সৌন্দর্যের এই সমুদ্রসৈকতে গোসলে নেমে জোয়ারের তীব্র স্রোতে কিংবা গুপ্ত গর্তে পড়ে ভেসে গিয়ে সলিলসমাধি হওয়া যেন কক্সবাজারের এক নিয়মিত বিষাদের গল্প। দীর্ঘ একশ কিলোমিটারেরও বেশি উপকূলজুড়ে বিস্তৃত এই সৈকতের সুবিশাল অংশে কোনো ধরনের সার্বক্ষণিক লাইফগার্ড নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। শহরের প্রধান কয়েকটি পয়েন্টে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার সহায়তায় মাত্র ২৭ জন লাইফগার্ড জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন, যা ছুটির দিনে সমবেত হওয়া লক্ষাধিক পর্যটকের সুরক্ষায় একেবারেই অপ্রতুল। আরও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, বিদেশি উন্নয়ন সংস্থার অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে এই সীমিত সংখ্যক লাইফগার্ডের বেতন-ভাতা পর্যন্ত অনিয়মিত হয়ে পড়েছে, যার ফলে যেকোনো সময় তাদের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০১৬ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে সৈকতের পানিতে ডুবে অন্তত ৭০ জন পর্যটক প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে কেবল ২০২৪ সাল থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই অল্প সময়ের ব্যবধানেই প্রাণ গেছে ৪০ জন পর্যটকের। যদিও এই দশ বছরে লাইফগার্ডদের সাহসিকতায় নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে ১ হাজার ৭৭ জন পর্যটককে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু শহরের প্রধান সৈকত পয়েন্টগুলোর বাইরে হিমছড়ি, ইনানী কিংবা পাটুয়ারটেকের মতো নতুন নতুন দর্শনীয় স্থানে কোনো লাইফগার্ড বা নিরাপত্তা চৌকি না থাকায় পর্যটকদের মৃত্যুর মিছিল দিন দিন দীর্ঘ হচ্ছে।

সৈকতের উন্মুক্ত জলরাশি পেরিয়ে পর্যটকদের নিরাপদ আশ্রয়ের শেষ ভরসা হওয়ার কথা ছিল যে হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টগুলো, সেগুলোই এখন পরিণত হয়েছে ভয়ঙ্কর অগ্নিকুণ্ড ও মৃত্যুফাঁদে। অতি সম্প্রতি মেরিন ড্রাইভ সড়কের ইনানী সংলগ্ন পাটুয়ারটেক এলাকার ‘টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্ট’-এ ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে একই পরিবারের ছয় সদস্যসহ অন্তত ১০ জন পর্যটকের করুণ মৃত্যু হয়েছে। এই মর্মান্তিক ঘটনাটি সমগ্র দেশকে শোকস্তব্ধ করার পাশাপাশি কক্সবাজারের পর্যটন আবাসন খাতের অনিয়ম, দুর্নীতি ও চরম নৈরাজ্যের মুখোশ উন্মোচন করে দিয়েছে। জেলা প্রশাসন তড়িঘড়ি করে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ঠিকই, কিন্তু অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে যে প্রতিষ্ঠানটির কোনো ধরনের অগ্নিনিরাপত্তা সনদ বা ফায়ার লাইসেন্সই ছিল না। এমনকি কয়েক মাস আগে ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শক দল সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রতিষ্ঠানটিকে মারাত্মক অগ্নিঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক নোটিশ জারি করলেও মালিকপক্ষ তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ব্যবসা চালিয়ে আসছিল।

পাটুয়ারটেকের এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং সমগ্র কক্সবাজার জুড়েই চলছে অনুমোদনহীন হোটেল-রিসোর্টের এক বেপরোয়া মহোৎসব। কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের প্রায় ৩৫ কিলোমিটার জুড়ে সমুদ্র ও পাহাড়ের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা অর্ধশতাধিক রিসোর্ট ও কটেজের প্রায় সবই কাঠ, বাঁশ ও টিন দিয়ে তৈরি। আপাতদৃষ্টিতে প্রাকৃতিক ও পরিবেশবান্ধব মনে হলেও এগুলোর কোনোটিতেই অগ্নিনির্বাপণের ন্যূনতম আধুনিক যন্ত্রপাতি নেই। পরিবেশ অধিদপ্তর, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক), ফায়ার সার্ভিস কিংবা জেলা প্রশাসন—কোনো সরকারি সংস্থার বৈধ অনুমোদন ছাড়াই এগুলো দিনের পর দিন কোটি কোটি টাকার বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তর ও মালিক সমিতির তথ্যমতে, জেলা শহর, রামুর পেঁচারদ্বীপ এবং ইনানীসহ বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকায় বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে ছয় শতাধিক হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ গড়ে উঠেছে। এর সিংহভাগ প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ কিংবা পৌরসভা থেকে কেবল একটি সাধারণ ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ করেই সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে তাদের বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, কক্সবাজারের এই বিপুলসংখ্যক হোটেলের মধ্যে চলতি বছরে মাত্র ৫০টি প্রতিষ্ঠান তাদের ফায়ার লাইসেন্স নবায়ন করেছে এবং সর্বোচ্চ একশটি প্রতিষ্ঠান লাইসেন্সের জন্য আবেদন জমা দিয়েছে। অথচ এর আগে অন্তত দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স কার্যকর ছিল। বাকি শত শত রিসোর্ট কোনো ধরনের অগ্নিনিরাপত্তা ছাড়পত্র ছাড়াই বছরের পর বছর লাখ লাখ পর্যটককে আশ্রয় দিচ্ছে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলছেন, পর্যটন শহরটিতে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা শত শত প্রতিষ্ঠানের সঠিক কোনো পরিসংখ্যান কোনো সরকারি নথিতে নেই। অনেক প্রতিষ্ঠানকে বারবার নোটিশ পাঠানো সত্ত্বেও তারা কোনো অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা গ্রহণ করে না। এর ওপর কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতাও অত্যন্ত প্রকট। পুরো কক্সবাজার সদর ফায়ার স্টেশনে মাত্র ৩৫ জন জনবল দিয়ে পুরো শহরের অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়, যার মধ্যে মাত্র পাঁচজন চালক ও ২২ জন ফায়ার ফাইটার রয়েছেন। একইভাবে চকরিয়া, পেকুয়া, কুতুবদিয়া, টেকনাফ, মহেশখালী, রামু ও উখিয়া স্টেশনেও চালক ও ফায়ার ফাইটারের সংখ্যা হাতে গোনা। এত বড় একটি আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্রে মাত্র একটি মূল স্টেশন ও সীমিত সক্ষমতা নিয়ে কোনো বড় অগ্নিকাণ্ড সামাল দেওয়া যে কোনো উদ্ধারকারী বাহিনীর পক্ষেই প্রায় অসম্ভব।

পরিবেশগত দৃষ্টিকোণ থেকেও পর্যটন নগরী আজ চরম ধ্বংসযজ্ঞের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের আওতায় ১৯৯৯ সালে কক্সবাজার সৈকতসংলগ্ন এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা বা ইসিএ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল, যেখানে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্টকারী কোনো স্থাপনা নির্মাণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু সেই আইনি নিষেধাজ্ঞাকে পদদলিত করে মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে গত এক দশকে নির্বিচারে গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন ও সুরম্য রিসোর্ট। গত তিন দশকে ইসিএ এলাকায় সাত শতাধিক বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে, যার মধ্যে আবাসিক হোটেল ও রিসোর্টই ৫৩৭টি। অথচ পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এই বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ১৪টি তারকা মানের হোটেলে আধুনিক তরল বর্জ্য পরিশোধনাগার বা সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) রয়েছে এবং পরিবেশ ছাড়পত্র রয়েছে মাত্র ৫০টি হোটেলের। বাকি শত শত হোটেলের অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য, প্লাস্টিক ও ক্ষতিকর রাসায়নিক বর্জ্য সরাসরি সাগরের পানিতে গিয়ে মিশছে। পৌর এলাকায় কোনো কেন্দ্রীয় আধুনিক ডাম্পিং স্টেশন না থাকায় পুরো সৈকতই আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন সৈকতসংলগ্ন চিরল ঝাউবাগান উজাড় হচ্ছে, অন্যদিকে লাল কাঁকড়া ও বিপন্ন মা কাছিমের ডিম পাড়ার প্রাকৃতিক পরিবেশ চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তর গত এক বছরে ৫৮টি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় দেড় কোটি টাকা জরিমানা এবং শতাধিক হোটেলের বিরুদ্ধে ২৮টি মামলা করলেও আইনি দুর্বলতার কারণে এই আগ্রাসন থামানো যাচ্ছে না। বিশ কক্ষের নিচের আবাসিক হোটেল কিংবা ত্রিশ লাখ টাকার নিচের রেস্তোরাঁর ক্ষেত্রে পরিবেশ ছাড়পত্রের শিথিলতাকে চতুরতার সঙ্গে আইনি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা।

কক্সবাজারের পর্যটন খাতে এমন ভয়াবহ নৈরাজ্যের পেছনে কার্যকর প্রশাসনিক তদারকির অভাব ও সমন্বয়হীনতাকে দায়ী করছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। কক্সবাজার নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও বিএনপি নেতা রাশেদ মুহাম্মদ আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একটি বড় দুর্ঘটনা ঘটলেই কেবল প্রশাসন নড়েচড়ে বসে এবং লোকদেখানো তদন্ত কমিটি গঠন করে। কিন্তু এর আগে তারা কোথায় থাকে? প্রশাসনের কাছে তো কক্সবাজার জেলায় কতগুলো আবাসিক হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট বা কটেজ রয়েছে তার সঠিক হিসাব পর্যন্ত নেই। অথচ পর্যটন সেল, বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটিসহ নানা কমিটি গঠিত হয়ে আছে। এই সেলগুলোর দৃশ্যমান কাজ কী? কীভাবে কোনো সরকারি অনুমোদন ও ফায়ার লাইসেন্স ছাড়া শত শত প্রতিষ্ঠান দিনের পর দিন লাখ লাখ টাকার ব্যবসা করছে, তার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। অন্যদিকে কক্সবাজার হোটেল মোটেল মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম শিকদার জানিয়েছেন, তাদের সমিতির তালিকাভুক্ত হোটেলগুলোর প্রায় সব অনুমোদন থাকলেও মেরিন ড্রাইভের অধিকাংশ রিসোর্ট ও কটেজের কোনো অনুমোদন নেই। এরা কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করায় তাদের মূল সমিতিতেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তিনি আরও জানান, পর্যটকের আগমন ব্যাপক বাড়লেও কোনো সংস্থাই প্রকৃত অর্থে সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করতে পারছে না। তাছাড়া পর্যটন খাতকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে সাত-আটটি আলাদা মালিক সমিতি গড়ে ওঠায় যৌথ দাবি দাওয়া ও সমন্বয়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে।

সরকারি সংস্থাগুলোর চরম দায়হীনতা ও একক তদারকি কর্তৃপক্ষের অনুপস্থিতিও এই সংকটকে গভীর করে তুলছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সরকারি কর্মকর্তা জানান, পর্যটন ব্যবস্থাপনা মূলত জেলা প্রশাসনকেন্দ্রিক একটি কমিটির মাধ্যমে চলে, যারা বছরে মাত্র কয়েকবার আনুষ্ঠানিক বৈঠক করে কিছু সিদ্ধান্ত নেয়, যা একটি আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন নগরী নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের পরিচালক (বিপণন ও পরিকল্পনা) আবু সেলিম মাহমুদ উল হাসানও স্বীকার করেছেন যে, দেশের পর্যটনের প্রধান ব্র্যান্ড কক্সবাজার হলেও এই খাতের জন্য একক কোনো শক্তিশালী তদারকি সংস্থা নেই। তবে তিনি জানান, সরকার জেলাভিত্তিক ট্যুরিজম বোর্ডের কার্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনা করছে এবং তা সচিব কমিটির অনুমোদন পেলে দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে। এছাড়া কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন জানিয়েছেন, ২০১৩ সালের মাস্টারপ্ল্যান সংশোধনের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে এবং মেরিন ড্রাইভের অবৈধ স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হবে। তবে বাস্তবতা হলো, দফায় দফায় চিঠি চালাচালি আর দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতির ভিড়ে পর্যটকদের প্রতিটি মুহূর্ত এখনো ঝুঁকির মধ্যেই কাটছে। সড়ক থেকে শুরু করে রেললাইন, সমুদ্রের ঢেউ কিংবা রাত্রিযাপনের রিসোর্টের বিছানা—কোথাও যদি জীবনের ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত না থাকে, তবে বিপুল সম্ভাবনাময় এই পর্যটন শিল্প একসময় পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে পড়বে।

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা ও দেশ রূপান্তর


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category