• বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৩৩ অপরাহ্ন
Headline
১০ বছরের সাজা থেকে খালাস চেয়ে আপিল করেছেন ইনু অপারেশন ক্লিন হার্ট করার মতো কোনো পরিকল্পনা নেই সরকারের: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উপ-নির্বাচনে সন্ত্রাস ও অপতৎপরতা রোধে সচেতন থাকার আহ্বান ইসি সানাউল্লাহর দেশজুড়ে অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টা চলছে: রিজভী প্রশ্ন ফাঁসে মন্ত্রণালয়ের কেউ জড়িত থাকলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি: ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী গাজীপুরে ওষুধ কারখানার আগুন সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে দরপত্র দাখিলের সময় বাড়ল সৌদিতে হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীদের সার্বক্ষণিক খোঁজ রাখা হচ্ছে : প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ক্রয় কমিটির ১১ প্রস্তাব অনুমোদন সালাহউদ্দিন আহমেদের মৃত্যুতে রুহুল কবির রিজভীর শোক

পাচার রোধে মানদণ্ড ছোঁয়নি ঢাকা

Reporter Name / ০ Time View
Update : বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬

বিশ্বজুড়ে আধুনিক দাসত্ব, জোরপূর্বক শ্রম আদায় এবং মানব পাচার প্রতিরোধে বিভিন্ন দেশের ভূমিকা ও অগ্রগতি নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর তাদের সর্বশেষ বার্ষিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে| বৃহস্পতিবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের নিজস্ব ওয়েবসাইটে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত ‘২০২৬ ট্রাফিকিং ইন পারসনস রিপোর্ট : বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সার্বিক অবস্থান গত বছরের মতোই অপরিবর্তিত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে| যুক্তরাষ্ট্রের এই ব্যাপকভিত্তিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে যে, মানব পাচার নির্মূল করার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত যে ন্যূনতম মানদণ্ড বা মিনিমাম স্ট্যান্ডার্ডস রয়েছে, তা পুরোপুরি অর্জন করতে বাংলাদেশ সরকার এখনো সক্ষম হয়নি| তবে এই কাঙ্ক্ষিত মানদণ্ড অর্জনের লক্ষ্যে এবং মানব পাচারকারী চক্রগুলোকে প্রতিহত করতে সরকারের পক্ষ থেকে নানামুখী ও উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা চলমান রয়েছে বলে প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে| সার্বিক দিক বিবেচনা করে যুক্তরাষ্ট্র আগের বছরের মতোই বাংলাদেশকে তাদের মূল্যায়নের দ্বিতীয় স্তরে বা ‘টায়ার-২’ অবস্থানে বহাল রেখেছে|

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এই বার্ষিক প্রতিবেদনটি মূলত চারটি সুনির্দিষ্ট ধাপে বা স্তরে বিভক্ত করে বিশ্বের দেশগুলোর মানব পাচারবিরোধী অবস্থান ও সদিচ্ছার মূল্যায়ন করে থাকে| মানব পাচার প্রতিরোধে প্রতিবছর যেসব দেশ ধারাবাহিক ও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির স্বাক্ষর রাখে এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট আইনে নির্ধারিত ন্যূনতম মানদণ্ডগুলো পুরোপুরি পূরণ করতে সক্ষম হয়, কেবল সেই সফল দেশগুলোকেই প্রথম ধাপে বা ‘টায়ার-১’ স্তরে রাখা হয়| অন্যদিকে যেসব দেশ মানব পাচার নির্মূলের ন্যূনতম মানদণ্ড এখনো পুরোপুরি অর্জন করতে পারেনি, কিন্তু পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য দৃশ্যমান ও উল্লেখযোগ্যভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, সেগুলোকে দ্বিতীয় ধাপে বা ‘টায়ার-২’ স্তরে অন্তর্ভুক্ত করা হয়| এই দ্বিতীয় ধাপের ভেতরে আবার পরিস্থিতি সাপেক্ষে নজরদারির একটি বিশেষ তালিকা বা ‘টায়ার-২ ওয়াচ লিস্ট’ রাখা হয়েছে, যেখানে থাকা দেশগুলোকে আরও নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়| আর যেসব দেশ মানব পাচার প্রতিরোধের ন্যূনতম মানদণ্ড একেবারেই অর্জন করতে পারেনি এবং তা অর্জনের জন্য কোনো ধরনের অর্থবহ বা উল্লেখযোগ্য চেষ্টাও চালাচ্ছে না, সেগুলোকে সবচেয়ে তলানির স্তর বা তৃতীয় ধাপে অর্থাৎ ‘টায়ার-৩’ এ রাখা হয়| যুক্তরাষ্ট্রের এই সূচকে বাংলাদেশের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ভারত, পাকিস্তান, ভুটান এবং শ্রীলঙ্কাও একই ধাপে অর্থাৎ টায়ার-২ স্তরে অবস্থান করছে|

মানব পাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশ সরকারের বিগত এক বছরের সামগ্রিক উদ্যোগ ও সদিচ্ছার বেশ কিছু ইতিবাচক দিক এই মার্কিন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে| প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আগের বছরগুলোর তুলনায় বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের মানব পাচারবিরোধী সামগ্রিক প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ বেশ খানিকটা বৃদ্ধি পেয়েছে| বিশেষ করে মানব পাচারবিরোধী আইনি কাঠামোকে যুগোপযোগী ও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে ২০২৬ সালে দেশে একটি নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, যা অত্যন্ত সময়োপযোগী একটি পদক্ষেপ| এই নতুন আইনের মাধ্যমে অবৈধ পথে অভিবাসী চোরাচালান বা মাইগ্রেন্ট স্মাগলিং এবং সাধারণ মানুষকে জোরপূর্বক বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে বাধ্য করাকে সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর আওতায় আনার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে| এর ফলে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জন্য অপরাধীদের শনাক্ত করা এবং আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা আগের চেয়ে সহজ হয়েছে| একই সঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিতকরণ, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বস্তুনিষ্ঠ তদন্ত পরিচালনা এবং বিচারিক কার্যক্রম শুরুর হার গত এক বছরে তুলনামূলকভাবে বেড়েছে|

আইনি কাঠামোর পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকটিও প্রতিবেদনে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে| মানব পাচার সংক্রান্ত যেকোনো সূক্ষ্ম অপরাধ নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা এবং এই নিষ্ঠুর চক্রের শিকার হওয়া প্রকৃত ভুক্তভোগীদের দ্রুত চিহ্নিত করার জন্য সরকারের বিদ্যমান নির্দেশিকা বা গাইডলাইনগুলোকে নতুনভাবে হালনাগাদ করা হয়েছে| উদ্ধার হওয়া ভুক্তভোগীদের যাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে চিকিৎসা, আইনি পরামর্শ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা যায়, সেজন্য সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় বাড়াতে সরকার একটি আধুনিক ডিজিটাল ব্যবস্থাও পরীক্ষামূলকভাবে চালু করেছে| এছাড়া আন্তর্জাতিক মানব পাচারের ঝুঁকি কমিয়ে আনতে এবং বৈধ পথে বিদেশ গমনে ইচ্ছুক কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষাব্যবস্থাও আগের চেয়ে জোরদার করার চেষ্টা করেছে বলে মার্কিন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে|

তবে এতসব ইতিবাচক দিক ও উল্লেখযোগ্য উদ্যোগের কথা অকপটে স্বীকার করে নেওয়ার পরও, প্রতিবেদনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বাংলাদেশের বেশ কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা ও প্রকট ঘাটতির কথা তুলে ধরা হয়েছে, যার কারণে দেশটি ন্যূনতম মানদণ্ড অর্জন করে প্রথম স্তরে উন্নীত হতে ব্যর্থ হয়েছে| এর মধ্যে সবচেয়ে বড় হতাশার জায়গাটি হলো অপরাধীদের চূড়ান্ত সাজার হার| প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রম বাড়লেও আগের বছরগুলোর তুলনায় বর্তমানে অনেক কমসংখ্যক মানব পাচারকারীকে চূড়ান্তভাবে দোষী সাব্যস্ত করে শাস্তির আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে| বিচার প্রক্রিয়ার এই দীর্ঘসূত্রতা ও প্রমাণের অভাবে অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়া মানব পাচার দমনকে বাধাগ্রস্ত করছে| শুধু আন্তর্জাতিক পাচারই নয়, দেশের অভ্যন্তরে ঘটে চলা মানব পাচার দমনেও সরকার যথেষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি বলে প্রতিবেদনে সমালোচনা করা হয়েছে| অভ্যন্তরীণ পাচার, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের জোরপূর্বক যৌনকর্ম বা শ্রমে বাধ্য করার মতো জঘন্য অপরাধের বিস্তার দেশজুড়ে এখনো ব্যাপক মাত্রায় রয়ে গেছে|

মানব পাচারের শিকার হওয়া ভুক্তভোগীদের উদ্ধার পরবর্তী আইনি সুরক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বাজে ঘাটতি রয়েছে বলে প্রতিবেদনে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে| পাচারকারীদের কবল থেকে ফিরে আসা মানুষদের সমাজে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে যে ধরনের মানসিক সহায়তা ও আর্থিক পুনর্বাসন প্রয়োজন, তার উদ্যোগ মোটেও যথেষ্ট নয়| বিশেষ করে কক্সবাজার ও ভাসানচরে আশ্রয় নেওয়া রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং প্রতারণার শিকার হয়ে খালি হাতে দেশে ফিরে আসা অভিবাসী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে এই সুরক্ষার ঘাটতি সবচেয়ে বেশি প্রকট| রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর অরক্ষিত পরিবেশ এবং তাদের কর্মসংস্থানের অভাব পাচারকারীদের জন্য এক উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করেছে, যেখানে সহজেই মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে তাদের সমুদ্র বা স্থলপথে পাচার করা হচ্ছে|

সবশেষে মানব পাচারের ঝুঁকি বৃদ্ধির পেছনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও পদ্ধতিগত কারণ হিসেবে অভিবাসী শ্রমিকদের নিয়োগ প্রক্রিয়ার ত্রুটিকে চিহ্নিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র| প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, সরকার এখনো বিদেশে গমনেচ্ছু অভিবাসী শ্রমিকদের নিজেদের পকেট থেকে চড়া মূল্যে রিক্রুটমেন্ট ফি বা নিয়োগ ফি দেওয়ার বিদ্যমান অসম ব্যবস্থাটি পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেনি| উন্নত ভবিষ্যতের আশায় জমি বিক্রি করে বা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে যখন একজন শ্রমিক এই বিপুল পরিমাণ নিয়োগ ফি পরিশোধ করেন, তখন তিনি বিদেশে পৌঁছানোর আগেই মানসিকভাবে এবং আর্থিকভাবে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন| এই ঋণের বোঝা বা ডেবট বন্ডেজ তাদের এমন এক অসহায় পরিস্থিতিতে ফেলে দেয়, যেখানে বিদেশে গিয়ে নিয়োগকর্তার যেকোনো ধরনের শোষণ, কম বেতন বা অমানবিক শর্ত মেনে নিতে তারা বাধ্য হন| এই ঋণগ্রস্ততার ফাঁদই মূলত তাদের আধুনিক দাসত্ব বা মানব পাচারের শিকার হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি বাড়িয়ে দেয়| সার্বিক বিশ্লেষণে এটা প্রতীয়মান হয় যে, মানব পাচার নির্মূলের মতো একটি জটিল লড়াইয়ে বাংলাদেশ আইনি সংস্কারে সঠিক পথেই অগ্রসর হচ্ছে, কিন্তু সেই আইনের যথাযথ প্রয়োগ, অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিতকরণ এবং ভুক্তভোগীর প্রকৃত সুরক্ষায় এখনো অনেক দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া বাকি|

তথ্যসূত্র: যুগান্তর


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category