• শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬, ১০:৪৭ অপরাহ্ন

পুরোনো রীতি থেকে বেরোতে পারেনি সরকারী ও বিরোধী দল

Reporter Name / ১ Time View
Update : শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের সাধারণ মানুষের মাঝে রাজনীতিতে একটি নতুন ইতিবাচক ধারা তৈরির প্রবল প্রত্যাশা সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল যেন তাদের পুরোনো মনস্তাত্ত্বিক চর্চা ও অতীতমুখী কাদা-ছোড়াছুড়ি থেকে কোনোভাবেই বের হতে পারছে না। বর্তমানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকা বিএনপি এবং রাজপথের দীর্ঘদিনের মিত্র ও বর্তমান সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী—উভয় পক্ষই পরস্পরের সমালোচনা কিংবা রাজনৈতিক আক্রমণের প্রয়োজনে এখনো সেই পুরোনো অতীত ও একাত্তর সালের ইতিহাস টেনে আনছে। জাতীয় সংসদের চলতি বাজেট অধিবেশনের বিতর্ক থেকে শুরু করে রাজপথের কর্মসূচি কিংবা বিভিন্ন গণমাধ্যমের রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে, দুই দলের শীর্ষ নেতাদের মুখে ঘুরেফিরে কেবল পরস্পরের অতীত কর্মকাণ্ড ও ব্যর্থতার খতিয়ানই উঠে আসছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা অবশ্য দুই প্রধান দলের এই কথার লড়াই এবং কাদা-ছোড়াছুড়িকে দেশের চিরাচরিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা হিসেবেই দেখছেন। তবে তারা মনে করছেন, দুই দল জনসমক্ষে বা প্রচারমাধ্যমের সামনে একে অপরকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ ও বিষোদ্গার করলেও, বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ এবং কৌশলগত রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাদের মধ্যে একধরনের মনস্তাত্ত্বিক ঐক্য ও সহাবস্থান বজায় রয়েছে। নানা অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সমীকরণের কারণে দুই পক্ষের এই আপাত কথার যুদ্ধ ও সাময়িক দূরত্ব শেষ পর্যন্ত একটি সুস্থ এবং নিয়ন্ত্রিত গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে বলে রাজনৈতিক পণ্ডিতেরা জোরালো আশা প্রকাশ করছেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান জাতীয় রাজনীতির এই চলমান টানাপোড়েন প্রসঙ্গে বলেন, দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনের এই অস্বস্তিকর পরিবেশ দূর করার জন্য একাত্তর সালের ভূমিকা নিয়ে জামায়াতের পক্ষ থেকে একটি সুনির্দিষ্ট ও আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা প্রতি-উত্তর থাকা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় এই ঐতিহাসিক ইস্যুটিকে বারবার রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ থেকে যাবে। উল্লেখ্য, নতুন সরকারের আমলে জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় বা বাজেট অধিবেশন বর্তমানে সমাপ্তির পথে। কিন্তু বিগত প্রথম অধিবেশনের মতো এই চলতি অধিবেশনেও সরকারি দল বিএনপি ও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী দেশ গঠনের চেয়ে পরস্পরের অতীত ইতিহাস ও নেতিবাচক দিক নিয়ে টানাহেঁচড়াতেই বেশি ব্যস্ত ছিল।

চলতি সংসদ অধিবেশনে প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে একাত্তরে জামায়াতের বিতর্কিত ভূমিকা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি সংসদের ফ্লোরে দাঁড়িয়ে জামায়াতকে তীব্র খোঁচা দিয়ে বলেন, ‘একাত্তর সালের ভূমিকার জন্য আপনারা আজ পর্যন্ত জাতির কাছে একবারও ক্ষমা প্রার্থনা করলেন না। আপনাদের উচিত ছিল দেশের মানুষের সামনে ক্ষমা চাওয়া, এটা করলে আজকে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এই জটিল সমস্যাগুলো তৈরি হতো না।’ সংসদে সরকারি দলের একাধিক শীর্ষ নেতা বিভিন্ন কার্যদিবসে জামায়াতকে এই একাত্তর ইস্যুতে বারবার আক্রমণ করায় ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়ে একপর্যায়ে জামায়াতের সংসদ সদস্যরা অধিবেশন থেকে ওয়াকআউটও করেন।

মির্জা ফখরুলের এই প্রকাশ্য আক্রমণের কড়া জবাব দিতে দেরি করেননি জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। উল্টো বিএনপিকেই উল্টো কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি ঢাকার একটি অনুষ্ঠানে বলেন, ‘সংসদের ভেতরে ও বাইরে আপনারা যে ভাষায় আমাদের প্রশ্ন করেন, আমাদেরও পাল্টা প্রশ্ন আছে এবং সেই জবাব বিএনপিকেই দিতে হবে। বিএনপি অতীতে ক্ষমতায় থাকার সময় এই স্বাধীন বাংলাদেশে অন্তত ১৪-১৫ জন এমন ব্যক্তি ও নেতাকে মন্ত্রী, এমপি, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছিল, যারা একাত্তরে পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে সরাসরি কাজ করেছিলেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাননি।’

উল্লেখ্য, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিকভাবে আড়াই দশকেরও বেশি সময় ধরে একে অপরের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মিত্র ও রাজপথের সহযোদ্ধা ছিল। কিন্তু জুলাই বিপ্লবের পর পরিবর্তিত সমীকরণে তারা এখন পরস্পর সংসদীয় ও নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বী। এমতাবস্থায় অতীত নিয়ে তাদের এই পুরোনো ধাঁচের কাদা-ছোড়াছুড়ি দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি এবং একটি কার্যকর সংসদীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কতটুকু ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে সচেতন মহলে নানা আলোচনা ও প্রশ্ন উঠেছে।

তবে এই তীব্র বিতর্কের মধ্যেও সরকারের পক্ষ থেকে আসা একধরনের সমঝোতা ও ঐকমত্যের বার্তাকে সামনে এনেছেন জামায়াতের আমির ও সংসদীয় বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। সংসদে দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর একটি বক্তৃতার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী নিজেই সংসদে বলেছেন যে তারা সময়ের একটি বিশাল অংশ অতীত নিয়ে আলোচনা করে নষ্ট করতে চান না, বরং সামনে এগিয়ে যেতে চান। জামায়াত আমিরও প্রধানমন্ত্রীর এই সুরের সাথে একমত পোষণ করে বলেন, মাঝখানে অন্য কে কী বলল, তা তেমন গুরুত্ব বহন করে না।

অনুরূপভাবে, বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সিনিয়র সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনও কিছুটা নমনীয় সুরে কথা বলেছেন। তিনি জামায়াতের ক্ষমা চাওয়ার বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য না করে জানান, সরকার ও বিরোধী দল হিসেবে তারা বর্তমানে বেশ ভালো অবস্থানে আছেন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নিজেদের মধ্যে কিছু আলোচনা-সমালোচনা থাকবেই, তবে তাদের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্কটি নষ্ট হয়নি। বিএনপির অনেক নেতাই মনে করেন, জামায়াতের পক্ষ থেকে অদূর ভবিষ্যতে ক্ষমা চাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ, তাই এই বিতর্কের জেরে কোনো ধরনের সংঘাত বা সহিংসতায় না জড়িয়ে একটি শান্তিপূর্ণ ও সহনশীল সহাবস্থানের নীতি বজায় রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স এই বিষয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে বলেন, ক্ষমা চাওয়া বা না চাওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক এবং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি ভিন্ন বিতর্ক। তবে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের স্বার্থে সবাইকে একসাথেই কাজ করতে হবে। দলগুলোর মধ্যে যেসব রাজনৈতিক বিষয়ে দূরত্ব ও অস্বস্তি আছে, তা যার যার অবস্থান থেকে পরিষ্কার করা গেলে দেশের জন্যই ভালো হবে।

অন্য দিকে, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ সংসদীয় গণতন্ত্রের কাঠামোর ওপর বিশেষ জোর দিয়ে বলেন, সরকারি ও বিরোধী দল সংসদের ভেতরে সংবিধান এবং কার্যপ্রণালি বিধি মেনেই জনগণের স্বার্থে কাজ করবে। তবে সরকারের তীব্র সমালোচনা করে তিনি অভিযোগ করেন, সরকার অনেক সময় সংসদে তাদের যৌক্তিক দাবি ও সমালোচনাগুলো মানতে চায় না এবং দলীয় স্বার্থকে রাষ্ট্রীয় স্বার্থের চেয়ে প্রাধান্য দেয়। সরকার যদি নিজে থেকে এই একমুখী মনোভাব সংশোধন না করে, তবে বিরোধী দল হিসেবে তাদের বাধ্য হয়ে জনগণের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে রাজপথের আন্দোলনে ফিরে আসতেই হবে।

তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category