• শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬, ১০:৪৫ অপরাহ্ন

৬ টিসিএফে নেমেছে উৎপাদনে থাকা গ্যাসক্ষেত্রের মজুদ

Reporter Name / ১ Time View
Update : শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬

দেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তা এক বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির মুখে পড়েছে। পেট্রোবাংলার সাম্প্রতিক প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বর্তমানে দেশে উৎপাদনে থাকা ২০টি গ্যাসক্ষেত্রের মোট গ্যাসের মজুদ কমে মাত্র ৬ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফুট বা টিসিএফে নেমে এসেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসেও এই উৎপাদনে থাকা ক্ষেত্রগুলোতে গ্যাসের মজুদ ছিল ৬ হাজার ৩২১ বিলিয়ন কিউবিক ফুট (বিসিএফ) বা ছয় টিসিএফের কিছুটা বেশি, যা জুন মাস নাগাদ এই তলানিতে এসে ঠেকেছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশে বর্তমানে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৫৮ বিসিএফ গ্যাস জাতীয় গ্রিডে উত্তোলন করা হয়। সেই হিসাবে স্থানীয় গ্যাসক্ষেত্রে এখন বছরে মোট ৭০০ বিসিএফ গ্যাস উৎপাদিত হচ্ছে। বর্তমানের এই ৬ টিসিএফ মজুদ দিয়ে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বড়জোর আগামী মাত্র আট বছর চলা সম্ভব। প্রতি বছর গ্যাসের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও জোগানের মধ্যে যে বিশাল ব্যবধান তৈরি হচ্ছে, তাতে স্থানীয় পর্যায়ে নতুন গ্যাসের মজুদ বড় আকারে বাড়ানো না গেলে দেশের বিদ্যুৎ খাত থেকে শুরু করে শিল্প-কারখানা এবং নতুন শিল্প বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ গভীর সংকটে পড়তে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

যদিও নিয়ন্ত্রক সংস্থা পেট্রোবাংলা দাবি করেছে, দেশে প্রকৃত গ্যাসের মজুদ এখনো ৭ দশমিক ৬৩ টিসিএফ। তবে এই হিসাবের মধ্যে দেশের পরিত্যক্ত এবং বর্তমানে উৎপাদনে নেই—এমন ১০টি গ্যাসক্ষেত্রের হিসাবও যুক্ত করা হয়েছে। এই ১০টি অচল ক্ষেত্রে মোট ১ হাজার ৩৩৪ বিসিএফ গ্যাসের মজুদ থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি মামলা-সংক্রান্ত জটিলতা ও কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে এই গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে সুনামগঞ্জের ছাতক, সাঙ্গু, ফেনী ও কামতাসহ পাঁচটি পরিত্যক্ত ফিল্ডেই পড়ে রয়েছে অন্তত ৬৬১ বিসিএফ গ্যাস।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও সাবেক আমলা মকবুল ই ইলাহী চৌধুরীর মতে, এই জ্বালানি সংকট একদিনে তৈরি হয়নি, বরং দশকের পর দশক ধরে নেওয়া ভুল নীতি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোর ব্যর্থতার কারণেই আজ এই দুর্দশা। নব্বইয়ের দশকে পর্যাপ্ত গ্যাস অনুসন্ধানে মনোযোগ না দিয়ে ‘প্রচুর গ্যাস আছে’ এমন একটি ভুল ধারণার ওপর নির্ভর করা হয়েছিল। বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানা (যা মার্কিন কোম্পানি শেভরন দ্বারা পরিচালিত) বাদে বাকি ক্ষেত্রগুলোর মজুদ অত্যন্ত যৎসামান্য।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে ২০১৬ সাল থেকে গ্যাসের উৎপাদন ক্রমান্বয়ে কমতে থাকলে তৎকালীন পতিত আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৭ সালে একটি ‘গ্যাস সেক্টর মাস্টারপ্ল্যান’ তৈরি করে। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে গ্যাস অনুসন্ধানের আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনা বা দক্ষ জনবল গড়ার বিপরীতে তৎকালীন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের বিরুদ্ধে আমদানিনির্ভর এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) সিন্ডিকেট ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত দেশে ২ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকার এলএনজি আমদানি করা হয়, যেখানে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলো গত ২৩ বছরে (২০০০-২০২৩ সাল) দেশীয় অনুসন্ধানের জন্য সাকুল্যে মাত্র ৭ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ পেয়েছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও পেট্রোবাংলা নতুন করে ৫১ হাজার কোটি টাকার এলএনজি আমদানির প্রাক্কলন করেছে।

এই বিষয়ে বিশিষ্ট জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক বদরূল ইমাম বলেন, “গত প্রায় দুই দশক আমাদের জ্বালানি খাত ছিল এক রকম অনুসন্ধান বিমুখ। সাগরের বিরাট এলাকা অবহেলায় ফেলে রাখা হয়েছিল, অথচ সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তির পর সেখানে মিয়ানমার ঠিকই গ্যাস উত্তোলন করছে। আমাদের নীতিনির্ধারকেরা দেশীয় দূরদর্শী পরিকল্পনার চেয়ে ক্ষতিকর আমদানি নীতিতে বেশি বিশ্বাসী ছিলেন, যার খেসারত এখন দিতে হচ্ছে।” উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, ২০১৮ সালে ভোলার নর্থ (৪৩৫ বিসিএফ মজুদ), ২০২১ সালে সিলেটের জকিগঞ্জ (৫২ বিসিএফ মজুদ) এবং ২০২৩ সালে ভোলার ইলিশায় নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হলেও বিগত সরকারের অবহেলার কারণে পাইপলাইন নির্মাণ ও কারিগরি সংকটে এগুলোকে গ্রিড লাইনে যুক্তই করা যায়নি।

তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, পেট্রোবাংলা ৫০ ও ১০০টি নতুন কূপ খননের মহাপরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছে। বিশেষ করে সিলেটের জকিগঞ্জ ও ভোলায় পাঁচটি নতুন কূপ খননের কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, যা আগামীতে মজুদ বাড়াতে ভূমিকা রাখবে।

জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম এই স্থবিরতা কাটানোর বিষয়ে বলেন, “দেশের গ্যাসের মজুদ বাড়াতে প্রাথমিক কিছু জরুরি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমাদের টু-ডি (2D) সিসমিক সার্ভেগুলো ১০-১৫ বছরের পুরোনো হওয়ায় কূপ খনন করে আশানুরূপ গ্যাস মিলছিল না। তাই বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে পুরোনো সার্ভেগুলোকে থ্রি-ডি (3D) করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, অলস পড়ে থাকা পরিত্যক্ত গ্যাসক্ষেত্রগুলো সচল করতে পিএসসি (PSC) মডেলে চুক্তির মাধ্যমে কাজ করতে বিদেশী বেশ কয়েকটি কোম্পানি আগ্রহ দেখিয়েছে, যা নিয়ে জ্বালানি বিভাগ বর্তমানে বড় ধরনের পরিকল্পনা করছে।”

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category