রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং সাধারণ মানুষের জানমালের সুরক্ষার প্রধান দায়িত্ব থাকে পুলিশের কাঁধে। কিন্তু সেই রক্ষকই যদি বিশেষ কোনো রাজনৈতিক দলের অন্ধ অনুসারী বা লাঠিয়াল বাহিনীতে পরিণত হয়, তবে রাষ্ট্রের ভিত্তিটাই নড়বড়ে হয়ে যায়। বাংলাদেশের বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের টানা দেড় দশকের শাসনামলে ঠিক এমন একটি অবিশ্বাস্য এবং ভয়ংকর চিত্রই বাস্তবে রূপ নিয়েছিল। পুলিশের মতো একটি সুশৃঙ্খল এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীতে কেবল মেধা বা যোগ্যতার ভিত্তিতে নয়, বরং সুনির্দিষ্ট দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে হাজার হাজার কনস্টেবল। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয়টি হলো, এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নিজেদের পছন্দমতো লোকদের জায়গা করে দিতে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নজিরবিহীন জালিয়াতি এবং ভুয়া ঠিকানার আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল। সম্প্রতি এই নিয়োগ দুর্নীতির ভয়াবহ সব তথ্য জনসমক্ষে আসতে শুরু করেছে, যা শুনে দেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সচেতন মহল রীতিমতো হতবাক।
বিগত সরকারের দীর্ঘ সতেরো বছরের শাসনামলে বিরোধী মতকে কঠোরভাবে দমন করা এবং যেকোনো মূল্যে নিজেদের ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার একটি সুদূরপ্রসারী নীলনকশা তৈরি করা হয়েছিল। আর এই নীলনকশা বাস্তবায়নের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল বাংলাদেশ পুলিশকে। পুলিশ বাহিনীকে একটি অঘোষিত ‘আওয়ামী বাহিনীতে’ রূপান্তরিত করার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল সুনির্দিষ্ট ছয়টি জেলাকে। এই জেলাগুলো হলো—গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, বাগেরহাট এবং খুলনা। পরিকল্পনাটি ছিল অত্যন্ত সুকৌশলী। এই ছয় জেলার ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন, বিশেষ করে ছাত্রলীগের নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মীদের বেছে বেছে পুলিশে নিয়োগ দেওয়ার এক মহাযজ্ঞ শুরু হয়। কিন্তু দেশের প্রচলিত আইন এবং জেলা কোটার কারণে চাইলেই এক জেলার মানুষকে অন্য জেলায় নিয়োগ দেওয়া সম্ভব ছিল না। আর এখানেই রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের ছত্রচ্ছায়ায় শুরু হয় অভিনব এক জালিয়াতি।
এই পুরো অপকর্ম এবং নজিরবিহীন দুর্নীতির প্রধান স্থপতি হিসেবে যার নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে, তিনি হলেন তৎকালীন ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) হাবিবুর রহমান। গোপালগঞ্জের সন্তান হাবিবুর রহমান ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অত্যন্ত আস্থাভাজন একজন কর্মকর্তা। এই পরম আস্থার সুযোগ নিয়ে তিনি পুলিশের চেইন অব কমান্ড ভেঙে নিজের একটি শক্তিশালী বলয় তৈরি করেছিলেন। ২০১২ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ঢাকা জেলার এসপি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি এই নিয়োগ বাণিজ্যের মূল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি এবং পুলিশ সদর দপ্তরে ডিআইজি (প্রশাসন)-এর মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর পদগুলো নিজের কব্জায় নেন। তার ক্ষমতার দাপট এতটাই বেশি ছিল যে, পুলিশের সিনিয়র কর্মকর্তারাও তাকে সমীহ করে চলতেন এবং ভয়ে তার কোনো সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করার সাহস পেতেন না। এমনকি নিজের সার্ভিসের অনেক সিনিয়র কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে তিনি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনারের মতো সর্বোচ্চ পদটিও বাগিয়ে নেন এবং সরকার পতনের শেষ দিন পর্যন্ত সেই পদে বহাল থেকে ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করেন।
হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেটের জালিয়াতির ধরন ছিল সিনেমার গল্পকেও হার মানানোর মতো। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুর এবং মানিকগঞ্জের মতো জেলাগুলোতে যেখানে পুলিশের কোটা বেশি এবং নিয়োগের সুযোগ তুলনামূলক সহজ, সেখানে ওই ছয় জেলার দলীয় কর্মীদের নামে সাময়িকভাবে ছোট ছোট এক টুকরো জমি কেনা হতো। এই জমি কেনার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় ঠিকানার প্রমাণপত্র তৈরি করা। জমি কেনার পর স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা থেকে স্থায়ী নাগরিকত্বের সনদ আদায় করা হতো এবং তার ভিত্তিতে জাতীয় পরিচয়পত্রে (এনআইডি) স্থায়ী ঠিকানা পরিবর্তন করে ফেলা হতো। এরপর এই ভুয়া ঠিকানার ওপর ভিত্তি করে ওইসব জেলার কোটায় ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবল (টিআরসি) পদে নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিত দলীয় প্রার্থীরা। নিয়োগ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ার পর এবং চাকরিতে যোগদানের পরপরই ওই কেনা জমি আবার বিক্রি করে টাকা তুলে নেওয়া হতো। অর্থাৎ, একটি পরিকল্পিত চক্রের মাধ্যমে রাষ্ট্রের চোখে ধুলো দিয়ে হাজার হাজার দলীয় কর্মীকে পুলিশ বাহিনীতে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
তবে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া যে কেবল দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে হয়েছিল, তা কিন্তু নয়। এর পেছনে ছিল এক বিশাল নিয়োগ বাণিজ্য এবং কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন। একদিকে প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় যেমন নিশ্চিত করা হতো, অন্যদিকে চাকরি নিশ্চিত করার বিনিময়ে তাদের কাছ থেকে আদায় করা হতো মোটা অঙ্কের ঘুষ। এই ঘুষের টাকা লেনদেনের মাধ্যমে হাবিবুর রহমানসহ পুলিশের ভেতরের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট রাতারাতি ফুলেফেঁপে ওঠে এবং অঢেল বিত্তবৈভবের মালিক বনে যায়। ক্ষমতার দাপটে সে সময় খোদ গোপালগঞ্জের তিন প্রভাবশালী পুলিশ কর্মকর্তা পুলিশ বাহিনীর ভেতরে তিনটি আলাদা গ্রুপের নেতৃত্ব দিতেন। হাবিবুর রহমান ছাড়া বাকি দুটি গ্রুপের নেতৃত্বে ছিলেন পুলিশের তৎকালীন মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ এবং স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) প্রধান মনিরুল ইসলাম। এই ত্রয়ী শক্তির কাছে পুরো পুলিশ বাহিনী যেন একপ্রকার জিম্মি হয়ে পড়েছিল।
এই দলীয় নিয়োগের সবচেয়ে ভয়ংকর এবং মর্মান্তিক রূপটি দেশবাসী দেখতে পায় সাম্প্রতিক জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের সময়। ২০১২ সাল থেকে শুরু হওয়া এই ভুয়া ঠিকানার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যারা কনস্টেবল হিসেবে বাহিনীতে প্রবেশ করেছিল, সময়ের পরিক্রমায় তাদের অনেকেই পদোন্নতি পেয়ে সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) এবং উপপরিদর্শক (এসআই) পদে উন্নীত হয়েছেন। দেশের বিভিন্ন থানা এবং গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে তাদের পোস্টিং দেওয়া হয়েছিল। গণ-অভ্যুত্থানের সময় যখন ছাত্র-জনতা রাস্তায় নেমে আসে, তখন পুলিশের পোশাক পরা এই সদস্যরা কোনো ধরনের পেশাদারিত্বের তোয়াক্কা না করে দলীয় ক্যাডারের মতো আচরণ শুরু করে। সাধারণ মানুষের বুকের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো, নির্মমভাবে প্রহার করা এবং আন্দোলন দমনে বর্বরোচিত ভূমিকা পালনের সামনের সারিতে ছিলেন ভুয়া ঠিকানায় নিয়োগ পাওয়া এই পুলিশ সদস্যরাই। তাদের কাছে রাষ্ট্র বা জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার চেয়ে দলীয় আনুগত্যই ছিল মুখ্য।
সরকার পরিবর্তনের পর পুলিশ বাহিনীর এই কলঙ্কিত অধ্যায়টি নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়। রাষ্ট্রীয় একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীতে কীভাবে এত বড় মাপের জালিয়াতি হলো এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত ছিল, তা বের করতে বর্তমান সরকার এবং পুলিশ সদর দপ্তর কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ডিআইজি জানিয়েছেন, ঢাকা জেলার পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদীসহ আশপাশের জেলাগুলোতে এত বিপুল পরিমাণ ভুয়া নিয়োগের অভিযোগ আসতে শুরু করে যে, বিষয়টি কেবল কয়েকটি জেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার কোনো সুযোগ ছিল না। ফলশ্রুতিতে, সারা দেশেই এই নিয়োগ বাণিজ্যের শিকড় খুঁজতে একটি বড় ধরনের শুদ্ধি অভিযানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভুয়া ঠিকানায় নিয়োগ পাওয়া এই পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করতে এবং জালিয়াতির পুরো প্রক্রিয়াটি জনসমক্ষে আনতে গত ১৫ মার্চ পুলিশ সদর দপ্তর থেকে দেশের ৬৪ জেলার পুলিশ সুপারদের (এসপি) কাছে একটি কঠোর নির্দেশনাসংবলিত চিঠি পাঠানো হয়েছে। আগামী ১৫ এপ্রিলের মধ্যে এই বিষয়ে বিস্তারিত তদন্ত করে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য এক মাসের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
তদন্ত কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য প্রতিটি জেলায় পুলিশ সুপারকে প্রধান করে চার সদস্যবিশিষ্ট একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন), জেলা গোয়েন্দা কর্মকর্তা (ডিআইও-১) এবং রিজার্ভ অফিসার-১ বা ২। এই কমিটিকে মূলত ছয়টি সুনির্দিষ্ট মানদণ্ডের ওপর ভিত্তি করে তাদের অনুসন্ধান চালাতে বলা হয়েছে। প্রথমত, তাদের খুঁজে বের করতে হবে যে, শুধু জমি কেনার মতো একটি ঠুনকো অজুহাতের ওপর ভিত্তি করে ভিন্ন জেলার কোনো প্রার্থীকে ভুয়া স্থায়ী নাগরিক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে কি না এবং চাকরি পাওয়ার পর সেই জমি বিক্রি করা হয়েছে কি না। দ্বিতীয়ত, নিয়োগ পরীক্ষার সময় অনৈতিক আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থীকে কৌশলে আলাদা কক্ষে বসিয়ে বিশেষ পুলিশ সদস্যদের মাধ্যমে পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা।
তদন্তের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো, মেধা বা যোগ্যতার মূল্যায়ন না করে কেবল প্রার্থী বা তার পরিবারের রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে কাউকে নিয়োগের জন্য যোগ্য বা অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছিল কি না, তার সত্যতা যাচাই করা। চতুর্থত, পরীক্ষার নম্বরে কোনো ধরনের অস্বাভাবিকতা ছিল কি না, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, দলীয় প্রার্থীরা লিখিত পরীক্ষায় অত্যন্ত কম নম্বর পেলেও মৌখিক বা ভাইভা পরীক্ষায় তাদের অস্বাভাবিক রকমের বেশি নম্বর দিয়ে পাস করিয়ে দেওয়া হয়েছে। পঞ্চমত, নিয়োগ পরীক্ষার আগেই কোনো নির্দিষ্ট মহলের কাছে প্রশ্নপত্র ফাঁস করা হয়েছিল কি না, সেটিও এই তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। এবং সর্বশেষ ষষ্ঠ নির্দেশনাটি হলো, নিয়োগ প্রক্রিয়ার এই পবিত্র পরিবেশ যারা নষ্ট করেছে—সেই অসাধু পুলিশ সদস্য, দালাল এবং প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে তৎকালীন কর্তৃপক্ষ কতটা তৎপর ছিল বা আদৌ কোনো ব্যবস্থা নিয়েছিল কি না, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা।
এই তদন্ত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পুলিশ বাহিনীর হারানো গৌরব এবং সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার একটি শক্ত প্রয়াস চালানো হচ্ছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশ বাহিনীর কাজ হলো আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা, কোনো দলের হয়ে লাঠিয়ালের ভূমিকা পালন করা নয়। দীর্ঘদিনের এই দলীয়করণের ফলে বাহিনীর ভেতরে যে পচন ধরেছিল, তা উপড়ে ফেলার জন্য এই তদন্ত প্রতিবেদন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। অপরাধী যেই হোক না কেন, রাষ্ট্রীয় বাহিনীতে এমন নজিরবিহীন জালিয়াতির উপযুক্ত বিচার হওয়াটা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।