• বুধবার, ০৬ মে ২০২৬, ০৫:১৯ অপরাহ্ন
Headline
তৃণমূলের ‘খেলা হবে’ থেকে ‘খেলা শেষ’ রূপোলি পর্দার কমান্ডার কি তামিলনাড়ুর মসনদে? ট্রাম্পের নতুন ব্যবসা: মধ্যপ্রাচ্যের রক্তপাতে আমেরিকার অস্ত্র, তেল ও ‘জলদস্যুতা’ বিএনপি-জামায়াতের টেন্ডার-লড়াই ও ক্ষমতার নতুন সমীকরণ ‘সালমানি’ কায়দায় নাবিল গ্রুপের উত্থান ও জব্দের জালে সাম্রাজ্য ‘বিকল্প শক্তি’ হতে আটঘাট বাঁধছে এনসিপি হাম পরীক্ষার কিট অবশিষ্ট আর মাত্র ৭টি: এরপর কী? প্রশাসনের অন্দরে ‘২৫ বছর’ আতঙ্ক: জনস্বার্থের আড়ালে কি রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযান? তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে নতুন ইতিহাস: ৪৯ বছর পর এমজিআরের রেকর্ড ছুঁলেন বিজয় পুলিশ প্রশাসনে বড় রদবদল: রাজশাহী-বরিশালের কমিশনার ও ১২ জেলার এসপিসহ ৩৯ পদে বদলি

প্রশাসনের অন্দরে ‘২৫ বছর’ আতঙ্ক: জনস্বার্থের আড়ালে কি রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযান?

Reporter Name / ৪ Time View
Update : বুধবার, ৬ মে, ২০২৬

সরকারি চাকরিতে ২৫ বছর পূর্ণ হওয়া একসময় ছিল দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আর অর্জনের মাইলফলক। কিন্তু বর্তমানে এই ‘২৫ বছর’ই যেন প্রশাসন ও পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তাদের জন্য এক চরম আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার বদলের পর থেকেই প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে বদলি ও পদায়নের পাশাপাশি ‘বাধ্যতামূলক অবসর’ বা অকাল অবসরের এক অদৃশ্য খড়্গ নেমে এসেছে। মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে ৩০ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানোর পর এই আতঙ্ক এখন সচিবালয় থেকে শুরু করে পুলিশ সদর দপ্তর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।

আইনের প্যাঁচ ও ‘জনস্বার্থ’ নামক প্রহেলিকা

এই আতঙ্কের মূল কারণ সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৫ ধারা। এই ধারা অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মচারীর চাকরির মেয়াদ ২৫ বছর পূর্ণ হলে সরকার চাইলে যে কোনো সময় তাকে ‘জনস্বার্থে’ অবসরে পাঠাতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে দীর্ঘ আড়াই দশক ধরে রাষ্ট্রের খরচে প্রশিক্ষণ নেওয়া ও অভিজ্ঞতা অর্জন করা একজন কর্মকর্তা হঠাৎ করেই চাকরিচ্যুত হন, অথচ তিনি জানতেই পারেন না তার অপরাধ কী ছিল বা তিনি ঠিক কী ‘জনবিরোধী’ কাজ করেছিলেন।

সাধারণত চাকরিতে বড় ধরনের কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি করলে আইনি প্রক্রিয়ায় বরখাস্ত করা হয়। কিন্তু এই ৪৫ ধারার প্রয়োগ অনেকটা নীরবেই কর্মকর্তাদের ক্যারিয়ারের ইতি টানছে।

রাজনৈতিক রোষানল নাকি রুটিন ওয়ার্ক?

বাধ্যতামূলক অবসরের এই প্রক্রিয়াকে অনেকেই রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযান হিসেবে দেখছেন। অভিযোগ রয়েছে, যখনই ক্ষমতার পটপরিবর্তন হয়, তখনই বিদায়ী সরকারের ‘অনুগত’ হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের এই ধারায় সরিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে দীর্ঘদিনের পদোন্নতি বঞ্চিতরা শূন্য পদগুলোতে পদায়নের সুযোগ পান।

তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এই অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন। তাঁর মতে, নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি ও অবসরের মতো বিষয়গুলো মন্ত্রণালয়ের সম্পূর্ণ রুটিন ওয়ার্ক এবং সবকিছুই আইন মেনে হচ্ছে। কোনো কর্মকর্তার প্রতি যেন অবিচার না হয়, সেজন্য যাচাই-বাছাই করার জন্য নির্দিষ্ট কমিটি রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেছেন।

অতীতের নজির ও বর্তমানের শঙ্কা

বাধ্যতামূলক অবসরের এই রীতি অবশ্য নতুন নয়। নব্বইয়ের দশকে এরশাদ সরকারের আমল থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলেও এই ধারার যথেচ্ছ ব্যবহার দেখা গেছে। ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠায়। সে সময় প্রশাসন ক্যাডারের ২৯ জন, অতিরিক্ত সচিব ও সচিব পদমর্যাদার ৩১ জন, জুডিশিয়াল সার্ভিসের ১৮ জন বিচারক এবং পুলিশের ৫১ কর্মকর্তাকে বিদায় করা হয়। এদের বেশিরভাগই ২০১৪ ও ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

বর্তমান সরকারও সেই একই পথে হাঁটছে। সম্প্রতি তিন দফায় পাঁচজন অতিরিক্ত আইজিপিসহ ৩৫ পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে, যার মধ্যে ১৬ জন ডিআইজি রয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে চলতি মাসের ২৮ তারিখে ২৫ বছর পূর্ণ করতে যাওয়া বিসিএস ২০তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের মাঝে তীব্র শঙ্কা কাজ করছে। বর্তমানে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে সংযুক্ত ১১৩ জন এবং ওএসডি থাকা ৩ জন কর্মকর্তার অতীত কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে বিগত সরকারের আমলে তাদের ভূমিকা নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের সতর্কতা: বিপদের মুখে ভবিষ্যৎ প্রশাসন

ঢালাওভাবে এই বাধ্যতামূলক অবসরের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রশাসন ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, বিগত সরকারের অধীনে দায়িত্ব পালন করা মানেই দলদাস হওয়া নয়।

সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ মনে করেন, আইনের চুক্তিতে সরকারের এই ক্ষমতা থাকলেও চাকরিতে রাজনৈতিকীকরণের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। প্রশাসনকে নির্মোহভাবে কাজ করতে না দিলে এই ছাঁটাইয়ের চক্র চলতেই থাকবে।

অন্যদিকে, প্রশাসন বিশ্লেষক মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া এবং সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার সতর্ক করে বলেছেন, শুধু নির্বাচনে দায়িত্ব পালনের জন্য ডিসি বা অন্য কর্মকর্তাদের ঢালাওভাবে শাস্তি দেওয়াটা খুবই খারাপ নজির। তৎকালীন সরকারের ইচ্ছার বাইরে গিয়ে কাজ করার কোনো সুযোগ মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ছিল না। যারা সুনির্দিষ্টভাবে রাজনৈতিক কর্মীর মতো আচরণ করে কারচুপিতে অংশ নিয়েছেন, কেবল তাদেরই শাস্তির আওতায় আনা উচিত। ঢালাওভাবে সবাইকে অবসরে পাঠালে প্রশাসনে যে শূন্যতা ও ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হবে, তা ভবিষ্যতের যেকোনো সরকারের জন্যই বুমেরাং হতে পারে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category