রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ একাধিক দপ্তর, সংস্থায় দলীয় নেতাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। গ্রেড-২ মর্যাদার পদসহ গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলোর শীর্ষ পদে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় ও অঙ্গসংগঠনের নেতাদের সরাসরি পদায়ন করায় আমলাতন্ত্রের ভেতরে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও মেধার ভিত্তিতে পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকা জ্যেষ্ঠ ও পেশাদার কর্মকর্তাদের ক্যারিয়ার চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। প্রশাসনের স্বাভাবিক গতি বজায় রাখা এবং পদোন্নতির ক্রমধারা অক্ষুণ্ন রাখার জোর দাবি জানিয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, কারিগরি ও প্রশাসনিক দক্ষতার জায়গায় রাজনৈতিক পরিচয়কে প্রাধান্য দিলে দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনায় বিপর্যয় দেখা দেবে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে সম্প্রতি জারি করা পৃথক একগুচ্ছ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদসহ বিভিন্ন কর্পোরেশন ও ট্রাস্টের এক ডজনেরও বেশি উচ্চপদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ঘোষণা করা হয়েছে। পদগুলোতে এক বছরের মেয়াদে যাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাদের একটি বিশাল অংশই ক্ষমতাসীন দল ও এর সহযোগী যুব সংগঠনের কেন্দ্রীয় পদধারী নেতা। ফলে আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর নিরপেক্ষতা এবং পেশাদারিত্ব বজায় থাকবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক এখন প্রশাসনিক স্তর ছাড়িয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও ছড়িয়ে পড়েছে।

যেসব গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সংস্থায় এই চুক্তিভিত্তিক পদায়ন দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে বোয়েসেল, বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশন, বিআইডব্লিউটিসি, বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল কর্পোরেশন, বিসিক এবং বাংলাদেশ জুট কর্পোরেশন। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট, বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড এবং চিনি ও খাদ্যশিল্প কর্পোরেশনের শীর্ষ পদেও একইভাবে রাজনৈতিক নেতাদের নিয়োগ চূড়ান্ত করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী দায়িত্ব পালনকালে তারা অন্য কোনো ব্যবসা বা পেশায় যুক্ত হতে পারবেন না ঠিকই, তবে চাকরির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ছাড়াই এসব কারিগরি ও বাণিজ্যিক দিকনির্দেশনামূলক প্রতিষ্ঠান সামলানোর সক্ষমতা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে চরম সংশয় থেকে যাচ্ছে।
প্রশাসনের শীর্ষ স্তরে এই ধরনের গণ-নিয়োগকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ ও হতাশা দানা বাঁধছে নিয়মিত ক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্যে। ২৫ থেকে ৩০ বছর নিষ্ঠার সাথে সেবা দেওয়ার পর একজন পেশাদার কর্মকর্তা একটি স্বশাসিত সংস্থা বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেওয়ার স্বপ্ন দেখেন। অথচ নিয়মিত পদোন্নতির সুযোগ রুদ্ধ করে বাইরে থেকে আসা অনভিজ্ঞ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের এভাবে বসিয়ে দিলে সরকারি কর্মকর্তাদের কাজের আগ্রহ ও নৈতিক মনোবল মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়ে। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের উপেক্ষা করার এই সংস্কৃতি রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে দীর্ঘস্থায়ী অস্বস্তি এবং স্থবিরতা তৈরি করছে।
তবে আমলাতন্ত্রে সরকার পরিবর্তনের পর দলীয় লোক বসানোর এই সংস্কৃতি বাংলাদেশে একদম নতুন নয়। অতীতেও বিভিন্ন মেয়াদে রাজনৈতিক সরকারগুলো তাদের বিশ্বস্ত অনুসারীদের দু-একটি সংস্থায় বসিয়েছে। কিন্তু একসাথে ডজনখানেক সংস্থায় রাজনৈতিকভাবে পরিচিত ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার ঘটনা প্রশাসনিক ইতিহাসে বিরল ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাধারণ চাকরির আইনের ধারা প্রয়োগ করে বিশেষ দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার সুবিধার্থে চুক্তির ব্যবস্থা থাকলেও, একে নিয়মিত প্রথায় পরিণত করা ক্যাডার ব্যবস্থার মূল ভারসাম্যকে চরমভাবে ব্যাহত করছে।
জনপ্রশাসন বিশ্লেষক ও প্রাক্তন জ্যেষ্ঠ সচিবদের মতে, আমলাতন্ত্রের দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব ধরে রাখতে হলে চুক্তিভিত্তিক পদায়নের ক্ষেত্রে মেধা ও অভিজ্ঞতার ভারসাম্য রক্ষা করা অতীব জরুরি। কোনো পদে হঠাৎ বিশেষ বিবেচনায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে হলে তার সুনির্দিষ্ট কারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক যৌক্তিকতা জনসমক্ষে স্পষ্ট করা উচিত। বিশেষ কোনো ক্ষেত্র ছাড়া কেবল দলীয় পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে আমলাতান্ত্রিক পদে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের আনা হলে তা জনস্বার্থ ক্ষুণ্ন করে এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে দুর্নীতি ও অনিয়ম ঘটার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
একই সাথে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সিভিল সার্ভিসের ভেতরের কোন্দল, অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং দলবাজির কারণেও এমন সংকট তৈরি হচ্ছে। অনেক সময় আমলাদের পারস্পরিক বিরোধের সুযোগে সরকার প্রশাসনের বাইরের রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ওপর বেশি আস্থা রাখতে বাধ্য হয়। তবে যে কারণেই এই পদায়ন হয়ে থাকুক না কেন, প্রতিষ্ঠানের সুশাসন ও পেশাদারিত্ব ধরে রাখতে নিয়মিত কর্মকর্তাদের ন্যায্য মূল্যায়ন নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। রাজনৈতিক নেতাদের মাধ্যমে সরকারি দপ্তর পরিচালনার নীতি অব্যাহত থাকলে সার্বিক রাষ্ট্রপরিচালনায় এক নতুন ধরনের সংকট সৃষ্টি হতে পারে।
তথ্যসূত্র: সমকাল