• শনিবার, ২০ জুন ২০২৬, ০৬:৪১ অপরাহ্ন
Headline
২৫ এবং ৪০ এর প্রেমের সাতটি পার্থক্য এবং আজম খানের গান দেশে হামের তাণ্ডব: ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ৮৮৭ তরুণীকে বারে নিয়ে যৌন হয়রানির অভিযোগ এনসিপি নেতার বিরুদ্ধে ভিনিসিয়াস কুনহা জাদুতে বিশ্বকাপে ব্রাজিলের রাজকীয় প্রত্যাবর্তন ফুটপাতে হকার শৃঙ্খলার নতুন উদ্যোগেও কাটছে না রাজধানীর সংকট মায়ের কোল ছেড়ে অনাথ আশ্রমে দিতে বলা সেই পূজাই আজকের বলিউড তারকা ঐতিহ্যবাহী দলীয় রাজনীতি থেকে মুখ ফেরাচ্ছে তরুণরা ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনে বাংলাদেশের নতুন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ টাকার রেকর্ড অবমূল্যায়ন: বহুমুখী সংকটে দেশের অর্থনীতি রাজধানীর আতঙ্কের জনপদ মোহাম্মদপুর

ফুটপাতে হকার শৃঙ্খলার নতুন উদ্যোগেও কাটছে না রাজধানীর সংকট

Reporter Name / ১ Time View
Update : শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬

রাজধানী ঢাকার রাস্তা ও ফুটপাতে হকারদের শৃঙ্খলার মধ্যে ফিরিয়ে আনতে সম্প্রতি এক অভিনব উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। নতুন এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু ফুটপাত ও সড়কে হলুদ বা লাল রঙের দাগ কেটে হকারদের বসার সীমানা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল। তবে মাঠপর্যায়ে এই মহতি উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে এখন চরম গলদঘর্ম দশা দুই নগর সংস্থার। মূলত রাজধানীতে বিদ্যমান বিশাল সংখ্যার বিপরীতে নতুন এই পদ্ধতিতে বসার সুযোগ পাচ্ছে অতি নগণ্য সংখ্যক হকার। ফলে পুনর্বাসন বা স্থায়ী সমাধান না করে কেবল শৃঙ্খলা ফেরানোর এই চেষ্টা ঢাকাবাসীকে কতটা সুফল দেবে, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

সংখ্যার বিশাল ব্যবধান ও নীতিমালার সীমাবদ্ধতা

দুই সিটি করপোরেশনের সাম্প্রতিক এক সমীক্ষা ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা মহানগরে বর্তমানে হকারের সংখ্যা ছয় লাখের বেশি। তবে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসকদের প্রত্যক্ষ উদ্যোগে প্রণীত ‘হকার নীতিমালা-২০২৬’ কঠোরভাবে অনুসরণ করে হকার বসানোর মতো উপযুক্ত ও নিরাপদ স্থানের পরিমাণ রাজধানীতে অত্যন্ত সীমিত। এই আন্তর্জাতিক মানের নীতিমালা মেনে দুই সিটি করপোরেশন তাদের পুরো নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ মাত্র চার হাজার হকারের জন্য বসার মতো বৈধ স্থান খুঁজে পেয়েছে, যা মোট হকার সংখ্যার এক শতাংশেরও কম।

বাস্তবতা বিশ্লেষণ করে নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, রাজধানীর বিদ্যমান সড়ক ও ফুটপাতের জ্যামিতিক আয়তন বিবেচনা করলে সর্বোচ্চ এক লাখ হকারকে কোনোমতে শৃঙ্খলার সাথে বসার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু অবশিষ্ট পাঁচ লাখেরও বেশি হকারকে কোথায় এবং কীভাবে নিয়মের মধ্যে আনা হবে—তা এখন দুই নগর সংস্থার জন্য সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দুই সিটির বসার ব্যবস্থার বর্তমান চিত্র

হকার নীতিমালা অনুসরণ করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এখন পর্যন্ত ১,৯০০ জন হকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাস্তা ও ফুটপাতে বসার আইনি সুযোগ করে দিয়েছে। এর মধ্যে রমনা ভবনের পাশের সড়কে ৪০০ জন, বায়তুল মোকাররমে ক্রীড়া পরিষদের পাশে ৪৫০ জন, ফুলবাড়িয়া এলাকায় ১৫০ জন, নিউমার্কেটের দক্ষিণ গেটে ২৫০ জন এবং নিউমার্কেট বটতলা থেকে বিজিবি গেট পর্যন্ত সড়কে ১০০ জন হকারকে হলুদ সীমানার ভেতর বসানো হয়েছে।

ডিএসসিসি কর্তৃপক্ষ আরও কিছু নতুন জায়গা চিহ্নিত করেছে, যেখানে দ্রুতই হকারদের বসার অনুমতি দেওয়া হবে। এর মধ্যে রাজউক ভবনের পেছন থেকে মতিঝিলের ইউনুস সেন্টার পর্যন্ত কম যানবাহন চলাচলকারী একটি সড়কে ২০০ জন, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের বিপরীতে এজিবি কলোনির খেলার মাঠের চারপাশের রাস্তার একটি লেনে ৪০০ জন, মতিঝিলের ইসলাম চেম্বারের পেছনের সড়কে ২০০ জন এবং শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনির মৈত্রী সংঘের মাঠের চারপাশে আরও ৪০০ হকার বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ডিএসসিসি এলাকায় বর্তমানে হকারের সংখ্যা প্রায় চার লাখ, ফলে এই বাড়তি দুই হাজার স্থানও প্রয়োজনের তুলনায় সমুদ্রের মাঝে এক বিন্দু জলের মতো।

অন্যদিকে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) কর্তৃপক্ষ মিরপুর ১০ ও ১৪ নম্বর এলাকায় ৪৫০ জন হকারকে নির্দিষ্ট স্থানে বসার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। এর পাশাপাশি শ্যামলীর রিংরোড ও মোহাম্মদপুর এলাকার কিছু খালি জায়গায় আরও কিছু হকারকে বসানোর তোড়জোড় চলছে। সব মিলিয়ে ডিএনসিসি হয়তো আরও দুই হাজার হকারের জায়গা নির্দিষ্ট করতে পারবে, কিন্তু তাদের এলাকায় মোট হকারের সংখ্যা দুই লাখেরও বেশি। ফলে বাকি বিশাল হকার গোষ্ঠী কোথায় বসবে, তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

ঘিঞ্জি পুরান ঢাকা ও নৈশ মার্কেটের নতুন পরিকল্পনা

ডিএসসিসির নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, উত্তর সিটির তুলনায় দক্ষিণ সিটির উন্মুক্ত বা খালি স্থানের পরিমাণ অনেক কম, অপরিকল্পিত এবং ঘিঞ্জি। উদাহরণস্বরূপ, সদরঘাট ও বাবুবাজার এলাকাতেই প্রায় ১০ হাজার হকার প্রতিদিন ব্যবসা পরিচালনা করে। তবে এই পুরো অঞ্চলটি এতটাই ঘিঞ্জি যে, সরকারি নীতিমালা নিখুঁতভাবে মেনে সেখানে ১০০ জন হকারকেও বসার মতো ন্যুনতম আইনি জায়গা দেওয়া অসম্ভব।

এই চরম সংকট থেকে উত্তরণে এবং বিপুল সংখ্যক হকারকে শৃঙ্খলায় আনতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের সহায়তায় আটটি জোনে ‘নৈশ মার্কেট’ বা নাইট মার্কেট চালু করার একটি দূরদর্শী মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ অফিসপাড়ার নির্দিষ্ট কিছু সড়কে বিকেল সাড়ে ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত হকাররা বৈধভাবে বসতে পারবেন। এই নৈশ মার্কেটগুলোতে হকারদের নিজস্ব দায়িত্বে সোলার বাতির ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যদিকে, সিটি করপোরেশন তাদের জন্য ভ্রাম্যমাণ বা মোবাইল টয়লেট এবং নিরাপত্তার জন্য সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করে সহযোগিতা করবে। ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ বর্তমানে রমনা, মতিঝিল, মিরপুর, উত্তরা, তেজগাঁও, ওয়ারী, লালবাগ ও গুলশান বিভাগের সুবিধাজনক স্থানে জায়গা খুঁজছে। এ ছাড়া পূর্বাচলে আরেকটি বড় নৈশ মার্কেট বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে, যার মাধ্যমে রাজধানীর অন্তত এক-চতুর্থাংশ হকারকে একটি নিয়মের মধ্যে আনা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা।

নির্ধারিত সীমানা উপেক্ষা ও আইন প্রণয়নের দাবি

কাগজে-কলমে এতসব মহাপরিকল্পনা ও দাগ কাটার উদ্যোগ নেওয়া হলেও, মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র এখনো বেশ হতাশা ব্যঞ্জক। দুই সিটির চিহ্নিত করা বহু ফুটপাত ও সড়কে দেখা গেছে, হকাররা নির্ধারিত রঙের সীমানা বা হলুদ দাগের তোয়াক্কা না করে আগের মতোই ইচ্ছেমতো ফুটপাত ও মূল সড়কের ওপর দোকান বসিয়ে দাপটের সাথে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। গুলিস্তান সিনেমা হল থেকে জিপিও পর্যন্ত পুরো ফুটপাত ও রাস্তার অর্ধেকেরও বেশি অংশ এখনো হকারদের স্থায়ী দখলে রয়েছে, যার ফলে পথচারী ও যানবাহন চলাচল চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

অনেকে নির্ধারিত কম বিক্রির জায়গা ছেড়ে বেশি ক্রেতাসমাগম হওয়া নিষিদ্ধ স্থানে এসে দোকান বসাচ্ছেন। এই বিষয়ে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার আনিসুর রহমান স্পষ্ট ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ফুটপাতে হকার বসানোর নতুন এই ব্যবস্থায় এখন পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত সুফল মেলেনি। কারণ পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ২৪ ঘণ্টা ফুটপাতে দাঁড়িয়ে পাহারা দিয়ে হকারদের বসা বন্ধ করতে পারবে না; এই ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনেরও প্রশাসনিক তদারকি ও নিয়মিত উচ্ছেদ জোরদার করা উচিত। নির্ধারিত জায়গার বাইরে হকার বসলে নাগরিক ভোগান্তি ও ট্রাফিক জ্যাম কোনোভাবেই কমানো সম্ভব নয়।

ডিএসসিসির প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ সিরাজুল ইসলাম সমকালকে জানান, রাজধানীর ফুটপাত ও সড়কের হকার সমস্যা কোনো ছোটখাটো বিষয় নয়। অতীতে হাজারো বার উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও তা কোনো স্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি। এবার সিটি করপোরেশন হকারদের সম্পূর্ণ উচ্ছেদ বা পুনর্বাসন না করে, তাদের একটি বৈজ্ঞানিক শৃঙ্খলার মধ্যে আনার জন্য এই যুগোপযোগী উদ্যোগটি নিয়েছে। তবে শুধু জায়গা নির্ধারণ করে সব হকারকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি বহুমুখী পদক্ষেপ প্রয়োজন।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সেকান্দার হায়াত এই প্রশাসনিক উদ্যোগের স্থায়ীত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, সিটি করপোরেশনের এমন খণ্ড খণ্ড অস্থায়ী পরিকল্পনার মাধ্যমে এই বিশাল জাতীয় সমস্যার স্থায়ী সমাধান কখনো সম্ভব নয়। হকারদের রুটি-রুজি ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হলে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মতো জাতীয় সংসদে সুনির্দিষ্ট ‘হকার আইন’ পাস করতে হবে। আইনি কাঠামো ও রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি ছাড়া কেবল ফুটপাতে রঙ দিয়ে দাগ কেটে বা পুলিশি পাহারায় ঢাকাকে হকারমুক্ত বা সুশৃঙ্খল করা যাবে না।

তথ্যসূত্র: সমকাল


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category