দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। বরেণ্য অভিনেতা, নাট্যকার, মঞ্চনির্দেশক ও স্বাধীনতাপদকপ্রাপ্ত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আতাউর রহমান আর নেই। সোমবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে রাজধানীর ধানমন্ডির একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর।
শেষ শ্রদ্ধা ও দাফন
বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক কামাল বায়জীদ গণমাধ্যমকে তাঁর জানাজা ও দাফনের বিস্তারিত তথ্য জানিয়েছেন। আজ মঙ্গলবার বাদ জোহর মগবাজারের ইস্পাহানী সেঞ্চুরি আর্কেডে নিজ বাসভবন সংলগ্ন খোলা মাঠে মরহুমের জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর বিকেল ৩টার দিকে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তাঁর মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেওয়া হবে। সেখানে এই কর্মমুখর গুণী মানুষের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানানো শেষে বনানী কবরস্থানে তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে।
অসুস্থতা ও হাসপাতালে লড়াই
আতাউর রহমান বেশ কিছুদিন ধরেই শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। তাঁর মেয়ে শর্মিষ্ঠা রহমান জানিয়েছিলেন, শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় চিকিৎসকদের পরামর্শে প্রথমে তাঁকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। মাঝে স্বাস্থ্যের কিছুটা উন্নতি হওয়ায় লাইফ সাপোর্ট খুলে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রোববার (১০ মে) পুনরায় অবস্থার অবনতি ঘটলে তাঁকে আবার লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। এর দুই দিন পরই সোমবার দিবাগত রাতে তিনি না-ফেরার দেশে পাড়ি জমান।
বর্ণাঢ্য জীবন ও কর্ম
১৯৪১ সালের ১৮ জুন নোয়াখালীতে জন্মগ্রহণ করা আতাউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনের অন্যতম পথিকৃৎ। বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী এই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব একাধারে অভিনেতা, মঞ্চনির্দেশক, লেখক এবং শিক্ষক ছিলেন।
তিনি স্বনামধন্য নাট্যদল ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর নির্দেশনায় মঞ্চায়িত হয়েছে অসংখ্য কালজয়ী নাটক। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—গডোর প্রতীক্ষায়, গ্যালিলিও, ঈর্ষা, রক্তকরবী, ক্রয়লাদ ও ক্রেসিদা, এখন দুঃসময়, অপেক্ষমাণ, আগল ভাঙার পালা, পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, ম্যাকবেথ, বাংলার মাটি বাংলার জল, নারীগণ এবং রুদ্র রবি ও জালিয়ানওয়ালাবাগ। মঞ্চের পাশাপাশি তিনি অসংখ্য টেলিভিশন নাটক ও চলচ্চিত্রেও প্রশংসনীয় অভিনয় করেছেন।
নির্দেশনা ও অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেছেন। সাহিত্যের জগতেও তাঁর উজ্জ্বল বিচরণ ছিল। তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছে—প্রজাপতি নিবন্ধ, মঞ্চসারথির কাব্যকথা, নাটক করতে হলে, নাট্যপ্রবন্ধ বিচিত্রা এবং লেখনী।
স্বীকৃতি ও সম্মাননা
কর্মজীবনে আতাউর রহমান বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট এবং আফ্রো-এশীয় গণসংহতি পরিষদের সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ নাটকের আপিল কমিটি এবং চলচ্চিত্র জুরিবোর্ডের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
দেশের শিল্প, সংস্কৃতি ও নাট্যাঙ্গনে তাঁর অসামান্য ও জীবনব্যাপী অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রাষ্ট্র তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ সম্মাননা স্বাধীনতা পদক এবং একুশে পদক-এ ভূষিত করেছে। তাঁর এই প্রস্থানে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যে শূন্যতার সৃষ্টি হলো, তা অপূরণীয়।