• বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৫৩ অপরাহ্ন
Headline

বাঁওড় মৎস্য প্রকল্পে অসঙ্গতি: তিন কোটি টাকার মাছ ছাড়তে খরচ ৪৫ কোটি

Reporter Name / ২ Time View
Update : বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চারটি গুরুত্বপূর্ণ জেলায় প্রাকৃতিক জলাশয় বা বাঁওড়ের মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনার নামে এক অস্বাভাবিক ও চরম ভারসাম্যহীন উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব করেছে মৎস্য অধিদপ্তর। প্রাকৃতিক নদী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তৈরি হওয়া এসব অশ্বখুরাকৃতি জলাশয়ে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে নেওয়া এই প্রকল্পের মূল উপাদান পোনা মাছ ক্রয়। অথচ প্রস্তাবিত নথিতে দেখা যাচ্ছে, পোনা কেনার জন্য যে অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে, তার তুলনায় আনুষঙ্গিক ও পরিচালন খাতের খরচ প্রায় পনেরো গুণ বেশি। অর্থাৎ প্রকল্পের মূল কাজ যেখানে মাছ অবমুক্ত করা, সেখানে আসল জায়গায় নামমাত্র অর্থ রেখে বাকি সিংহভাগ অর্থই বিভিন্ন বিলাসিতা, সাজসজ্জা ও প্রশাসনিক ব্যয়ের নামে খরচ করার ছক কষা হয়েছে। এই চরম অপচয়মূলক ও অবাস্তব ব্যয় প্রস্তাবের মুখে পরিকল্পনা কমিশন ইতিমধ্যে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে আপত্তি তুলেছে এবং প্রকল্পের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।

মৎস্য অধিদপ্তর প্রণীত ‘নির্বাচিত বাঁওড় এলাকায় সমাজভিত্তিক মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক এই প্রকল্পের আওতায় যশোর, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া জেলার মোট ২৯টি নির্বাচিত বাঁওড়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাঁচ বছর মেয়াদি এই কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট জলাশয়গুলোতে সামগ্রিক মৎস্য উৎপাদন অন্তত ১০ শতাংশ বাড়ানোর উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পুরো প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য সরকারের কাছে মোট ৪৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকার আর্থিক অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। তবে অর্থ বরাদ্দের খাতওয়ারি বিভাজন বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের চোখ কপালে ওঠার উপক্রম হয়েছে। দেখা গেছে, ২৯টি বাঁওড়ে রুই জাতীয় মাছ এবং বিভিন্ন বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় ছোট প্রজাতির পোনা অবমুক্তির জন্য বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে মাত্র ২ কোটি ৯০ লাখ টাকা, যা প্রায় ৩ কোটি টাকার সমান। অথচ সেই পোনা জলাশয়ে ছাড়ার আনুষঙ্গিক আয়োজন ও প্রকল্প বাস্তবায়নের সার্বিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা।

সহজ ও সাধারণ গাণিতিক হিসেবে দেখা যায়, প্রকল্পটিতে এক টাকার পোনা মাছ কেনার বিপরীতে অন্যান্য আনুষঙ্গিক খাতে ব্যয় করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে পনেরো টাকা। শতকরা হিসেবে মোট ব্যয়ের মাত্র ৬ দশমিক ১০ শতাংশ খরচ হবে সরাসরি উৎপাদনশীল খাত অর্থাৎ মাছের পোনা কেনার পেছনে। অপরদিকে অবশিষ্ট ৯৩ দশমিক ৯০ শতাংশ অর্থই খরচ হবে বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় ও প্রশাসনিক খাতে, যার মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। একটি উৎপাদনমুখী উন্নয়ন প্রকল্পে মূল উপাদানের চেয়ে সহায়ক ও পরিচালন ব্যয় এতটা অস্বাভাবিক হারে বেশি হওয়ার বিষয়টি নজিরবিহীন। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, যেখানে পোনা বাবদ বরাদ্দ এত কম, সেখানে বাকি বিপুল অঙ্কের অর্থ কীভাবে উৎপাদন বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

প্রকল্পটির এমন অবাস্তব ও অপচয়মূলক ব্যয় প্রস্তাবের খবর জানতে পেরে পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকেরা রীতিমতো ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। কমিশনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নদী থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া বাঁওড়গুলো দেশের অমূল্য প্রাকৃতিক মৎস্যভাণ্ডার এবং সেখানে উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু এই মহৎ উদ্দেশ্যের আড়ালে যেভাবে এয়ারকন্ডিশনার বা এসি কেনা, আকাশচুম্বী মূল্যে কম্পিউটার ক্রয়, অফিস ভাড়া ও সভা-সেমিনারের মতো খাতে বিপুল অর্থের প্রস্তাব করা হয়েছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এসব খাতে অতিরিক্ত ও প্রশ্নবিদ্ধ বরাদ্দের মাধ্যমে প্রকারান্তরে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির পথ সুগম করা হয়েছে বলে মনে করছে কমিশন। পোনা অবমুক্তির সঙ্গে এসব বিলাসী ব্যয়ের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই এবং তা উৎপাদন বৃদ্ধিতে কীভাবে ভূমিকা রাখবে, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট জবাব ডিপিপিতে নেই।

ব্যয় প্রস্তাবের বিস্তারিত পর্যালোচনায় আরও দেখা যায়, প্রকল্পের আওতায় কেবল চারটি কম্পিউটার ক্রয়ের জন্য আট লাখ টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। সেই অনুযায়ী প্রতিটি কম্পিউটারের গড় মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে দুই লাখ টাকা করে। সরকারি একটি উন্নয়ন প্রকল্পে সাধারণ দাপ্তরিক কাজের জন্য এত উচ্চমূল্যের কম্পিউটার কেনার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বড় ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। প্রস্তাবে কম্পিউটারের সুনির্দিষ্ট কনফিগারেশন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বা বাজারদরের কোনো তুলনামূলক বিবরণ উল্লেখ করা হয়নি। ফলে বাজারদরের চেয়ে বহুগুণ বেশি মূল্য দেখিয়ে সরকারি অর্থ লোপাটের চেষ্টা করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে খোদ মূল্যায়ন কমিটির সদস্যরাও সন্দিহান। কম্পিউটার ছাড়াও প্রকল্পের প্রধান কার্যালয় ও আঞ্চলিক অফিসের জন্য এসি ক্রয়, উচ্চমূল্যের ফটোকপি মেশিন সংগ্রহ, বিলাসবহুল অফিস ভাড়া এবং ঘন ঘন সভা ও সেমিনার আয়োজনের নামে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দের সুপারিশ করা হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের মূল্যায়ন শাখার কর্মকর্তারা বলছেন, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাধারণ দাপ্তরিক কাজের জন্য কেন এত বিপুল পরিমাণ কম্পিউটার ও এসি প্রয়োজন, তা বোধগম্য নয়। তাছাড়া সভা-সেমিনার এবং ওয়ার্কশপের পেছনে যে মোটা অঙ্কের বরাদ্দ রাখা হয়েছে, তার সঙ্গে মাঠপর্যায়ের প্রকৃত মৎস্যজীবী বা জেলেদের জীবনযাত্রার উন্নয়নের কোনো বাস্তব যোগসূত্র দৃশ্যমান নয়। প্রকল্পের মূল্যায়ন কমিটির আসন্ন বৈঠকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রতিনিধিদের মুখোমুখি করে এসব বিলাসী ব্যয়ের প্রতিটি পাই-পয়সার হিসাব তলব করা হবে। বিশেষ করে অফিস ভাড়া এবং পরামর্শক বা কর্মকর্তাদের বৈঠক বাবদ কত টাকা ব্যয় হবে এবং সেই ব্যয়ের সুনির্দিষ্ট সুফল সাধারণ মানুষ কীভাবে পাবে, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে মৎস্য অধিদপ্তরকে।

আর্থিক অসঙ্গতির পাশাপাশি প্রকল্পটির প্রযুক্তিগত ও মাঠপর্যায়ের পরিকল্পনায় গুরুতর ত্রুটি ধরা পড়েছে। প্রকল্পের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হিসেবে ২৯টি বাঁওড়ে মাছের উৎপাদন ১০ শতাংশ বৃদ্ধির কথা বলা হলেও এর পেছনে কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি বা জরিপের তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি। বর্তমানে ওইসব বাঁওড়ে বার্ষিক ঠিক কী পরিমাণ মাছ উৎপাদিত হচ্ছে, উৎপাদন ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেলে অতিরিক্ত কত মেট্রিক টন মাছ জাতীয় উৎপাদনে যুক্ত হবে এবং সেই বাড়তি মাছের আনুমানিক বাজারমূল্য কত দাঁড়াবে, তার কোনো গ্রহণযোগ্য খতিয়ান ডিপিপিতে নেই। এমনকি ২ কোটি ৯০ লাখ টাকায় ঠিক কত লাখ পোনা কেনা হবে, প্রজাতিভেদে পোনার সংখ্যা কত হবে, প্রতি কেজির ক্রয়মূল্য কত ধরা হয়েছে এবং মুক্ত জলাশয়ে ছাড়ার পর সেই পোনার বেঁচে থাকার হার ও বৃদ্ধি কীভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে, সে সংক্রান্ত কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশিকা প্রকল্পে রাখা হয়নি।

প্রকল্পটি পরিচালনার জন্য জনবল নিয়োগের রূপরেখা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ডিপিপির প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ছয়টি পদে জনবল পদায়নের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি পদে সরকারি অন্য দপ্তর থেকে প্রেষণে কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হবে, একটি পদে অতিরিক্ত দায়িত্বে দায়িত্বপ্রাপ্ত হবেন একজন কর্মকর্তা এবং অবশিষ্ট দুটি পদে আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় অস্থায়ী কর্মী নিয়োগ করা হবে। পরিকল্পনা কমিশনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, পাঁচ বছর মেয়াদি একটি প্রকল্পে এই জনবলের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব কী হবে, তাদের পেছনে বেতন-ভাতা বাবদ সরকারের মোট কত টাকা ব্যয় হবে এবং তাদের কার্যক্রম মাঠপর্যায়ে কী দৃশ্যমান প্রভাব ফেলবে, তা অত্যন্ত অস্পষ্ট। সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে জনবলের প্রয়োজনীয়তা ও তাদের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা অপরিহার্য।

উদ্বেগের বিষয় হলো, এমন একটি অসম্পূর্ণ ও প্রশ্নবিদ্ধ প্রকল্প এখনো জাতীয় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির নিয়মিত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতে এটি বরাদ্দবিহীন ও অননুমোদিত প্রকল্পের তালিকায় রয়েছে। তবে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে গত ১ অক্টোবর পাঠানো একটি চিঠির মাধ্যমে প্রকল্পটির দ্রুত ছাড়পত্র নিশ্চিত করতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব বা ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেওয়া হয়। এর আগে চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি মন্ত্রণালয়ের সচিবের নেতৃত্বে গঠিত অভ্যন্তরীণ যাচাই কমিটির সভায় প্রকল্পটি প্রাথমিকভাবে আলোচিত হয়েছিল এবং পরবর্তীতে ২২ এপ্রিল অর্থ বিভাগে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির বৈঠকে জনবল কাঠামোর কিছু সুপারিশ চূড়ান্ত করা হয়েছিল। সেই সুপারিশগুলো যুক্ত করে তড়িঘড়ি করে অনুমোদনের জন্য ফাইল পাঠানো হলেও মূল ব্যয়ের অসঙ্গতিগুলো সংশোধন করা হয়নি।

এই সামগ্রিক বিতর্কের বিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের শীর্ষ নেতৃত্বের বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে এক ধরনের দায়িত্ব এড়ানোর মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ডক্টর মোহাম্মদ খালেদ কনক জানিয়েছেন, তিনি এখনো এই প্রকল্পের বিস্তারিত উন্নয়ন প্রস্তাব পর্যালোচনা করে দেখেননি। ফলে নথিপত্র না দেখে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা সমীচীন হবে না। তিনি এই প্রস্তাবনার মূল রূপকার এবং অধিদপ্তরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সাহেদ আলীর সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। তবে প্রস্তাবিত এই বিতর্কিত প্রকল্পের রচয়িতা সাহেদ আলীর মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়, যার ফলে তার কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। সার্বিক পরিস্থিতিতে সচেতন মহলের দাবি, সরকারি অর্থের অপচয় রোধে এই ধরনের বিলাসী ও অকার্যকর প্রকল্প অবিলম্বে পুনর্বিবেচনা করে প্রকৃত উৎপাদনমুখী খাতে ব্যয় নিশ্চিত করা হোক।

তথ্যসূত্র: যুগান্তর


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category