যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস এবং উন্নত ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখা হাজারো মানুষের জন্য এক চরম দুঃসংবাদ নিয়ে এসেছে মার্কিন প্রশাসন। বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য অভিবাসী ভিসা বা ইমিগ্র্যান্ট ভিসা দেওয়ার প্রক্রিয়া অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। আজ শনিবার (২৫ এপ্রিল, ২০২৬) ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস ভিসা সংক্রান্ত এক বিশেষ বার্তার মাধ্যমে এই তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে। এই ঘোষণার ফলে মূলত যারা যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাতে চেয়েছিলেন, তাদের জন্য এক বিশাল অনিশ্চয়তার দেয়াল তৈরি হলো। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, এই কঠোর সিদ্ধান্তটি শুধুমাত্র অভিবাসী বা স্থায়ী ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যারা পর্যটক (ট্যুরিস্ট), শিক্ষার্থী (স্টুডেন্ট) বা সাময়িক কাজের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যেতে চান, তাদের জন্য এই স্থগিতাদেশ কোনো প্রভাব ফেলবে না।
সিদ্ধান্তের নেপথ্যে: সরকারি সহায়তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা
মার্কিন প্রশাসনের এই আকস্মিক ও কঠোর সিদ্ধান্তের পেছনে মূল কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে দেশটিতে বসবাসরত অভিবাসীদের সরকারি সহায়তা বা ‘ওয়েলফেয়ার’ (Welfare) গ্রহণের উচ্চ হারকে। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট বা পররাষ্ট্র দপ্তরের দাবি, এই ৭৫টি দেশ থেকে আসা অভিবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রের করদাতাদের অর্থে পরিচালিত বিভিন্ন সরকারি সহায়তা কর্মসূচির ওপর অতিরিক্ত মাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। মার্কিন নাগরিকদের কষ্টার্জিত করের টাকায় পরিচালিত স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য সহায়তা এবং বাসস্থানের মতো সুবিধাগুলো এই অভিবাসীরা এমন মাত্রায় গ্রহণ করছেন, যা মার্কিন অর্থনীতির জন্য একটি বড় বোঝায় পরিণত হয়েছে বলে মনে করছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। রাষ্ট্রের ওপর থেকে এই বিশাল অর্থনৈতিক বোঝা কমাতেই মূলত এই ভিসা স্থগিতাদেশের মতো চরম পদক্ষেপের পথে হেঁটেছে দেশটি।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সতর্কবার্তা এবং ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এর তালিকা
এই সিদ্ধান্তের পেছনের প্রেক্ষাপটটি আসলে তৈরি হয়েছিল চলতি বছরের একেবারে শুরুতে। গত ৪ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ (Truth Social)-এ একটি বিশদ তালিকা প্রকাশ করেন। ১২০টি দেশ ও অঞ্চলের ওই তালিকায় দেখানো হয়েছিল যে, কোন কোন দেশের অভিবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সবচেয়ে বেশি মাত্রায় সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হচ্ছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার পোস্টে অত্যন্ত স্পষ্টভাবেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, যেসব দেশের নাগরিকরা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে অবদান রাখার বদলে উল্টো রাষ্ট্রের কাঁধে বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তাদের প্রবেশাধিকার সীমিত করা হবে। সেই সতর্কবার্তারই একটি চূড়ান্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবায়ন হলো স্টেট ডিপার্টমেন্টের এই ভিসা স্থগিতাদেশ।
তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ও পরিসংখ্যানের ভয়াবহতা
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রকাশিত সেই ১২০টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তালিকা অনুযায়ী, সর্বোচ্চ সরকারি সহায়তা গ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৯তম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পরিসংখ্যান এবং ‘ইমিগ্র্যান্ট ওয়েলফেয়ার রেসিপিয়েন্ট রেটস বাই কান্ট্রি অব অরিজিন’ শীর্ষক নথির তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি অভিবাসী পরিবারগুলোর একটি বিশাল অংশ—যার হার প্রায় ৫৪.৮ শতাংশ—কোনো না কোনোভাবে মার্কিন সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা গ্রহণ করে থাকে। অর্ধেকেরও বেশি পরিবারের এহেন রাষ্ট্রীয় সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতার কারণেই মূলত বাংলাদেশ এই স্থগিতাদেশের তালিকায় এত ওপরের দিকে স্থান পেয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের ওপর প্রভাব
বাংলাদেশের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার আরও বেশ কয়েকটি দেশ এই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মারাত্মক কবলে পড়েছে। ট্রাম্পের ওই তালিকা এবং পরবর্তীতে স্টেট ডিপার্টমেন্টের স্থগিতাদেশের আওতায় থাকা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলো হলো—পাকিস্তান, আফগানিস্তান, নেপাল এবং ভুটান। অর্থাৎ, ভারত ও শ্রীলঙ্কা বাদে দক্ষিণ এশিয়ার একটি বিশাল অংশের অভিবাসীদের জন্যই যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী দরজা আপাতত বন্ধ হয়ে গেল। এই দেশগুলো থেকে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মানুষ মেধা, শ্রম এবং পারিবারিক পুনর্মিলনীর আশায় আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যান। কিন্তু নতুন এই নীতিমালার ফলে পুরো অঞ্চলের অভিবাসন প্রত্যাশীদের মাঝে এক গভীর হতাশা ও শঙ্কা নেমে এসেছে।
অভিবাসী বনাম অনভিবাসী ভিসা: কাদের জন্য এই কড়াকড়ি?
এই স্থগিতাদেশের প্রকৃত প্রভাব বুঝতে হলে আমাদের অভিবাসী (Immigrant) এবং অনভিবাসী (Non-Immigrant) ভিসার মধ্যে পার্থক্যটি পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে। ‘অভিবাসী ভিসা’ হলো সেই ধরনের ভিসা, যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস করার (যাকে সাধারণত ‘গ্রিন কার্ড’ বলা হয়) অধিকার পান। এর মধ্যে রয়েছে মার্কিন নাগরিকদের নিকটাত্মীয়দের জন্য স্পন্সর করা ফ্যামিলি ভিসা (যেমন—স্বামী/স্ত্রী, সন্তান, বা পিতা-মাতার জন্য), কর্মসংস্থান-ভিত্তিক ইমিগ্র্যান্ট ভিসা (যেমন—ইবি ক্যাটাগরি), এবং ডাইভারসিটি ভিসা (ডিভি লটারি)। এই সবগুলো ক্যাটাগরির প্রসেসিং এখন স্থগিত থাকবে। অন্যদিকে, ‘অনভিবাসী ভিসা’ বা নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা হলো অস্থায়ী ভিসা। যেমন—এফ-১ (শিক্ষার্থী), বি-১/বি-২ (ব্যবসায়িক বা পর্যটন), এবং এইচ-১বি (অস্থায়ী পেশাজীবী কর্মী) ভিসার কার্যক্রম আগের মতোই সম্পূর্ণ স্বাভাবিকভাবে চলবে। অর্থাৎ, কেউ যদি ঘুরতে, পড়তে বা মিটিং করতে যেতে চান, তাদের দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই।
‘পাবলিক চার্জ’ নীতির কঠোর প্রয়োগ
মার্কিন সরকারের এই পদক্ষেপের মূলে রয়েছে ‘পাবলিক চার্জ’ (Public Charge) নীতির অত্যন্ত কঠোর প্রয়োগ। মার্কিন আইনে ‘পাবলিক চার্জ’ বলতে এমন ব্যক্তিদের বোঝায়, যারা নিজেদের ভরণপোষণের জন্য মূলত রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। এর মধ্যে রয়েছে ‘স্ন্যাপ’ (SNAP) বা ফুড স্ট্যাম্প (খাদ্য সহায়তা), ‘মেডিকেইড’ (Medicaid) বা বিনামূল্যে চিকিৎসা, ‘সাপ্লিমেন্টাল সিকিউরিটি ইনকাম’ (SSI) এবং ‘সেকশন ৮’ বা হাউজিং ভাউচার (বাসস্থান সহায়তা)-এর মতো সুবিধাগুলো। মার্কিন ইমিগ্রেশন আইনে আগে থেকেই এই নিয়ম ছিল যে, যারা ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের ওপর বোঝা হতে পারে, তাদের ভিসা প্রত্যাখ্যান করা হবে। বর্তমান প্রশাসন সেই পুরোনো নিয়মটিকেই আরও বিস্তৃত এবং কাঠামোগতভাবে প্রয়োগ করছে।
বাস্তবায়নের সময়রেখা ও বর্তমান পরিস্থিতি
স্টেট ডিপার্টমেন্ট এই স্থগিতাদেশ কার্যকর করার প্রক্রিয়াটি বেশ কয়েক মাস ধরেই ধাপে ধাপে এগিয়ে নিচ্ছিল। চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি থেকেই মূলত এই ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য অভিবাসী ভিসা দেওয়ার প্রক্রিয়াটি অঘোষিতভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল। তবে আজ ২৫ এপ্রিল ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ এবং গণমাধ্যম বার্তার মাধ্যমে বিষয়টি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে পরিষ্কার করা হলো। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের নথি অনুযায়ী, আবেদনকারীদের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়াটি নতুন করে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। যারা যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হবেন না—কেবল তাদেরই যাওয়ার সুযোগ দিতে এই পুনর্মূল্যায়ন চলছে।
পারিবারিক পুনর্মিলনীতে বাধা ও মানসিক বিপর্যয়
এই স্থগিতাদেশের ফলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন সেইসব বাংলাদেশি পরিবার, যারা বছরের পর বছর ধরে তাদের প্রিয়জনদের যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করছেন। পারিবারিক স্পনসরশিপের অধীনে আবেদন করা হাজার হাজার ফাইল এখন মার্কিন দূতাবাসে বা ন্যাশনাল ভিসা সেন্টারে আটকা পড়ে থাকবে। একজন স্বামী তার স্ত্রীকে, সন্তান তার বৃদ্ধ পিতামাতাকে, অথবা ভাই তার বোনকে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়ার যে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন, তা এখন অনির্দিষ্টকালের জন্য থমকে গেল। ভিসা ফি, মেডিকেল চেকআপ এবং আইনজীবীদের পেছনে হাজার হাজার ডলার খরচ করার পর এই আকস্মিক স্থগিতাদেশ আবেদনকারীদের শুধু আর্থিকভাবেই নয়, বরং মানসিকভাবেও চরম বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
ভবিষ্যতের পূর্বাভাস এবং অনির্দিষ্টকালের অপেক্ষা
এই স্থগিতাদেশ ঠিক কতদিন বলবৎ থাকবে, সে সম্পর্কে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বা ডেডলাইন বেঁধে দেওয়া হয়নি। স্টেট ডিপার্টমেন্ট কেবল জানিয়েছে যে, আবেদনকারীদের আর্থিক সচ্ছলতা এবং স্বনির্ভরতার বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত করার জন্য নতুন যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া বা মেকানিজম তৈরি করা হচ্ছে। সেই প্রক্রিয়া চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়িত ও পরীক্ষিত না হওয়া পর্যন্ত এই ৭৫ দেশের অভিবাসী ভিসা প্রদান স্থগিতই থাকবে।
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত কেবল তাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সুরক্ষাই নয়, বরং এটি একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক বার্তারও প্রতিফলন। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ (America First) বা ‘সবার আগে আমেরিকা’ নীতির অধীনে বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন প্রমাণ করতে চাইছে যে, মার্কিন নাগরিকদের করের টাকার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে তারা অভিবাসন ব্যবস্থায় যেকোনো ধরনের কঠোর থেকে কঠোরতর পদক্ষেপ নিতে পিছপা হবে না।
সার্বিকভাবে, বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের ওপর এই অভিবাসী ভিসা স্থগিতাদেশ বৈশ্বিক অভিবাসন ব্যবস্থায় একটি বিশাল ধাক্কা। এটি শুধু একটি প্রশাসনিক নির্দেশনাই নয়, বরং এটি একটি সতর্কবার্তা যে, উন্নত দেশগুলো এখন তাদের অভিবাসন নীতিকে অর্থনীতি ও জাতীয় স্বার্থের দাঁড়িপাল্লায় অনেক বেশি কঠোরভাবে পরিমাপ করছে। বাংলাদেশের জন্য এটি একাধারে চরম উদ্বেগের বিষয়, তেমনি রেমিট্যান্স প্রবাহ ও প্রবাসীদের ভবিষ্যতের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের এই নতুন কড়াকড়ি কত হাজারো মানুষের ‘আমেরিকান ড্রিম’ বা স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটাবে, তা হয়তো সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত, আটলান্টিকের ওপারে স্থায়ী হওয়ার স্বপ্নে এক বিশাল দেয়াল তৈরি হয়ে গেল।