আগামী ১ মে মহান মে দিবস বা আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উপলক্ষে রাজধানী ঢাকায় এক বিশাল সমাবেশের আয়োজন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) অন্যতম সহযোগী ও শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের সংগঠন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল। এই দিনটি বিশ্বব্যাপী শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, সংগ্রাম এবং আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবে পালিত হয়ে আসে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও দিনটির রাজনৈতিক ও সামাজিক তাৎপর্য অপরিসীম। এবারের মে দিবসের সমাবেশটি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একটি বিশেষ মাত্রা পেতে যাচ্ছে, কারণ এই সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
শনিবার সকালে রাজধানীর নয়াপল্টনে অবস্থিত বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যৌথসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিং বা সংবাদ সম্মেলনে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মে দিবসের এই সমাবেশের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক উত্তাপ, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর সাম্প্রতিক মন্তব্যের কড়া জবাব দেন।
সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, আগামী ১ মে, বুধবার দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের সড়কে এই বিশাল শ্রমিক সমাবেশ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে। সমাবেশকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে সারা দেশের শ্রমিক শ্রেণী এবং দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছে।
এবারের সমাবেশের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এবং তাৎপর্যের জায়গাটি হলো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি উপস্থিতি। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, নির্বাসন এবং গত ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে তারেক রহমান প্রথমবারের মতো মে দিবসের মতো এত বড় একটি শ্রমিক সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সমাবেশ থেকে প্রধানমন্ত্রী দেশের শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, শিল্পের বিকাশ, ন্যূনতম মজুরি কাঠামো সংস্কার এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকারের যুগান্তকারী কোনো নীতি বা রূপরেখা ঘোষণা করতে পারেন।
মে দিবসের প্রস্তুতির খবরের পাশাপাশি শনিবারের সংবাদ সম্মেলনের বড় একটি অংশজুড়ে ছিল রাজনীতিতে নতুন করে তৈরি হওয়া বিতর্ক। সম্প্রতি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান একটি মন্তব্যে দাবি করেছিলেন যে, সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যাপক ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা কারচুপির মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। একসময়ের রাজনৈতিক মিত্র জামায়াত আমিরের এমন বিস্ফোরক মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা ও কড়া নিন্দা জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও কড়া ভাষায় মির্জা ফখরুল বলেন, “তিনি (জামায়াত আমির) এবং তার দল কখনোই সুষ্ঠু ও স্বাভাবিকভাবে চিন্তা করতে পারেন না। তাদের চিন্তাধারায় সবসময়ই একধরনের নেতিবাচকতা কাজ করে।”
ফখরুল আরও স্পষ্ট করে বলেন, সদ্য সমাপ্ত এই নির্বাচনটি ছিল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক। দেশি এবং বিদেশি সব স্বাধীন নির্বাচন পর্যবেক্ষক, সুশীল সমাজ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় একবাক্যে স্বীকার করেছেন যে, এই নির্বাচনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে নিরপেক্ষ, অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হয়েছে। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমেই এই নির্বাচনটি একটি উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে।
নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয়ের প্রসঙ্গ টেনে মির্জা ফখরুল বলেন, “এই নির্বাচনে বিএনপি কোনো ধরনের কারচুপি বা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আশ্রয় নেয়নি, বরং নিজেদের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার ওপর ভর করেই ২১৩টি আসনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল সরকার গঠন করেছে।”
জনগণের এই বিপুল ম্যান্ডেটকে প্রশ্নবিদ্ধ করার যেকোনো অপচেষ্টাকে তিনি গণতন্ত্রের ওপর সরাসরি আঘাত বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “সুতরাং জামায়াত আমিরের এই ভিত্তিহীন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত বক্তব্যকে আমি দলের পক্ষ থেকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করছি। একই সাথে এই ধরনের দায়িত্বহীন মন্তব্যের জন্য আমি তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করছি।”
সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গত ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গটি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বহু রক্ত ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে ৫ আগস্ট দেশে যে পরিবর্তন এসেছে, তার মূল লক্ষ্যই ছিল একটি স্বৈরাচারী ব্যবস্থার পতন ঘটিয়ে দেশে একটি সুস্থ ও প্রাতিষ্ঠানিক গণতান্ত্রিক ধারা প্রতিষ্ঠা করা।
জামায়াতকে প্রচ্ছন্নভাবে ইঙ্গিত করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, “আজকে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন মহল থেকে বিএনপির ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের ওপর ধোঁয়াশা সৃষ্টি করার চেষ্টা চলছে। একটি গোষ্ঠী চাইছে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিভেদ ও অস্থিরতা সৃষ্টি করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে।”
ফখরুলের মতে, ৫ আগস্টের পর দেশের গণতন্ত্রকে একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার যে সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে, কিছু অশুভ শক্তি সেই সুযোগটি নষ্ট করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আমাদের সবাইকে অত্যন্ত গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে যে, কোনো মহল আবারও দেশে একটি স্বৈরাচারী বা অগণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য পেছনের দরজা দিয়ে ষড়যন্ত্র করছে কি না। ভিন্ন কোনো মোড়কে দেশকে আবারও স্বৈরাচারের অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হচ্ছে কি না, সেটি নিয়ে দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিককে ভাবতে হবে।”
জামায়াতে ইসলামীর অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা ও মুক্তিযুদ্ধের সময়কার অবস্থানকে ইঙ্গিত করে মির্জা ফখরুল বলেন, “অতীতের ইতিহাস এবং তাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড বিবেচনা করে এ দেশের জনগণ ইতিমধ্যেই ওই নির্দিষ্ট দলকে রাজনৈতিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।”
তিনি বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের প্রতি নির্দেশ দিয়ে বলেন, শুধু আবেগ দিয়ে নয়, বরং রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও আদর্শ দিয়ে ভবিষ্যতেও এ ধরনের অপশক্তিকে মোকাবিলা করতে হবে। গণতন্ত্রবিরোধী যেকোনো ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করার লক্ষ্যে তিনি দলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীকে ভেদাভেদ ভুলে ইস্পাতকঠিন ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার উদাত্ত আহ্বান জানান।
শনিবারের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সাথে দলের অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন—বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী আহমেদ, বর্তমান সরকারের যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস এবং যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন প্রমুখ।
নেতৃবৃন্দের এই সম্মিলিত উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, বিএনপি সরকার বর্তমানে যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক উসকানি বা অপপ্রচারের বিরুদ্ধে অত্যন্ত সতর্ক এবং ঐক্যবদ্ধ। একই সাথে তারা দেশের শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়েও নিজেদের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হিসেবে প্রমাণ করতে চাইছে।
সবশেষে, আগামী ১ মে নয়াপল্টনে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের এই বিশাল সমাবেশকে সর্বাত্মকভাবে সফল করার জন্য বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দলসহ দলের সব অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী, সমর্থক এবং আপামর জনসাধারণের প্রতি স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করার আহ্বান জানান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, একদিকে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের প্রতিশ্রুতি এবং অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির প্রতি কঠোর বার্তা—সব মিলিয়ে আগামী ১ মের এই সমাবেশটি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দিকনির্দেশনামূলক ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে। দেশের মানুষের নজর এখন সেদিকেই নিবদ্ধ, সেদিন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঠিক কী বার্তা দেন এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা তা কীভাবে মোকাবিলা করেন।