• মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫৭ অপরাহ্ন
Headline
বাফার স্টক না থাকায় বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ও সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি দেশের অর্থনীতি আমলাতান্ত্রিক গ্যাঁড়াকলে রাষ্ট্রায়ত্ত জাহাজ: দেশি ট্যাংকার ভাড়ায় বিদেশে, চড়া প্রদেয় মূল্যে বিদেশি জাহাজে আসছে জ্বালানি ডিউটি ফাঁকি দিয়ে প্রাইভেট ক্লিনিকে চিকিৎসকদের রমরমা বাণিজ্য হাজব্যান্ড থিংস! অনাহার ও তোষণনীতি: রাজনৈতিক কাঠামোর কাছেই জিম্মি সাধারণ মানুষ আসন্ন বৈশ্বিক খাদ্যসংকটের পদধ্বনি: ফোর-এফ সংকটের মুখে কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ? লোকসানের ফাঁদে আউশ: কেবল প্রণোদনা নয়, কৃষকের লাভ নিশ্চিত করা জরুরি দাঁড়িয়ে থাকার ফলে কোমর ব্যথা হলে কী করবেন? ১০১ শিক্ষককে বিশেষ সম্মাননা পদক প্রদান করলেন প্রধানমন্ত্রী প্রিজন ভ্যান খুলে দেন এসআই প্রদীপ, প্রাইভেট কারে পালান পিচ্চি রাজা

বাফার স্টক না থাকায় বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ও সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি দেশের অর্থনীতি

Reporter Name / ০ Time View
Update : মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৬

দেশের সামগ্রিক খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে চাল ও গমের মতো কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে বর্তমানে সরকারি গুদামগুলোতে প্রায় চব্বিশ লাখ টন বিশাল মজুদ সংরক্ষিত রয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ সরকারি মজুদ দেশের আপৎকালীন পরিস্থিতি মোকাবেলা করা, যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্যোগ সামাল দেওয়া এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে সরকারকে এক বিশাল ও নির্ভরযোগ্য সহায়তা প্রদান করে থাকে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, খাদ্যের ক্ষেত্রে এমন একটি সুদৃঢ় ও মজবুত সুরক্ষাবলয় তৈরি করা সম্ভব হলেও, বৈশ্বিক কোনো আকস্মিক ধাক্কা বা অপ্রত্যাশিত সংকট সামাল দেওয়ার জন্য দেশের জ্বালানি খাতে আজ পর্যন্ত কোনো ধরনের জরুরি মজুদ ব্যবস্থা বা দরকারি অবকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে দেশের পুরোপুরি আমদানিনির্ভর তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ক্ষেত্রে এ ধরনের আপৎকালীন মজুদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে দীর্ঘদিন ধরে জোরালোভাবে সতর্ক করে আসছেন জ্বালানি খাতের শীর্ষ বিশেষজ্ঞরা। জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় নিজস্ব কোনো ‘বাফার’ সুবিধা বা আপৎকালীন মজুদ না থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারের যেকোনো সামান্যতম অস্থিরতা ও মূল্যবৃদ্ধির পুরো ঝুঁকি এবং চরম দায়ভার সরাসরি দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি ও সাধারণ ভোক্তাদের কাঁধেই এসে পড়ছে।

জ্বালানি খাতের যেকোনো পণ্য বিশ্বের যেকোনো স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের জন্য একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও কৌশলগত পণ্য হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও বেশি উদ্বেগজনক, কারণ এখানকার সিংহভাগ জ্বালানি পণ্যের জন্যই দেশকে সম্পূর্ণভাবে আন্তর্জাতিক বিশ্ববাজারের মর্জির ওপর নির্ভর করতে হয়। এই চরম আমদানিনির্ভরতার কারণে দেশের অভ্যন্তরে শক্তিশালী মজুদ অবকাঠামো নির্মাণ করাটা যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে। অতীতের বিভিন্ন সরকারের, বিশেষ করে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে এলএনজি ও এলপিজির জন্য বিশাল স্টোরেজ বা মজুদ সক্ষমতা গড়ে তোলার গালভরা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও, বাস্তবে তার সিকিভাগও বাস্তবায়িত হয়নি। আর ঠিক এই কাঠামোগত ব্যর্থতার কারণেই আজ বিশ্ববাজারের চলমান যেকোনো সংকট ও অস্থিরতার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব দেশের বাজারে পড়ছে এবং সাধারণ মানুষকে চড়া দামে পণ্য কিনে এর চরম মাশুল গুনতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের সুনির্দিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, দেশে যদি অন্তত দেড় থেকে দুই মাসের এলএনজি ও এলপিজির আপৎকালীন মজুদ সংরক্ষিত থাকত, তবে যেকোনো আকস্মিক সরবরাহ সংকট ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির মতো শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে খুব সহজেই বেরিয়ে আসার বা বাজার সামাল দেওয়ার একটি বড় সুযোগ রাষ্ট্রের হাতে থাকত।

বর্তমানে দেশের সামগ্রিক জ্বালানি খাতে সবচেয়ে বড় ও ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়েছে এলপিজি বা তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসকে কেন্দ্র করে। সরকারি আমদানি ও কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত পরিমাণ এলপিজি বিদেশ থেকে নিয়মিতভাবে আমদানি করা হলেও, রহস্যজনকভাবে দেশের খুচরা বাজারে পণ্যটির তীব্র ও কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। এই অস্বাভাবিক সংকটের পেছনে আমদানিকারক, বেসরকারি অপারেটর থেকে শুরু করে প্রান্তিক পর্যায়ের রিটেইলার বা খুচরা বিক্রেতারা একে অপরের দিকে আঙুল তুললেও এবং নানা ধরনের অভিযোগের কথা জানালেও, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা এর পেছনে একটি ভিন্ন ও রূঢ় বাস্তবতাকে দায়ী করছেন। তাদের মতে, বাজারে এলপিজির এমন ভয়াবহ সংকটের পেছনে সবচেয়ে বড় ও একমাত্র কারণ হলো সরকারের নিজস্ব কোনো আপৎকালীন মজুদ ব্যবস্থা না থাকা।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে দেশে এক লাখ টন এলপিজি স্টোরেজ বা মজুদ সক্ষমতা গড়ে তোলার বিশাল প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) দীর্ঘদিন ধরে এই অত্যন্ত জরুরি অবকাঠামোটি গড়ে তোলার কথা মুখে মুখে বলে আসলেও, আদতে মাঠে এর কোনো বাস্তব প্রয়োগ বা নির্মাণকাজ দেখা যায়নি। এমনকি এই বিপিসি এ ধরনের কৌশলগত মজুদ সক্ষমতা গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে দেশের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় মূল্যবান জমিও বরাদ্দ পেয়েছিল। কিন্তু জমি বরাদ্দ পাওয়ার পরও বাস্তবে সেখানে কোনো ধরনের ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের কাজ আজ পর্যন্ত শুরুই করা সম্ভব হয়নি।

দেশে সরকারি উদ্যোগে এলপিজি মজুদ সক্ষমতা নির্মাণের লক্ষ্যে বর্তমানে কাজ করে যাচ্ছে বিপিসির নিজস্ব সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান এলপি গ্যাস পিএলসি। প্রতিষ্ঠানটি এরই মধ্যে বাগেরহাটের মোংলা সমুদ্রবন্দরে বাৎসরিক এক লাখ টন ধারণক্ষমতার একটি বিশাল মজুদ অবকাঠামো গড়ে তোলার জন্য জোরেশোরে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে এলপি গ্যাস পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. আমীর মাসুদ অত্যন্ত আশাবাদী কণ্ঠে বণিক বার্তাকে জানান যে, এলপিজির একটি সুদৃঢ় স্টোরেজ গড়ে তুলতে মোংলায় বাৎসরিক এক লাখ টন সক্ষমতার অবকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। এরই মধ্যে এই মেগা প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্টাডি বা সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এই প্রকল্পে সাড়ে আট হাজার টন ধারণক্ষমতার একটি শক্তিশালী স্টোরেজ ক্যাপাসিটি প্রস্তুত থাকবে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এখানে সরাসরি সরকারের কোষাগার থেকে কোনো অর্থ না নিয়ে বিপিসি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত তিন বিপণন কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার নিজস্ব তহবিল থেকে কীভাবে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাওয়া যায়, সেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে বর্তমানে নিবিড়ভাবে কাজ চলছে। এর পাশাপাশি কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে একটি গভীর সমুদ্র চ্যানেল এবং আমদানিভিত্তিক বিশাল অবকাঠামো নির্মাণ নিয়েও জোর কদমে কাজ চলছে এবং এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।

বিপিসির নিজস্ব নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশে সরকারিভাবে সরাসরি এলপিজি আমদানি করতে মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে বিপিসি একটি অত্যন্ত বৃহৎ আকারের এলপিজি টার্মিনাল নির্মাণের দূরদর্শী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী এই প্রকল্পটি ২০২৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়ে ২০২৮ সালের মধ্যে এর সম্পূর্ণ নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। যদিও অত্যন্ত হতাশার বিষয় হলো, এখন পর্যন্ত এই মেগা প্রকল্পের মাঠপর্যায়ের কোনো বাস্তব অগ্রগতি হয়নি বলে বিপিসির একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় জানা গেছে। মূল নির্মাণ পরিকল্পনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, মাতারবাড়িতে এলপিজির এই টার্মিনালটি হবে একটি অত্যাধুনিক রেফ্রিজারেটেড মাদার টার্মিনাল। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সরাসরি এই টার্মিনালে এলপিজি আসার পর, এখান থেকে দেশের বিভিন্ন বেসরকারি এলপিজি কোম্পানির কাছে বাল্ক বা পাইকারি আকারে তরল গ্যাস বিক্রয় করা হবে। প্রস্তাবিত এই বিশাল এলপিজি টার্মিনালের বার্ষিক অপারেশন বা পরিচালনার ক্ষমতা হবে প্রায় দশ থেকে বারো লাখ টন। সরকারি উদ্যোগে এলপিজি আমদানি এবং দেশে নতুন এলপিজি প্ল্যান্ট স্থাপনের লক্ষ্যে একটি প্রি-ফিজিবিলিটি স্টাডি বা প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য বিপিসি ও পেট্রোবাংলার সঙ্গে মালয়েশিয়ার একটি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সমঝোতা স্মারক সইয়ের কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে।

দেশের এলপিজি আমদানির বিশাল বাজারে বেসরকারি অপারেটরদের একচেটিয়া আধিপত্যের বাইরে গিয়ে বিপিসি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে পণ্যটি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় আমদানি করার একটি চমৎকার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। বিপিসি তাদের নিজস্ব সক্ষমতায় সরাসরি বিশ্ববাজার থেকে এলপিজি আমদানি করে তা সাশ্রয়ী মূল্যে বেসরকারি অপারেটরদের কাছে সরবরাহ করার একটি সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতিও প্রদান করেছিল। চলতি মাসেই বেসরকারি অপারেটররা অত্যন্ত আশায় বুক বেঁধেছিল যে তারা বিপিসির কাছ থেকে সুলভ মূল্যে এলএনজি কিনে তা দেশের বাজারে নিরবচ্ছিন্নভাবে সরবরাহ করবে। কিন্তু অত্যন্ত আক্ষেপের বিষয় হলো, দফায় দফায় জোরালো চেষ্টা করার পরও বিপিসি শেষ পর্যন্ত এক টন এলপিজিও আমদানি করতে সক্ষম হয়নি। দেশে এ ধরনের সরকারি সক্ষমতা গড়ে তোলা গেলে এবং যেকোনো আকস্মিক সংকট পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের নিজস্ব বিশাল মজুদ থেকে বেসরকারি অপারেটরদের নিরবচ্ছিন্নভাবে পণ্য সরবরাহ করা গেলে দেশের বাজারে এলপিজির তীব্র সংকট সম্পূর্ণ স্বাভাবিক নিয়মেই কেটে যেত। তখন গুটিকয়েক বেসরকারি আমদানিকারক ও সরবরাহকারীদের পক্ষে দেশের এলপিজি বাজারের ৯৮ শতাংশ একচেটিয়াভাবে নিয়ন্ত্রণ করার কোনো সুযোগই অবশিষ্ট থাকত না।

দেশের সাধারণ ও প্রান্তিক ভোক্তাদের ওপর নতুন করে চরম অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে গতকাল এক ধাক্কায় বারো কেজি ওজনের এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বা বিইআরসি এই বিপুল পরিমাণ দাম বাড়ানোর পেছনে যুক্তি হিসেবে বিশ্ববাজারে পণ্যটির দাম বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক রুটে জাহাজ ভাড়া বেড়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি কবে নাগাদ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হবে, কিংবা বাব আল মানদেব প্রণালিতে সৃষ্ট বর্তমান অচলবস্থা ঠিক কতদিন ধরে চলবে, সে বিষয়ে কারো কাছেই কোনো সুস্পষ্ট ধারণা নেই। আর যদি আদৌ এই বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক সংকট অচিরেই দূর না হয়, তবে দিনের পর দিন দেশের বাজারে এভাবে লাগামহীন দাম বাড়িয়ে ঠিক কতদিন পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে, তা নিয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ ভোক্তাদের মনে এক বিশাল প্রশ্নবিদ্ধ ও হতাশাজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

বিশ্ববাজার থেকে জ্বালানি আমদানিতে উদ্ভূত এমন শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি শুধু যে এলপিজির ক্ষেত্রেই ঘটছে তা কিন্তু নয়, ঠিক একই ধরনের ভয়াবহ পরিস্থিতি বর্তমানে চলছে এলএনজি বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রেও। দেশে এলএনজির নিজস্ব কোনো মজুদ সক্ষমতা বা স্টোরেজ টার্মিনাল না থাকায় সরকারকে সরাসরি আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল থাকতে হয়। কোনো কারণে যদি বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম আকস্মিকভাবে বেড়ে যায় বা কখনো দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির কার্গো যথাসময়ে দেশের বন্দরে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তখন পুরো দেশের গ্যাস খাতে এক বড় ধরনের বিপর্যয় ও হাহাকার দেখা দেয়। আর এই গ্যাস সংকটের সরাসরি ও ভয়ংকর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে দেশের সামগ্রিক শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ খাতসহ অর্থনীতির অন্যান্য সব গুরুত্বপূর্ণ খাতে।

স্থানীয় পর্যায়ে পাইপলাইনের প্রাকৃতিক গ্যাসের তীব্র সংকটের কারণে দেশের আবাসিক খাতের গ্রাহকদের এক বিশাল অংশ এখন বাধ্য হয়ে রূপান্তরিত জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে। আবাসিক গৃহস্থালি, সিএনজি স্টেশন, যানবাহনের অটোগ্যাস এবং শিল্পের বিশাল একটি অংশ এখন সরাসরি এলপিজির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রতি মাসে এক লাখ পঞ্চাশ হাজার টনেরও বেশি পরিমাণ এলপিজির বিশাল ব্যবহার রয়েছে। প্রাকৃতিক গ্যাসের তীব্র সংকটে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে অনেক ভারী শিল্পকারখানাও এখন এলপিজিতে রূপান্তর সম্পন্ন করেছে। এর ফলে শুধুমাত্র শিল্প খাতেই এলপিজির মাসিক চাহিদা বর্তমানে পঞ্চাশ হাজার টনে উন্নীত হয়েছে বলে খাতসংশ্লিষ্ট শীর্ষ ব্যবসায়ীরা নিশ্চিত করেছেন। দেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতায় এলপিজির এই ক্রমবর্ধমান ব্যবহার ভবিষ্যতে আরও বহুগুণে বাড়বে। ফলে দেশের চাকা সচল রাখতে এবং শিল্পের নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রাখার জন্য শুধুমাত্র বিদেশ থেকে এলপিজি আমদানির ওপর নির্ভর করলেই চলবে না, বরং এর পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে শক্তিশালী মজুদ অবকাঠামো গড়ে তোলাটাও এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন জ্বালানি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই।

অন্যদিকে নিজস্ব কোনো ল্যান্ডবেজড মজুদ সক্ষমতা না থাকায় বিশ্ববাজার থেকে কার্গো আমদানিতে সামান্যতম সংকট তৈরি হলেই তাৎক্ষণিকভাবে সাগরের ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ রাখতে হয়। এতে কোনো ধরনের গ্যাস সরবরাহ না চালিয়েও ওই টার্মিনালগুলোকে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা মাশুল হিসেবে প্রদান করতে হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে সাগরে বৈরী ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া বিরাজ করলে ভাসমান টার্মিনালে গ্যাসবাহী বিশাল জাহাজ ভিড়তে না পারার কারণে বছরে অন্তত তিন থেকে চারবার পুরো এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় পেট্রোবাংলা। দেশে যদি একটি শক্তিশালী ল্যান্ডবেজ বা স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল এবং স্টোরেজ নির্মাণ করা যেত, তবে এ ধরনের অপ্রত্যাশিত ও চরম বিপর্যয়কর পরিস্থিতি খুব সহজেই এড়ানো সম্ভব হতো। অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিতিশীল ও লাগামহীন দামের মুখেও নিজেদের রিজার্ভ ব্যবহার করে অন্তত এক থেকে দুই মাস দেশের বাজারে দাম না বাড়িয়েই বিপুল অঙ্কের অতিরিক্ত ব্যয় অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সামাল দেওয়া সম্ভব হতো।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের সম্মানিত উপাচার্য অধ্যাপক ম তামিম বণিক বার্তাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন যে, বিদেশ থেকে আমদানি করা যেকোনো কৌশলগত পণ্যের ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী বাফার স্টক বা আপৎকালীন মজুদ থাকাটা যেকোনো দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বিশাল মজুদ দেশের সামগ্রিক বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করতে এবং যেকোনো বৈরী পরিস্থিতিতেও বাজারে পণ্যের সরবরাহ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রাখতে এক বিশাল ও অভাবনীয় ভূমিকা পালন করে। দেশে জ্বালানি খাতের মজুদ অবকাঠামোর কথা বলতে গেলে এলপিজি এবং এলএনজি টার্মিনাল স্টোরেজ সিস্টেম গড়ে তোলাটা এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এগুলো কোনো সাধারণ পণ্য নয়, বরং অত্যন্ত কৌশলগত পণ্য, যা পদে পদে বিশ্ববাজারের অস্থিরতার মুখ থেকে আমদানি করে আনতে হয়। বর্তমানে দেশে এলপিজির যে ভয়াবহ কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে, সেখানে স্থানীয় সরবরাহ চেইনে এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ীদের মধ্যে একটি মারাত্মক মজুদপ্রবণতা দেখা যাচ্ছে বলে উল্লেখ করে অধ্যাপক ম তামিম আরও বলেন যে, এর মূল কারণ হলো বিশ্ববাজারের সিপি প্রাইস বা চুক্তিমূল্য এখন সবাই সহজেই দেখতে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার সামান্যতম পূর্বাভাস পেলেই দেশের বাজারে সরবরাহকারীদের হাতে মজুদের অনৈতিক নিয়ন্ত্রণ চলে যায়। এক্ষেত্রে যদি সরকারের নিজস্ব বিশাল স্টোরেজ সক্ষমতা থাকত, তবে সেখান থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বাজারে এলপিজির সরবরাহ বাড়িয়ে সিন্ডিকেটের হাত থেকে বাজার খুব সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যেত। মজুদের এই অমোঘ বিষয়টি একইভাবে অত্যন্ত জোরালোভাবে প্রযোজ্য এলএনজির ক্ষেত্রেও। দেশে যদি অন্তত এক মাসের ব্যবহারের সমপরিমাণ এলএনজির মজুদ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেত, তবে বিশ্বজুড়ে যেকোনো যুদ্ধবিগ্রহ, উচ্চমূল্য কিংবা সরবরাহ চেইনের বিপর্যয় সামাল দিয়ে দেশের জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রে তা এক বিশাল ও যুগান্তকারী ভূমিকা রাখত।

আমদানিনির্ভর বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যেকোনো ধরনের আপৎকালীন জ্বালানি সংকট অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে মোকাবেলায় নিজেদের বিশাল মজুদের কৌশল অবলম্বন করে থাকে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সৃষ্ট যেকোনো বড় সংকটের সময়েও বিশ্ববাজারে চরম মূল্যবৃদ্ধি বা সরবরাহ ঘাটতি দেখা দিলে তারা নিজেদের মজুদ থেকে জ্বালানি ব্যবহার করে পরিস্থিতি অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় সামাল দিতে পেরেছে। আপৎকালীন যেকোনো জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় সম্পূর্ণ সুপরিকল্পিত ও নিশ্ছিদ্র জ্বালানিনিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে এশিয়ার অন্যতম পরাশক্তি জাপান। মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ওপর মারাত্মকভাবে নির্ভরশীল এই দেশটি সংকট এড়াতে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ত্রিস্তরীয় মজুদ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। হরমুজ প্রণালি এবং লোহিত সাগরে সৃষ্ট সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝেও জাপানের এই যুগান্তকারী মজুদ কৌশল অত্যন্ত সফলভাবে তাদের দেশের বাজারকে সম্পূর্ণ স্থিতিশীল রাখতে সক্ষম হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়ার এক বিস্তারিত ও প্রশংসাসূচক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এশিয়া মহাদেশের বৃহৎ আমদানিকারক দেশ চীন এলপিজি এবং এলএনজির ক্ষেত্রে শুধু গতানুগতিক মজুদের ওপরই নির্ভরশীল নয়, বরং দেশটি ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবেলায় বিভিন্ন ধাপে অত্যন্ত আধুনিক জ্বালানিনিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি করেছে। ২০২৪ সালে এসে চীন তাদের সরকারি ও বেসরকারি খাতের উৎপাদন সক্ষমতা এবং মজুদ উৎসগুলোকে একটি সুনির্দিষ্ট ও একক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। তারা তাদের ভূগর্ভস্থ বিশাল মজুদকে একটি শক্তিশালী মৌসুমি রিজার্ভ বা সিজনাল বাফার হিসেবে গড়ে তুলেছে। এলএনজি টার্মিনালের ক্ষেত্রে তারা শুধু একটি সাধারণ স্টোরেজ সিস্টেমই গড়ে তোলেনি, বরং এর পাশাপাশি উপকূলীয় বিশাল টার্মিনাল, জরুরি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক এলএনজি ট্যাংক ব্যবস্থা সম্পূর্ণ প্রস্তুত করে রেখেছে।

আপৎকালীন যেকোনো ভয়াবহ জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি হলো তাদের বিশ্বখ্যাত কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ। পুরো বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বৃহত্তম জরুরি অপরিশোধিত তেলের মজুদ ব্যবস্থা বর্তমানে তাদের হাতেই রয়েছে। উনিশ শতক সত্তরের দশকের ভয়াবহ জ্বালানি সংকটের তিক্ত অভিজ্ঞতার পর ১৯৭৫ সালে এই বিশাল রিজার্ভ ব্যবস্থাটি প্রতিষ্ঠা করে যুক্তরাষ্ট্র। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধাবস্থা এবং বিশ্ববাজারে সৃষ্ট চরম অস্থিতিশীলতার কারণে দেশটি এক নতুন ও যুগান্তকারী মজুদ সংরক্ষণ কৌশল অবলম্বন করছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের যেকোনো আকস্মিক ধাক্কা সামাল দিতে আমেরিকা ইতিমধ্যেই তার এই বিশাল মজুদ থেকে রেকর্ড পরিমাণ তেল দেশের বাজারে ছেড়েছে। এছাড়া বাজারে সরবরাহ করা প্রতি এক ব্যারেল তেলের বিপরীতে শীর্ষ তেল কোম্পানিগুলোকে আগামী এক বছর বা একটি নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার পর এক দশমিক দুই পাঁচ ব্যারেল তেল জরিমানাসহ ফেরত দিতে হবে। এই অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত চুক্তির ফলে দেশের সাধারণ করদাতাদের কোনো অর্থ খরচ না করেই আমেরিকার জাতীয় রিজার্ভ আগের চেয়ে আরও অনেক গুণ বাড়ানো সম্ভব হবে। এছাড়া দেশটি তাদের বিশাল সরকারি মজুদ থেকে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তেল ধার হিসেবেও প্রদান করছে।

বিশ্বের অনেক দেশেই এলএনজির আপৎকালীন নিরাপত্তার জন্য বেশকিছু জরুরি ও সুচিন্তিত মজুদ ব্যবস্থা অত্যন্ত কঠোরভাবে চালু রয়েছে। এর মধ্যে প্রথমত রয়েছে, বিশাল এলএনজি টার্মিনালের স্টোরেজ সক্ষমতা, ভূগর্ভস্থ প্রাকৃতিক গ্যাস স্টোরেজ নির্মাণ, সাগরের ভাসমান টার্মিনালে গ্যাস সংরক্ষণ করা এবং যেকোনো একটি দেশের ওপর নির্ভর না করে আমদানির ক্ষেত্রে একাধিক সরবরাহকারী দেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি নির্ধারণ করা। আর এলপিজির ক্ষেত্রে বড় আকারে শক্তিশালী স্টোরেজ ও বাল্ক ট্যাংক সংরক্ষণ করা, সমুদ্র বন্দরভিত্তিক বিশাল স্টোরেজ ক্যাপাসিটি তৈরি করা, বেসরকারি আমদানিকারকদের জন্য বাধ্যতামূলক ন্যূনতম মজুদের আইনি বাধ্যবাধকতা রাখা, জরুরি পরিস্থিতিতে সরকারি মজুদ দ্রুত বাজারে ছেড়ে দেওয়া এবং আমদানির ক্ষেত্রে একটিমাত্র বন্দরের ওপর নির্ভর না করে একাধিক সামুদ্রিক বন্দর ও নদীবন্দর ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত সুচারুভাবে গড়ে তোলা হয়েছে।

কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি কোনো সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা না থাকায় যেকোনো সামান্যতম সংকট মোকাবেলায় বিশ্ববাজার থেকে অনেক বেশি ও চড়া দামে জ্বালানি আমদানি করতে বাধ্য হচ্ছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে তরল জ্বালানি তেল, এলএনজি এবং এলপিজির মতো কৌশলগত পণ্যগুলো। এসব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত জ্বালানি পণ্য নিয়মিতভাবে আমদানি করতে গিয়ে বারবার তীব্র অর্থ সংকট এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের মারপ্যাঁচে আটকে গিয়ে হাবুডুবু খাচ্ছে বাংলাদেশ। বর্তমানে দেশে তরল জ্বালানি তেলের যে মজুদ সংরক্ষণাগার রয়েছে, তা দিয়ে মাত্র ষাট দিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব। এই অপর্যাপ্ত মজুদ বাড়িয়ে অন্তত নব্বই দিনে উন্নীত করার একটি নতুন পরিকল্পনা তুলে ধরেছে বর্তমান সরকার। বিপিসির নিজস্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই দেশের জ্বালানি তেলের মজুদ সংরক্ষণাগার ৭১ দিনে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতের জন্য এলএনজি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার কারণে গত ফেব্রুয়ারি মাসের তুলনায় বর্তমানে প্রায় তিন গুণ বেশি দামে এই তরল পণ্যটি বিশ্ববাজার থেকে আমদানি করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। চড়া দামে কিনে দেশের বাজারে সরবরাহ ঠিক রাখতে এরই মধ্যে বিশাল অঙ্কের ভর্তুকির বোঝাও বইতে হচ্ছে সরকারকে। বিশ্ববাজারে বিদ্যমান এই চড়া দাম যদি আগামী কয়েক মাস অব্যাহত থাকে, তবে শুধুমাত্র এলএনজি আমদানিতেই চলতি বছর নব্বই হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ ব্যয় হতে পারে বলে চরম শঙ্কার কথা জানিয়েছেন খোদ পেট্রোবাংলার শীর্ষ কর্মকর্তারা।

দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্প উদ্যোক্তা এবং ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বণিক বার্তাকে দেওয়া এক বিস্তারিত সাক্ষাৎকারে বলেন যে, দেশে এলপিজি এবং এলএনজির শক্তিশালী মজুদ অবকাঠামো গড়ে তোলা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা ও তর্কবিতর্ক চলছে। দেশের বেসরকারি খাতও এ বিষয়ে তাদের নিজস্ব প্রস্তাব সরকারের কাছে পেশ করেছে। তিনি জানান যে, এলপিজি, এলএনজি এবং ভবিষ্যতের জ্বালানি হাইড্রোজেন নিয়ে ইস্ট কোস্ট গ্রুপের পক্ষ থেকে সরকারকে তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিন থেকে চার বছর আগে দেওয়া সেই যুগান্তকারী প্রস্তাবগুলো ঠিক কী কারণে বা কার ইশারায় আমলাতান্ত্রিক গ্যাঁড়াকলে আটকে আছে, তা আজও তাদের কাছে সম্পূর্ণ অজানা। দেশের জ্বালানি খাতে যদি শক্তিশালী স্টোরেজ ক্যাপাসিটি বা মজুদ সক্ষমতা থাকত, তবে যেকোনো বৈশ্বিক সংকটকালে তা দেশকে এক বিশাল ও অকল্পনীয় সুবিধা প্রদান করত। দেশের গভীর সমুদ্রবন্দর এলাকায় যদি জ্বালানি খাতের এসব অত্যাধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলা যেত, তবে দেশের ভেতরে দাম নিয়ন্ত্রণ করা, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নিরবচ্ছিন্ন রাখা এবং বিশাল বিশাল মাদার ভেসেল বা বড় জাহাজ সরাসরি দেশে আমদানি করাসহ আরও অনেক কিছুই করার এক বিপুল সুযোগ সৃষ্টি হতো। জ্বালানি কোনো সাধারণ পণ্য নয়, এটি রাষ্ট্রের একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর কৌশলগত পণ্য, এটি সরাসরি জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে জড়িত, তাই এগুলো নিয়ে যেকোনো সরকারেরই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করা একান্ত দরকার।

দেশে অবিলম্বে এলপিজি স্টোরেজ সক্ষমতা গড়ে তোলার অপরিসীম গুরুত্ব নিয়ে বেসরকারি খাতের শীর্ষ কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিরা বিভিন্ন সময়ে জোরালোভাবে কথা বলেছেন। তাদের সুস্পষ্ট ভাষ্য হলো, দেশে যদি একবার বিশাল এলপিজি স্টোরেজ সক্ষমতা গড়ে তোলা যায় এবং সেখান থেকে অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে এলপিজি সরবরাহ করা যায়, তবে দেশের অনেক নতুন ও আগ্রহী অপারেটর এই খাতে বিনিয়োগ করতে এগিয়ে আসবে। ফ্রেশ এলপিজির চিফ মার্কেটিং অফিসার আবু সাঈদ রাজা বণিক বার্তাকে তার নিজস্ব মতামত জানাতে গিয়ে বলেন যে, বর্তমানে বেসরকারি অপারেটররাই সম্পূর্ণ নিজেদের উদ্যোগে দেশের বাজারে এলপিজির বিশাল সরবরাহ নিরবচ্ছিন্নভাবে বজায় রাখছে। এক্ষেত্রে সরকার যদি নিজে থেকে বিশাল অবকাঠামো সুবিধা তৈরি করতে পারে, তবে দেশের বেসরকারি খাত সেই সুবিধা গ্রহণ করে ভোক্তাদের সেবা দিতে পারবে। বিশেষত এই ধরনের সরকারি উদ্যোগ দেশের সামগ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় এক বিশাল ও যুগান্তকারী সহায়তা প্রদান করবে। অনেক দিন ধরেই দেশে এলপিজির একটি মেগা স্টোরেজ নির্মাণ নিয়ে আলোচনা চলছে এবং এটি অতি দ্রুত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। এতে করে দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানিনিরাপত্তা আরও বহুগুণ এগিয়ে যাবে।

দেশের স্থানীয় গ্যাস ক্ষেত্রগুলোতে উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে সৃষ্ট প্রাকৃতিক গ্যাস সংকটের প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যতে এলএনজি আমদানির হার জ্যামিতিক হারে আরও বাড়বে বলে জোরালো ধারণা করা হচ্ছে। দেশের ক্রমবর্ধমান গ্যাসের বিপুল চাহিদা মেটাতে অত্যন্ত জরুরি ভিত্তিতে এলএনজি স্টোরেজ বা মজুদ সক্ষমতা তৈরির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সমন্বিত মহাপরিকল্পনা বা আইইপিএমপি-২০২৩-এ। সরকারের এই সর্বশেষ মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৫০ সালের পর দেশের এলএনজি আমদানি টার্মিনালগুলোর বার্ষিক গ্যাস খালাসের সক্ষমতা ত্রিশ মিলিয়ন টন বা তারও বেশি ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে একটি সুনির্দিষ্ট প্রাক্কলন করা হয়েছে। এর আগে বিদ্যুৎ খাতের তৎকালীন মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে করা পাওয়ার সিস্টেম মাস্টারপ্ল্যান বা পিএসএমপি-২০১৬-তে দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানির নিজস্ব মজুদ ও উৎপাদন ক্রমান্বয়ে আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে জ্বালানির বহুমুখীকরণ এবং অত্যন্ত শক্তিশালী জ্বালানি অবকাঠামো নির্মাণের কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছিল। সেই মাস্টারপ্ল্যানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে এককভাবে শুধুমাত্র গ্যাসের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল না থাকারও একটি জোরালো পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের এসব দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনায় বারবার জ্বালানি অবকাঠামো নির্মাণ, জ্বালানি আমদানির বহুমুখী উৎস এবং শক্তিশালী মজুদ সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর সর্বাধিক জোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত হতাশাজনক হলেও সত্য যে, বাস্তবে দেখা গেছে, অতীতের সরকারগুলো দেশের নিজস্ব জ্বালানি মজুদে কোনো ধরনের জোর না দিয়ে বরং সাময়িক সমাধানের পথ হিসেবে সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় এককভাবে শুধু আমদানির ওপর নির্ভর করে গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ দিয়েই পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার এক আত্মঘাতী চেষ্টা চালিয়ে গেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি আমদানির মারাত্মক ঝুঁকি, আন্তর্জাতিক যুদ্ধবিগ্রহ, জ্বালানির অস্বাভাবিক উচ্চমূল্য এমনকি স্থানীয় জ্বালানির ক্রমবর্ধমান হ্রাস পাওয়ার মতো জাতীয় জীবনের অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়গুলোকে কখনোই যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়নি।

দেশে সরকারিভাবে একটি বিশাল এলপিজি স্টোরেজ গড়ে তুলতে এরই মধ্যে জমি বরাদ্দ পেয়েছে সরকারি মালিকানাধীন এলপি গ্যাস কোম্পানি। এই কোম্পানিটি একটি নয়, বরং তিনটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় জমি বরাদ্দ পেয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী, বাগেরহাটের মোংলা এবং মহেশখালীর মাতারবাড়ী। যদিও দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পরও এখন পর্যন্ত এই মেগা প্রকল্পের কোনো উল্লেখযোগ্য বা দৃশ্যমান অগ্রগতি চোখে পড়েনি। দেশের বাজারে প্রতি মাসে এলপিজির দাম সরাসরি নির্ধারণ করে দেয় এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন। প্রতি মাসে দাম নির্ধারণ করার পাশাপাশি এই কমিশন দেশে এলপিজি স্টোরেজ গড়ে তোলার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সরকারকে কোনো ধরনের নীতিগত পরামর্শ দিতে পারে কিনা, এমন একটি প্রশ্নের জবাবে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি সংশ্লিষ্ট কোনো শীর্ষ কর্মকর্তা।

এই অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের বা বিইআরসির বর্তমান চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বণিক বার্তাকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে জানান যে, জ্বালানি তেল এবং এলএনজির জন্য আপৎকালীন একটা শক্তিশালী মজুদ ব্যবস্থাপনা সরকার অবশ্যই নিজের উদ্যোগে করতে পারে। তবে তিনি এ বিষয়েও সতর্ক করে দেন যে, এ ধরনের বিশাল মজুদ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ইনভেন্টরি কস্ট বা মজুদ রক্ষণাবেক্ষণের বিশাল ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ার একটি বড় সুযোগও রয়েছে। দেশে অতি দ্রুত এলপিজি ও এলএনজি স্টোরেজ অবকাঠামো গড়ে তোলার একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বর্তমানে বর্তমান সরকারের চিন্তায় রয়েছে। সামগ্রিক জ্বালানিনিরাপত্তায় এ ধরনের বিশাল অবকাঠামো নির্মাণ করে বাজারে জ্বালানির সরবরাহ সম্পূর্ণ স্থিতিশীল রাখা এবং দাম সাধারণ মানুষের আওতার মধ্যে স্বাভাবিক রাখার বিষয়েও বর্তমান সরকারের একটি বড় অগ্রাধিকার রয়েছে। পুরো বিষয়টি নিয়ে সরকারের সর্বোচ্চ মহলের সুস্পষ্ট মন্তব্য জানতে গতকাল বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা ইকবাল হাসান মাহমুদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাকে কোনোভাবেই পাওয়া সম্ভব হয়নি।

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category