যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের স্যান ডিয়েগো শহরে একটি শান্ত ও পবিত্র উপাসনালয় মুহূর্তের মধ্যেই পরিণত হলো এক বধ্যভূমিতে। আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহার ঠিক আগমুহূর্তে, যখন স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায় উৎসবের প্রস্তুতিতে মগ্ন, ঠিক তখনই জাতিগত ও ধর্মীয় বিদ্বেষের এক নির্মম শিকার হলো শহরটির সবচেয়ে বড় ইসলামিক সেন্টার। গতকাল সোমবার স্থানীয় সময় দুপুর ১২টার দিকে দুই কিশোর বন্দুকধারীর অতর্কিত হামলায় মসজিদের এক সাহসী নিরাপত্তাকর্মী এবং দুই কর্মীসহ মোট তিনজনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। পরবর্তীতে মসজিদ থেকে কয়েক ব্লক দূরে একটি গাড়ির ভেতর থেকে ওই দুই হামলাকারীর মরদেহও উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, নৃশংস এই হত্যাযজ্ঞ চালানোর পর তারা নিজেরাই নিজেদের গুলিতে আত্মহত্যা করেছে। এই ঘটনায় পুরো যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তীব্র ক্ষোভ, শোক এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে।
স্যান ডিয়েগোর ক্লেয়ারমন্ট এলাকায় অবস্থিত ‘ইসলামিক সেন্টার অব স্যান ডিয়েগো’ (আইসিএসডি) শুধু একটি উপাসনালয়ই নয়, বরং এটি ওই অঞ্চলের মুসলিমদের জন্য একটি প্রধান সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাকেন্দ্র। এই সেন্টারের ভেতরেই পরিচালিত হয় ‘আল রশিদ স্কুল’, যেখানে পাঁচ বছর বা তার বেশি বয়সী শিশুদের আরবি ভাষা, ইসলামিক স্টাডিজ এবং পবিত্র কোরআনের শিক্ষা দেওয়া হয়। হামলার সময় মসজিদ এবং স্কুলটিতে দৈনন্দিন কার্যক্রম ও ক্লাস চলছিল। তবে এই ভয়াবহ হামলায় ভাগ্যক্রমে স্কুলের কোনো শিশুর ক্ষতি হয়নি। স্যান ডিয়েগোর পুলিশ প্রধান স্কট ওয়াল এক আবেগঘন সংবাদ সম্মেলনে নিশ্চিত করেছেন যে, স্কুলের ভেতরে থাকা সব শিশু নিরাপদে আছে এবং তাদের অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে অভিভাবকদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। শিশুদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার সময়কার দৃশ্য ছিল অত্যন্ত হৃদয়বিদারক; পুলিশি পাহারায় আতঙ্কিত শিশুরা একে অপরের হাত ধরে যখন মসজিদ চত্বর থেকে বেরিয়ে আসছিল, তখন সেখানে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
এই হামলার পেছনের ঘটনাপ্রবাহ এবং পুলিশি তৎপরতার যে বিবরণ পাওয়া গেছে, তা রীতিমতো শিহরণ জাগানিয়া। পুলিশ প্রধান স্কট ওয়াল জানান, এই রক্তপাতের সূত্রপাত ঘটেছিল হামলার কয়েক ঘণ্টা আগেই। সোমবার সকাল আনুমানিক ৯টা ৪০ মিনিটের দিকে হামলাকারী এক কিশোরের মা আতঙ্কিত অবস্থায় পুলিশকে ফোন করে জানান যে, তার ছেলে নিখোঁজ এবং সে আত্মহত্যার প্রবণতায় ভুগছে। পুলিশ প্রাথমিকভাবে এটিকে একটি সাধারণ নিখোঁজ ডায়েরি হিসেবে নিলেও পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। ওই মা কিছুক্ষণ পর পুলিশকে পুনরায় ফোন করে জানান যে, তার বাড়ি থেকে বেশ কয়েকটি আগ্নেয়াস্ত্র এবং তার ব্যক্তিগত গাড়িটিও গায়েব হয়ে গেছে। এর চেয়েও ভয়ংকর তথ্য ছিল যে, তার ছেলে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় সামরিক বাহিনীর মতো ‘ক্যামোফ্লেজ’ বা ছদ্মবেশী পোশাক পরেছিল এবং তার সাথে আরেকজন পরিচিত সঙ্গী ছিল। এই তথ্য পাওয়ার পর পুলিশ বুঝতে পারে যে, এটি কোনো সাধারণ আত্মহত্যার ঘটনা নয়, বরং বড় ধরনের কোনো নাশকতার প্রস্তুতি চলছে। পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে স্বয়ংক্রিয় লাইসেন্স প্লেট রিডার এবং অন্যান্য প্রযুক্তির সাহায্যে ওই কিশোরদের বহনকারী গাড়িটি ট্র্যাক করার চেষ্টা শুরু করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, পুলিশ তাদের অবস্থান পুরোপুরি শনাক্ত করার আগেই স্যান ডিয়েগোর সবচেয়ে বড় ওই মসজিদে গুলির শব্দ বেজে ওঠে।
মসজিদের সামনের এই রক্তপাতে সবচেয়ে উজ্জ্বল এবং আত্মত্যাগের যে দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে, তা হলো সেখানকার দায়িত্বরত নিরাপত্তাকর্মীর অসীম সাহসিকতা। পুলিশ প্রধান স্কট ওয়াল ওই নিরাপত্তাকর্মীর সাহসিকতার কথা স্মরণ করে বলেন, “এটা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, তার পদক্ষেপ ছিল বীরত্বপূর্ণ। তিনি নিশ্চিতভাবেই আজ অনেকগুলো প্রাণ বাঁচিয়েছেন।” হামলাকারীরা যখন মসজিদে প্রবেশ করে বড় ধরনের হত্যাযজ্ঞ চালানোর উদ্দেশ্যে এগিয়ে আসছিল, তখন ওই নিরাপত্তাকর্মী এবং অন্যান্য কর্মীরা নিজেদের জীবনের মায়া ত্যাগ করে তাদের বাধা দেন। তাদের এই সাহসী প্রতিরোধের কারণেই হামলাকারীরা মসজিদের মূল ভবনে বা শিশুদের স্কুলে প্রবেশ করতে পারেনি, যার ফলে অনেক বড় একটি ট্র্যাজেডি থেকে রক্ষা পেয়েছে স্যান ডিয়েগোর মুসলিম সম্প্রদায়।
হামলার পর বন্দুকধারী দুই কিশোর গাড়ি নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। মসজিদ থেকে আনুমানিক আধা মাইল দূরে তারা এক মালিকে (ল্যান্ডস্কেপার) লক্ষ্য করেও গুলি ছোঁড়ে, তবে সৌভাগ্যবশত ওই মালিকে গায়ে গুলি লাগেনি। এর কিছুক্ষণ পর পুলিশ একটু দূরের একটি রাস্তায় রাস্তার মাঝখানে দাঁড়ানো অবস্থায় একটি গাড়ি দেখতে পায় এবং সেই গাড়ির ভেতর থেকে ১৭ ও ১৮ বছর বয়সী ওই দুই কিশোরের গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধার করে। পুলিশের ধারণা, পুলিশের তাড়া খেয়ে এবং পালানোর আর কোনো উপায় না দেখে তারা নিজেদের বন্দুকের গুলিতেই আত্মহত্যা করেছে। তাদের মধ্যে একজন স্থানীয় ম্যাডিসন হাইস্কুলের ছাত্র ছিল বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে, যা মসজিদ থেকে মাত্র এক মাইল দূরে অবস্থিত।
এই হামলার পেছনের উদ্দেশ্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে মার্কিন তদন্তকারী সংস্থা এফবিআই এবং স্থানীয় পুলিশ এমন কিছু আলামত পেয়েছে, যা এটিকে স্পষ্টভাবে একটি ‘হেইট ক্রাইম’ বা বিদ্বেষপ্রসূত অপরাধ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস এবং অন্যান্য মার্কিন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, হামলাকারীদের ব্যবহৃত গাড়ির ভেতর থেকে ইসলামবিরোধী ও মুসলিমবিদ্বেষী বিভিন্ন লেখা উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া নিখোঁজ হওয়ার আগে ওই কিশোর নিজ বাড়িতে যে সুইসাইড নোট বা আত্মহত্যার চিরকুট রেখে গিয়েছিল, তাতে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদ, বর্ণবাদী অহংকার এবং চরম বিদ্বেষমূলক বক্তব্য (হেইট রেটরিক) লেখা ছিল। যদিও ইসলামিক সেন্টারের বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট হুমকির তথ্য আগে থেকে পুলিশের কাছে ছিল না, কিন্তু হামলাকারীদের এই সুপরিকল্পিত প্রস্তুতি এবং ইসলামবিদ্বেষী মানসিকতা প্রমাণ করে যে, তারা স্যান ডিয়েগোর মুসলিম সম্প্রদায়কে আর্থিকভাবে, মানসিকভাবে এবং সামাজিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার জন্যই এই হামলা চালিয়েছিল।
স্যান ডিয়েগোর এই ইসলামিক সেন্টারের ইমাম তাহা হাসান এই ঘটনায় গভীর শোক ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি রয়টার্সসহ অন্যান্য গণমাধ্যমকে বলেন, “আমরা এর আগে আমাদের শহরে কখনো এ ধরনের মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়ে যাইনি। একটি পবিত্র উপাসনালয়কে এভাবে লক্ষ্যবস্তু করা অত্যন্ত জঘন্য এবং ক্ষমার অযোগ্য একটি কাজ। আমাদের এই সুন্দর শহরের প্রতিটি উপাসনালয়, তা যে ধর্মেরই হোক না কেন, সর্বদা সুরক্ষিত থাকা উচিত।” তিনি আরও জানান, এই সেন্টারটি সবসময় আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি ও সমাজ গঠনের ওপর জোর দিয়ে এসেছে। এমনকি হামলার দিন সকালেও অমুসলিমদের একটি দল ইসলাম সম্পর্কে জানার জন্য মসজিদটি পরিদর্শন করে গিয়েছিল। এমন একটি সম্প্রীতির জায়গায় এই ধরনের রক্তপাত পুরো কমিউনিটিকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার শীর্ষ রাজনৈতিক নেতারাও এই ন্যাক্কারজনক হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউজম এক বিবৃতিতে বলেছেন, “যেখানেই হোক না কেন, উপাসকদের তাদের জীবনের ভয়ে উপাসনালয়ে যেতে হবে, এটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। ক্যালিফোর্নিয়ায় বিদ্বেষের কোনো স্থান নেই, এবং আমরা বিশ্বাসের সম্প্রদায়গুলোর বিরুদ্ধে সন্ত্রাস বা ভয় দেখানোর কোনো কাজ বরদাস্ত করব না।” ক্যালিফোর্নিয়ার সিনেটর অ্যাডাম শিফ এই হামলাকে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর একটি ‘ভয়াবহ আক্রমণ’ বলে অভিহিত করেছেন এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকারকে সমুন্নত রাখার ওপর জোর দিয়েছেন।
এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের এবং গভীরভাবে প্রোথিত দুটি বড় সংকটকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে—একদিকে লাগামহীন বন্দুক সহিংসতা, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান ইসলামোফোবিয়া বা ইসলামভীতি। যুক্তরাষ্ট্রে প্রায়ই দেখা যায়, কিশোর বা তরুণরা তাদের বাবা-মায়ের বৈধভাবে কেনা অস্ত্র ব্যবহার করে স্কুল, শপিং মল বা উপাসনালয়ে নির্বিচারে গুলি চালাচ্ছে। এক্ষেত্রেও হামলাকারী তার মায়ের সংরক্ষিত অস্ত্র ব্যবহার করেছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইনের মারাত্মক দুর্বলতা এবং পারিবারিক পর্যায়ে অস্ত্র সংরক্ষণের ঝুঁকির দিকেই আঙুল তোলে। অন্যদিকে, পশ্চিমা বিশ্বে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর যে বিষবাষ্প, এটি তারই একটি চরম বহিঃপ্রকাশ। এর আগে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে বা কানাডার কুইবেক সিটির মসজিদে যেভাবে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা হামলা চালিয়েছিল, স্যান ডিয়েগোর এই ঘটনা যেন সেই একই ঘৃণার ধারাবাহিকতা।
আর মাত্র কয়েকদিন পরেই সারা বিশ্বের মুসলিমরা ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ উদযাপন করবেন। উৎসবের এই আনন্দঘন প্রস্তুতির মাঝেই এমন একটি বিভীষিকাময় ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিমদের মনে এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। ঈদের জামাতে বা মসজিদে নামাজ পড়তে যাওয়াটা এখন তাদের কাছে একটি আতঙ্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই মুহূর্তে স্যান ডিয়েগোসহ পুরো যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম সম্প্রদায় তাদের নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন। এফবিআই এবং স্থানীয় পুলিশ এই ঘটনার পেছনের পুরো সত্য উদঘাটনে তাদের তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু যে তিনটি অমূল্য প্রাণ ঝরে গেল এবং শিশুদের মনে যে ভীতির সঞ্চার হলো, তা কোনো তদন্ত বা আইনি বিচারেই হয়তো আর মুছে ফেলা সম্ভব হবে না। বিদ্বেষের এই আগুন নেভাতে হলে শুধু অস্ত্র নিয়ন্ত্রণই নয়, বরং মনোজাগতিক পরিবর্তন এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে সহনশীলতার চর্চা নিশ্চিত করা এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তথ্যসূত্র: ডেইলি স্টার।