• বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ১১:৪৬ পূর্বাহ্ন
Headline
ডলারের ঝুঁকি ও বিনিয়োগ মন্দায় অনীহা উদ্যোক্তাদের: দেশীয় উৎসের পর এবার বিদেশি ঋণেও স্থবিরতা মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি: বাংলাদেশের সুযোগ না ঝুঁকি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের আর্থিক দায়: বাজেট ছাপিয়ে লাগামহীন ভর্তুকির চাপ ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রেসে হরিলুট: কোরআন ছাপার নামে কোটি কোটি টাকা লোপাট প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতায় বাড়ছে অপরাধের বিস্তার: ক্যাম্পের নিচে গোপন সুড়ঙ্গ ও সশস্ত্র সাম্রাজ্য কাশির সঙ্গে রক্ত, কখন এটি বিপদের সংকেত? নেপালে ভয়াবহ পাহাড়ি ঢলে নিহত দেড় শতাধিক চোট কাটিয়ে লর্ডস টেস্টে ফিরছেন বাবর আজম জাতীয় কবি কাজী নজরুলের মৃত্যুবার্ষিকী আজ নেপালের প্রাণঘাতী আকস্মিক বন্যার কারণ কী?

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের আর্থিক দায়: বাজেট ছাপিয়ে লাগামহীন ভর্তুকির চাপ

Reporter Name / ১ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬

আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণের শ্লথগতির কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে লাগামহীনভাবে বেড়ে চলেছে ভর্তুকির চাপ। এর সরাসরি অভিঘাতে জাতীয় বাজেট ব্যবস্থাপনা এক চরম জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মুখে পড়েছে। গত কয়েক বছর ধরে জ্বালানি তেল বিক্রি করে মুনাফায় থাকায় এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ফর্মুলা অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয়ের কারণে চলতি অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে তেল খাতে আলাদা কোনো ভর্তুকি বরাদ্দ রাখা হয়নি। তবে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা ও স্থানীয় পর্যায়ে ক্রয়মূল্যের চেয়ে কম দামে তেল বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় গত এপ্রিল ও মে এই দুই মাসের লোকসান মেটাতেই সরকারের কাছে সাত হাজার ৬১০ কোটি টাকা বিশেষ ভর্তুকি দাবি করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। অন্যদিকে চলতি বাজেটে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানির জন্য যে ছয় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল, গত অর্থবছরের জুনের বকেয়াসহ চলতি অর্থবছরের মাত্র দেড় মাসেই সেই সম্পূর্ণ বরাদ্দ ফুরিয়ে গেছে। একই সাথে বিদ্যুৎ খাতেও মাসিক ভর্তুকির প্রয়োজন বেড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ায় সার্বিক বাজেট বাস্তবায়নে টানাপোড়েন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়ে জানিয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সংঘাত ও জ্বালানি পরিবহনের কৌশলগত সামুদ্রিক রুটে তৈরি হওয়া ঝুঁকির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম এখনও অত্যন্ত অস্থিতিশীল। আমদানিকৃত তেলের এই চড়া দামের সম্পূর্ণ বোঝা দেশের ভোক্তা পর্যায়ে চাপিয়ে না দিয়ে সরকার ভর্তুকির মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। বিপিসির হিসাব পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত এপ্রিলের প্রথম ১৮ দিনে সংস্থাটির দৈনিক গড় লোকসান ছিল প্রায় ৭৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা এবং পরবর্তী দিনগুলোতে তা গড়ে ৫৬ কোটি ৪২ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। এপ্রিলে পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল মিলিয়ে মোট লোকসান হয়েছে দুই হাজার ২৭০ কোটি টাকা। আর মে মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম আরও বেড়ে যাওয়ায় কেবল ডিজেল বিক্রি করতেই বিপিসির প্রতিদিন গড়ে ১৬৪ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে, যার ফলে মে মাসে একক মাসেই মোট লোকসানের অঙ্ক দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার ৩৪০ কোটি টাকায়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এখন বিপিসির এই বিপুল অঙ্কের ঘাটতি কোন খাতের বাজেট থেকে সমন্বয় করবেন, তা নিয়ে দফায় দফায় পর্যালোচনা বৈঠক করছেন।
গ্যাসের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ভয়াবহ আর্থিক চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে পর্যাপ্ত এলএনজি না পাওয়ার কারণে সরকারকে বিশ্ব স্পট মার্কেট বা খোলাবাজার থেকে অতি উচ্চমূল্যে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে এলএনজির জন্য ছয় হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ থাকলেও গত ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়েই ব্যয় হয়ে গেছে প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ অর্থবছর শুরুর মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানেই মূল বরাদ্দের চেয়ে এক হাজার কোটি টাকা বেশি খরচ হয়ে গেছে। এর আগের অর্থবছরেও মূল বরাদ্দ ছিল ছয় হাজার কোটি টাকা, কিন্তু বছর শেষে প্রকৃত ব্যয়ের অঙ্ক দাঁড়িয়েছিল প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকায়। কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্য সংকট অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছরে এলএনজির ভর্তুকি ব্যয় অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে।
বিদ্যুৎ খাতের চিত্রটি আরও বেশি উদ্বেগজনক। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর বকেয়া বিল এবং জ্বালানির উচ্চ মূল্যের কারণে বিদ্যুৎ খাতে গত জুন ও জুলাই এই দুই মাসেই সরকারের পক্ষ থেকে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বাবদ ছাড় করতে হয়েছে। গত অর্থবছরে বকেয়াসহ বিদ্যুৎ খাতের সার্বিক ভর্তুকি ব্যয় ছিল প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে এই খাতে ৩৭ হাজার কোটি টাকা রাখা হলেও বর্তমানে যেভাবে প্রতি মাসে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি ভর্তুকি লাগছে, তাতে বছর শেষে বিদ্যুৎ খাতের একক ভর্তুকিই ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করেছেন। বর্তমান সীমিত রাজস্ব আয়ের বাস্তবতায় এত বিপুল আর্থিক দায় মেটাতে সরকারকে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে উচ্চ সুদে ব্যাংক ঋণ গ্রহণের দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে।
অর্থনীতি ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে জাতীয় অর্থনীতির জন্য এক বড় ধরনের কাঠামোগত ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন। সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদের মতে, বিদ্যুৎ ও গ্যাস অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হওয়ায় এর সরবরাহ কোনোভাবেই বন্ধ রাখা যাবে না, তবে রাজস্ব আহরণের বর্তমান পরিস্থিতিতে এই বাড়তি ভর্তুকি সামাল দিতে হলে অন্যান্য অনুৎপাদনশীল খাতে কঠোরভাবে ব্যয় সংকোচন করে বাজেট বরাদ্দ পুনর্বিন্যাস করতে হবে। তিনি আরও জোর দেন যে, দীর্ঘমেয়াদে এই আমদানিনির্ভরতার পঙ্গুত্ব দূর করতে বাপেক্সের সক্ষমতা বৃদ্ধি করে দেশীয় স্থলভাগ এবং বঙ্গোপসাগরের অবহেলিত সমুদ্রব্লকগুলোতে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
অন্যদিকে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম মনে করেন, সরকারের আর্থিক সীমাবদ্ধতার মুখে শুধু ভর্তুকির অর্থ খোঁজার চেয়ে বরং খাতের ভেতরের অপচয়, দুর্নীতি ও লুটপাট বন্ধ করে খরচ কমানোর প্রাতিষ্ঠানিক কৌশল গ্রহণ করা জরুরি। তিনি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে বাণিজ্যিক মুনাফার মানসিকতা থেকে বের করে সেবামুখী করার আহ্বান জানান। একই সাথে বিগত দিনগুলোতে বিশেষ দায়মুক্তি ও অস্বচ্ছ চুক্তির মাধ্যমে যারা এই খাতকে আমদানিনির্ভর ও লুটেরা কাঠামোর মুখে ঠেলে দিয়েছে, সেইসব জ্বালানি অপরাধীদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনা এবং সর্বত্র স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই এই গভীর সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব।

 

তথ্যসূত্র: সমকাল


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category