উৎসব, অনুষ্ঠান বা ছুটির দিনে বাঙালির অন্যতম পছন্দের খাবার বিরিয়ানি বা পোলাও। কিন্তু প্রিয় এই খাবারটির স্বাদ ও সুবাস বাড়াতে গিয়ে যে ভয়াবহ বিষ মেশানো হচ্ছে, তা হয়তো ভোক্তাদের কল্পনারও অতীত। সম্প্রতি বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (BFSA) পরিচালিত এক অভিযানে বেরিয়ে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য—খাবারে সুগন্ধি হিসেবে যেসব ‘ক্যাওড়া জল’ বা ‘এসেন্স’ ব্যবহার করা হচ্ছে, তার অনেকগুলোতেই মেশানো হচ্ছে কিডনি ডায়ালাইসিসের কাজে ব্যবহৃত মারাত্মক ক্ষতিকর কেমিক্যাল!
সরকারি সংস্থার এই অভিযানের ভয়াবহ চিত্র সামনে আসার পর, কনশাস কনজিউমার সোসাইটির (CCS) মতো ভোক্তা অধিকার সংস্থাগুলো সাধারণ মানুষের মাঝে জরুরি সতর্কবার্তা প্রচার করতে শুরু করেছে।
ডেমরায় কারখানায় অভিযান ও চাঞ্চল্যকর সত্য
সম্প্রতি নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট লাইলাতুল হোসেনের নেতৃত্বে ঢাকার ডেমরা থানাধীন বাঁশেরপুল (পাড়া ডগাইর) এলাকার ‘হাইকো কনজুমার প্রোডাক্টস’ নামক একটি কারখানায় মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। সরকারি এই অভিযানেই বিরিয়ানির সুগন্ধির আড়ালে চলা ভয়ংকর প্রতারণার চিত্রটি হাতেনাতে ধরা পড়ে।
অভিযানে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি কিডনি ডায়ালাইসিসে ব্যবহৃত ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করে ক্যাওড়া জল, গোলাপ জল এবং অন্যান্য ফ্লেভার পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করছে। এসব পণ্যের লেবেলে স্পস্টভাবে ‘বিরিয়ানিতে ব্যবহারযোগ্য’ কথাটি লেখা থাকলেও, এর সপক্ষে কোনো বৈজ্ঞানিক বা স্বাস্থ্যগত টেস্ট রিপোর্ট দেখাতে ব্যর্থ হয় কারখানা কর্তৃপক্ষ।
নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ
শুধু বিষাক্ত কেমিক্যালই নয়, কারখানাটির পরিবেশও ছিল চরম অস্বাস্থ্যকর ও অপরিচ্ছন্ন।
মেঝেতে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে বসে কর্মীদের আচার, চাটনি এবং ফ্লেভারের বোতল প্যাকেজিং করতে দেখা যায়।
কারখানায় কর্মরত কোনো কর্মীর হাতে গ্লাভস বা গায়ে অ্যাপ্রোনসহ ন্যূনতম কোনো স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী ছিল না।
অনুমোদনহীনভাবে এসব ক্ষতিকর উপাদান আমদানি করে অত্যন্ত নোংরা পরিবেশে বোতলজাত করে তা সাধারণ ভোক্তাদের রান্নার কাজে ব্যবহারের জন্য বাজারে ছাড়া হচ্ছিল।
কীভাবে চলছে এই ফাঁকি এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি?
অসাধু ব্যবসায়ীরা চিকিৎসা খাতে ব্যবহারের জন্য আনা ডায়ালাইসিসের কেমিক্যাল অধিক মুনাফার লোভে সুগন্ধি প্রস্তুতকারী কারখানাগুলোতে বিক্রি করছে। রেস্তোরাঁর বাবুর্চিরা না জেনেই রান্নার সময় প্রতি হাঁড়ি পোলাও বা বিরিয়ানিতে ২-৩ চামচ এই কেমিক্যাল মিশ্রিত তরল মেশাচ্ছেন। এর ফলে মানবদেহে যেসব মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে:
চিকিৎসা ও রাসায়নিক কাজে ব্যবহৃত এসব উপাদান খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করলে লিভার এবং কিডনির চরম ক্ষতি হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের রাসায়নিক উপাদান শরীরে ক্যানসারের কোষ তৈরি করতে পারে।
পেটের পীড়া, আলসার এবং স্নায়বিক নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে।
প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ
অভিযানের সময় কারখানাটি থেকে বিপুল পরিমাণ বিষাক্ত কেমিক্যাল জব্দ করেন ম্যাজিস্ট্রেট। জনস্বাস্থ্যের মারাত্মক ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদিত সকল ‘ক্যাওড়া জল’ বাজার থেকে তুলে নেওয়ার (রি-কল বা Re-call) কঠোর নির্দেশনা প্রদান করে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে আইনি ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়।
সিসিএস-এর প্রচার ও ভোক্তাদের প্রতি সতর্কতা
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের এই অভিযানের পর জনসচেতনতা বাড়াতে কাজ করছে কনশাস কনজিউমার সোসাইটি (CCS)। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভিডিও বার্তার মাধ্যমে ভোক্তাদের সতর্ক করে বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছে: ১. রেস্তোরাঁ বা বাইরের খাবার খাওয়ার ক্ষেত্রে খাবারের মান সম্পর্কে সচেতন হোন। ২. বাড়িতে রান্নার সময় বাজার থেকে কেনা যেকোনো ক্যাওড়া জল বা গোলাপ জল ব্যবহারের আগে তার মান, বিএসটিআই (BSTI) অনুমোদন এবং ব্র্যান্ডের নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করে নিন। ৩. নামহীন বা সন্দেহজনক কোনো ব্র্যান্ড এড়িয়ে চলুন এবং এমন কোনো পণ্য নজরে এলে দ্রুত জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর (DNCRP) বা নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের হটলাইনে অভিযোগ জানান।
সামান্য সুগন্ধের লোভে যেন নিজের এবং পরিবারের সুস্থতা হুমকির মুখে না পড়ে, সে বিষয়ে সবাইকে এখন থেকেই সর্বোচ্চ সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।