• শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০৩ পূর্বাহ্ন
Headline
উন্নয়নের মরীচিকা ও মেগা প্রকল্পের ফাঁদ: প্রতিশ্রুতির আড়ালে একই খাদের কিনারে অর্থনীতি মোংলা বন্দর ঘুরে দেখলেন প্রধানমন্ত্রী আমি শোকর করি, কারণ… রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আগুন, ৪০ রোগী আহত পিএইচপির ত্রুটি: ঝুঁকিতে লাখো ওয়েবসাইট, বিশ্বজুড়ে সাইবার সতর্কতা ধেয়ে আসছে সুপার টাইফুন, ঘণ্টায় গতিবেগ ২২৭ কিলোমিটার ৫৯২ কোটি টাকায় দুই কূপ খনন, জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে ‘বিপুল গ্যাস’ প্রধানমন্ত্রীর সফরে টোকিওতে থাকবেন না রাষ্ট্রদূত, সমন্বয়ে পররাষ্ট্রসচিব রূপগঞ্জে ট্রাকের ধাক্কায় অটোরিকশার দুই যাত্রী নিহত, আহত ৩ ৭ দল নিয়ে ‘সমমনা ইসলামী দল’ ঘোষণা, একসঙ্গে চলার অঙ্গীকার

বিষাক্ত আবর্জনা ও দূষণে মৃত্যুর মুখে ঢাকার লেকগুলো: চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে নগরবাসী

Reporter Name / ২২২ Time View
Update : শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২৬

আধুনিক নগর পরিকল্পনায় লেক বা জলাশয়গুলো পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং নাগরিকদের স্বস্তির আশ্রয় হিসেবে কাজ করে। কিন্তু রাজধানী ঢাকার চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। শহরের বড় ও পরিচিত লেকগুলো এখন আর সৌন্দর্যের আধার নয়; বরং বিষাক্ত আবর্জনা, দখল, বাণিজ্যিক আগ্রাসন এবং পয়ঃবর্জ্যের কারণে এগুলো পরিণত হয়েছে ময়লার ভাগাড়ে। লেকগুলোর এই করুণ দশা এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গুলশান-বনানী লেক: আভিজাত্যের আড়ালে বিষাক্ত ভাগাড়

রাজধানীর অন্যতম অভিজাত ও কূটনৈতিক এলাকা গুলশান, বনানী ও বারিধারা। ২০০১ সালে পরিবেশ অধিদপ্তর গুলশান-বনানী লেককে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ (ইসিএ) ঘোষণা করলেও গত আড়াই দশকে এর কোনো উন্নতি হয়নি।

  • দূষণের মাত্রা: ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) জরিপ অনুযায়ী, লেকের আশপাশের ৩ হাজার ৮৩০টি বাড়ির মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশ (২ হাজার ২৬৫টি) বাড়ির সুয়ারেজ লাইন সরাসরি লেকে দেওয়া হয়েছে। ফলে লেকের পানিতে কয়েক ইঞ্চি পুরু থিকথিকে ময়লার স্তর ও কালচে আস্তরণ তৈরি হয়েছে।

  • মাইক্রোপ্লাস্টিক ও রাসায়নিক দূষণ: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ধানমন্ডি লেকের প্রতি কেজি পলিতে ৩০ হাজারটি মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে, এবং গুলশান লেকের পানিতে এর উপস্থিতি আরও ভয়াবহ। এছাড়া স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, গুলশান লেকে টিডিএস, বিওডি এবং সিওডি-এর মাত্রা নির্ধারিত মান ছাড়িয়ে গেছে, যা জলজ বাস্তুতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। বিষাক্ত পানির কারণে প্রায়ই মাছ মরে ভেসে উঠছে।

ধানমন্ডি লেক: বাণিজ্যিক আগ্রাসন ও অব্যবস্থাপনার শিকার

সাড়ে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ ধানমন্ডি লেক একসময় প্রাতঃভ্রমণকারীদের কাছে জনপ্রিয় থাকলেও, গত এক দশকে মাত্রাতিরিক্ত বাণিজ্যিক কার্যক্রমে এটি তার শ্রী হারিয়েছে।

  • দখল ও দূষণ: রবীন্দ্র সরোবর এলাকায় ৪টি ফুচকার দোকানের অনুমোদন থাকলেও বর্তমানে ১০টির বেশি দোকান ফুটপাত ও লেকের জায়গা দখল করে আছে। এসব দোকান থেকে নির্বিচারে প্লাস্টিক ও পলিথিন লেকে ফেলা হচ্ছে। এছাড়া লেকটিতে নতুন করে আবাসিক ভবনের পয়ঃবর্জ্যের সংযোগও দেওয়া হয়েছে।

  • কর্তৃপক্ষের ভাষ্য: ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম জানান, ব্যবহারকারীদের অসচেতনতা এবং অতিরিক্ত বাণিজ্যিক কার্যক্রমের কারণে লেকটি নষ্ট হচ্ছে। ইজারার শর্ত ভঙ্গকারীদের বরাদ্দ বাতিলের হুঁশিয়ারি দেওয়ার পাশাপাশি লেক রক্ষায় একটি কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছেন তিনি।

হাতিরঝিল: কালো পানি আর জীবাণুর আধার

রাজধানীর আরেক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হাতিরঝিল এখন কালো পানি আর দুর্গন্ধের সমার্থক হয়ে উঠেছে। ২০২২ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক গবেষণায় দেখা যায়, সুয়ারেজের পানি সরাসরি মেশার কারণে হাতিরঝিলের পানিতে জীবাণুর ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি, যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। দুর্গন্ধে পথচারী ও ওয়াটার ট্যাক্সির যাত্রীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব

লেকগুলোর এই দূষণ বহুমুখী বিপর্যয়ের সৃষ্টি করছে:

  • স্বাস্থ্যঝুঁকি: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরীর মতে, লেকের দূষণ খুব সহজেই আমাদের খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে। রাস্তার হকাররা এই বিষাক্ত পানি ব্যবহার করায় মানুষ মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। মশা-মাছির প্রজনন বেড়ে মৃত্যুঝুঁকি তৈরি হচ্ছে এবং দুর্গন্ধ শ্বাসযন্ত্রকে দুর্বল করছে।

  • আবাসন খাতে ধস: একসময় ‘লেকভিউ’ বা জলাশয়ের পাশের অ্যাপার্টমেন্টের দাম ২০-৩০ শতাংশ বেশি হতো। কিন্তু ভ্যারিয়েডস বিল্ডার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মাহমুদুল হাসান জানান, দুর্গন্ধ ও মশার উপদ্রবের কারণে ক্রেতারা এখন আর লেকের পাশের বাসা কিনতে আগ্রহী হচ্ছেন না।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা ও কর্তৃপক্ষের দায়

কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার জানান, লেকগুলো এখন মশা-মাছি ও ব্যাকটেরিয়ার প্রজননস্থলে পরিণত হয়েছে। তবে সুয়ারেজ বর্জ্য ট্রিটমেন্ট করে ফেলা এবং লেকে গাপ্পি মাছ বা ব্যাঙ ছাড়ার মাধ্যমে এই বাস্তুতন্ত্র ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

সার্বিক বিষয়ে রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম জানান, ঢাকা ওয়াসা মাত্র ২০ শতাংশ পয়ঃবর্জ্য সংযোগ নির্মাণ করতে পেরেছে। দাশেরকান্দিতে ট্রিটমেন্ট প্লান্ট থাকলেও সেখানে প্রয়োজনীয় সংযোগ নেই। ফলে আশপাশের বাড়ির সুয়ারেজ বর্জ্য ঠেকানো যাচ্ছে না, যা ঢাকার লেকগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category