আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘকাল ধরে ওয়াশিংটনের যে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল, বর্তমান প্রেক্ষাপটে তাতে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। একটা সময় বিশ্ব অর্থনীতির সংকট কিংবা রাজনৈতিক অস্থিরতায় আমেরিকার সিদ্ধান্তই ছিল শেষ কথা। অনেকটা অভিভাবকের ভূমিকায় থাকা এই দেশটি এখন নিজের পুরনো মিত্রদের সঙ্গেই এক ধরনের দূরত্ব তৈরি করে ফেলেছে। বিশেষ করে বিগত কয়েক বছরে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির কারণে ন্যাটোর সদস্য দেশ থেকে শুরু করে ইউরোপীয় বন্ধুদের সাথেও ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এর ফলে দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত অংশীদারদের মধ্যে এক ধরনের সংশয় ও আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
আমেরিকার এই অভ্যন্তরীণমুখী অবস্থানের ফলে তৈরি হওয়া শূন্যস্থানটি অত্যন্ত সুকৌশলে পূরণ করছে চীন। কোনো ধরণের উচ্চবাচ্য ছাড়াই চীন বিশ্বজুড়ে নিজেদের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। আমেরিকা যখন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি ও সংস্থা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছিল, চীন তখন সেই জায়গাগুলোতে নিজেদের উপস্থিতি বাড়িয়েছে। এশিয়ার রেললাইন থেকে শুরু করে আফ্রিকার বন্দর কিংবা ইউরোপের বড় বিনিয়োগ—সবখানেই এখন বেইজিংয়ের ছায়া দীর্ঘ হচ্ছে। এই পরিবর্তনটি কেবল ক্ষমতার হাতবদল নয়, বরং বিশ্বস্ততার জায়গা পরিবর্তনের একটি বড় উদাহরণ হিসেবে সামনে আসছে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও ডলারের একক আধিপত্য এখন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত এই মুদ্রাটিকে এড়িয়ে অনেক দেশ এখন নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেনে আগ্রহী হয়ে উঠছে। বিশেষ করে রাশিয়া, ইরান ও চীনের মতো দেশগুলো বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে ইউয়ান বা স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার শুরু করেছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি আমেরিকার আর্থিক ক্ষমতার ভিতকে দুর্বল করে দিতে পারে। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যেও এখন নিজেদের সমস্যা নিজেরা সমাধানের প্রবণতা বাড়ছে, যেখানে একসময় ওয়াশিংটনই ছিল প্রধান মধ্যস্থতাকারী। এই স্বনির্ভরতা পরোক্ষভাবে আমেরিকার আঞ্চলিক প্রভাবকে সংকুচিত করছে।
তবে প্রযুক্তির উৎকর্ষ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সামরিক শক্তির দিক থেকে আমেরিকা এখনো বিশ্বের শীর্ষে অবস্থান করছে। তাদের অর্থনীতি ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা এখনো অপরাজেয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের সামনে এখন দুটি পথ খোলা আছে—হয় একলা চলার নীতিতে অটল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া, অথবা নতুন বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে মিত্রদের সাথে পুনরায় সুসম্পর্ক স্থাপন করা। বিশ্ব এখন আর একমুখী নেই, বরং এটি বহুমুখী ক্ষমতার কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। ২০২৬ সালের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে এটা স্পষ্ট যে, একক শাসনের বদলে এখন অংশীদারিত্ব এবং পারস্পরিক সহযোগিতাই হবে আগামীর বিশ্বরাজনীতির মূল চাবিকাঠি।