রাজনৈতিক নাটকীয়তা আর উত্তপ্ত বিতর্কের মধ্য দিয়ে শেষ হলো জাতীয় সংসদের বর্তমান অধিবেশন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ২০টি অধ্যাদেশ আজ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকারিতা হারিয়েছে। নির্ধারিত ৩০ দিনের মধ্যে সংসদে পাস না হওয়ায় গুম প্রতিরোধ, দুর্নীতি দমন কমিশন শক্তিশালীকরণ এবং পুলিশ কমিশন গঠনের মতো মৌলিক সংস্কারগুলো আইনি বৈধতা হারাল। এই ঘটনায় সরকারের বিরুদ্ধে ‘প্রতারণা’ ও ‘ঐকমত্য ভঙ্গের’ অভিযোগ এনে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট।
সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ বসার ৩০ দিনের মধ্যে অধ্যাদেশগুলো বিল আকারে পাস করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। গত ১২ মার্চ সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হওয়ার পর গতকাল শুক্রবার ছিল সেই নির্ধারিত সময়সীমার শেষ দিন। ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৮৭টি বিলের মাধ্যমে ১১৩টি অনুমোদিত হলেও বাকি ২০টি অধ্যাদেশ আলোর মুখ দেখেনি। এর মধ্যে ৭টি অধ্যাদেশ সরাসরি বাতিল করা হয়েছে এবং ১৩টি অধ্যাদেশ অনুমোদন না পাওয়ায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হয়েছে।
বাতিল হওয়া অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল:
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার সংক্রান্ত দুটি অধ্যাদেশ।
পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ ও দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত তিনটি অধ্যাদেশ।
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ও বিচারপতি নিয়োগ সংক্রান্ত অধ্যাদেশসমূহ।
গণভোট অধ্যাদেশ এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত নীতি।
অধিবেশনের শেষ পর্যায়ে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মারক জাদুঘর বিল’ এবং ‘তামাক নিয়ন্ত্রণ বিল’ পাসের সময় তর্কে জড়িয়ে পড়েন সরকারি ও বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা। বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, “যেসব অধ্যাদেশ অপরিবর্তিত রেখে পাসের বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল, সরকার সেখানে দিনের আলোয় চালাকি ও সরাসরি প্রতারণা করেছে।”
বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেন, “সরকার গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলো বাদ দিয়ে ফ্যাসিবাদের পুনর্জন্ম দিচ্ছে। আমাদের সাথে হওয়া সমঝোতার বরখেলাপ করা হয়েছে।” তিনি সরকারকে ইঙ্গিত করে ক্ষোভের সাথে বলেন, “তারা আমাদের শিশু ভেবেছে, কিন্তু এই দায় আমরা নেব না।”
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সংসদকে জানান, সরকার সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদন থেকে বিচ্যুত হয়নি। গুম ও মানবাধিকার কমিশনের মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলো আরও যাচাই-বাছাই করে শক্তিশালী বিল হিসেবে পুনরায় সংসদে আনা হবে বলেই সেগুলো এখন পাস করা হয়নি। তিনি দাবি করেন, নিয়ম অনুযায়ী যেগুলো উপস্থাপন করা হয়নি বা বিল হিসেবে আনা হয়নি, সেগুলো সাংবিধানিকভাবেই বাতিল হয়ে যায়।
তীব্র বাদানুবাদের এক পর্যায়ে সন্ধ্যা ৭টা ৩৭ মিনিটে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস এবং খেলাফত মজলিসের সংসদ সদস্যরা কক্ষ ত্যাগ করেন। সংসদ থেকে বেরিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, সরকার কৌশলে বিরোধী দলকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, “একটা শিশুকে প্লাস্টিকের কমলা দেখিয়ে যেমন ভোলানো হয়, সরকার আমাদের সাথে তেমনই আচরণ করছে।”
অধিবেশনের শেষ দিনে সংসদ অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ২৪টি বিল পাস করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মারক জাদুঘর বিল, শহীদ পরিবার ও আহত ছাত্র-নাগরিকদের পুনর্বাসন বিল, সাইবার নিরাপত্তা বিল এবং ১৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন সংক্রান্ত বিল। ৫ এপ্রিল থেকে গতকাল পর্যন্ত সংসদ সর্বমোট ৯১টি বিল পাস করেছে।