• সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬, ১২:২৩ পূর্বাহ্ন

বৈশ্বিক হালাল বাজারে বড় সম্ভাবনায় বাংলাদেশ

Reporter Name / ৩ Time View
Update : রবিবার, ৫ জুলাই, ২০২৬

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া সফর এবং দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে ফলপ্রসূ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর দুই দেশের পক্ষ থেকে যে যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে, সেখানে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উঠে এসেছে ‘হালাল শিল্প’ বা হালাল খাতের বিষয়টি। বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত ইসলামি অর্থনীতির বিশাল বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে যৌথভাবে কাজে লাগাতে এবং বিশেষ করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ হালাল খাতের কাঠামোগত উন্নয়নে মালয়েশিয়ার দীর্ঘদিনের সফল অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে দুই দেশের শীর্ষ নেতাই গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এর আগে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের মালয়েশিয়া সফরের পর্বেও এই হালাল খাতের বাণিজ্যিক বিকাশের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আলোচনা করা হয়েছিল। মালয়েশিয়ার স্থানীয় একটি সংবাদ মাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ড. মুহাম্মদ ইউনূস তখন স্পষ্ট করেই বলেছিলেন যে, দুই দেশের বিদ্যমান প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পদকে যদি সঠিকভাবে এক ছাতার নিচে আনা যায়, তবে হালাল খাতই হবে ঢাকা ও পুত্রজায়ার পারস্পরিক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব ও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধির সবচেয়ে স্বাভাবিক এবং শক্তিশালী ক্ষেত্র।

শীর্ষ পর্যায়ের এই রাজনৈতিক আলোচনার পর সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহল তৈরি হয়েছে যে, আসলে হালাল শিল্প বিষয়টি কী এবং বিশ্ববাজারে এর পরিধি কতটুকু। মূলত, হালাল শিল্প বলতে কেবল ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে খাদ্যের পবিত্রতা বা হালাল খাবার উৎপাদন করাকেই বোঝায় না; এটি মূলত একটি অত্যন্ত বড় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ধারণা এবং এটি একটি সম্পূর্ণ সমন্বিত আধুনিক ইকো-সিস্টেম। মালয়েশিয়ার তৈরি করা হালাল শিল্পসংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট মাস্টার প্ল্যানের আনুষ্ঠানিক সংজ্ঞা অনুযায়ী, হালাল ইকো-সিস্টেম হলো এমন একটি সমন্বিত প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক, যেখানে হালাল পণ্য ও সেবার উৎপাদন, কাঁচামাল উন্নয়ন, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং বাজারজাতকরণের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি উপাদান একে অপরের সাথে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত থাকে। এই ব্যবস্থার প্রতিটি অংশের নিজস্ব আলাদা কার্যক্রম থাকলেও তারা পারস্পরিকভাবে এমনভাবে সম্পর্কযুক্ত, যার ফলে একটি সম্পূর্ণ টেকসই, নিরাপদ এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। অর্থাৎ, কাঁচামাল সংগ্রহ ও উৎপাদন থেকে শুরু করে একদম শেষ পর্যায়ে ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে ইসলামিক শরিয়াহর হালাল পদ্ধতি বা অনুমোদিত উপকরণ ব্যবহার করে যেসব ভারী ও মাঝারি শিল্প গড়ে ওঠে, সেগুলোকে সামগ্রিকভাবে হালাল শিল্প বলা হয়।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষক এবং কুয়ালালামপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি (কমার্শিয়াল) প্রণব কুমার ঘোষের মতে, মালয়েশিয়া বর্তমানে হালাল শিল্পের বৈশ্বিক রোল মডেল হিসেবে কাজ করছে এবং এই উদীয়মান খাতে বাংলাদেশের ব্যাপক বাণিজ্যিক সম্ভাবনা রয়েছে। দুই দেশের নীতিনির্ধারকেরা যদি এই খাতের দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও বাণিজ্যিক সুযোগ-সুবিধাগুলোকে আরও কার্যকরভাবে সামনে এগিয়ে নিতে পারেন, তবে তা আগামীতে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির চেহারাই বদলে দিতে পারে এবং এটি একটি বড় ‘গেমচেঞ্জার’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। একই সুরে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিএমসিসিআই) সভাপতি মো. আনোয়ার শহীদও মনে করেন, হালাল শিল্প খাতে মালয়েশিয়া বর্তমানে বিশ্বের চ্যাম্পিয়ন দেশ। ফলে তাদের দীর্ঘ ৪০ বছরের কারিগরি অভিজ্ঞতা এবং সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক বাজারের প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল ‘হালাল অর্থনীতিতে’ বাংলাদেশ নিজের জন্য একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও স্থায়ী অবস্থান তৈরি করার সুবর্ণ সুযোগ লুফে নিতে পারে।

মালয়েশিয়ার দীর্ঘ ৪০ বছরের অভিজ্ঞতার দিকে তাকালে দেখা যায়, দেশটিতে হালাল পণ্যের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাহিদা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাওয়ায় মালয়েশিয়া বর্তমানে হালাল পণ্যের অন্যতম প্রধান নিট আমদানিকারক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। দেশটির সরকারের বর্তমান দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে মালয়েশিয়ার নিজস্ব হালাল মার্কেটের আকার বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ১১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা ২০১৮ সালের দিকেও ছিল মাত্র ৬৮ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। এর মধ্যে শুধুমাত্র ফুড অ্যান্ড বেভারেজ বা খাদ্য ও পানীয় খাতের বাজারই ২০৩০ সাল নাগাদ ৮৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই বিশাল খাদ্য খাতের বাইরে কসমেটিকস ও পার্সনাল কেয়ার এবং উন্নত ফার্মাসিউটিক্যালস বা ওষুধ উৎপাদন সেক্টরও মালয়েশিয়ার হালাল শিল্পে যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। সামগ্রিকভাবে মালয়েশিয়ার হালাল শিল্পে মোট ৯টি প্রধান খাতকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এগুলো হলো—ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, কসমেটিকস ও পার্সনাল কেয়ার, ইনগ্রিডিয়েন্টস বা পণ্যের উপাদান, ফার্মাসিউটিক্যালস, মডেস্ট ফ্যাশন বা শালীন পোশাক, মেডিকেল ট্যুরিজম ও ডিভাইসেস, মুসলিম ফ্রেন্ডলি হাসপাতাল বা চিকিৎসা ব্যবস্থা, শরিয়াহসম্মত লজিস্টিক সার্ভিস এবং সামগ্রিক ইসলামিক ফাইন্যান্স বা ব্যাংকিং খাত।

বিশ্বের এই বিশাল বাজার ধরার ক্ষেত্রে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সম্ভাবনা শতভাগ। কারণ বাংলাদেশের মানুষের ধর্মীয় সংস্কৃতির কারণে এখানকার সিংহভাগ কৃষি ও শিল্প পণ্য প্রাকৃতিকভাবেই হালাল উপায়ে তৈরি হয় এবং সে কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিল্প খাত হিসেবে হালাল শিল্পকে আন্তর্জাতিক মানে গড়ে তোলার সুযোগ এ দেশে অত্যন্ত ব্যাপক। বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিএমসিসিআই) সাম্প্রতিক দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধু মালয়েশিয়াতেই প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় দেড় হাজার কোটি মার্কিন ডলারের হালাল খাদ্যসামগ্রী আমদানি করা হয়, যা আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ পাঁচ হাজার কোটি ডলারের মাইলফলক ছাড়িয়ে যাবে। বাংলাদেশ যদি সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে যৌথভাবে যথাযথ ও আন্তর্জাতিক মানের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে, তবে শুধু মালয়েশিয়ার এই একটি খাতের বাজার থেকেই প্রতি বছর কয়েক বিলিয়ন ডলারের হালাল খাদ্য ও কৃষি পণ্য রপ্তানি করার বিশাল সুযোগ তৈরি হবে। এই বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে বাস্তব রূপ দিতে ইতিমধ্যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) মালয়েশিয়ার হালাল ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের (এইচডিসি) সাথে একযোগে কাজ শুরু করেছে।

তবে এই বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের সামনে বড় কিছু নীতিগত ও কারিগরি চ্যালেঞ্জ এখনো বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। দেশের ব্যবসায়ী ও বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ও সমস্যা হলো হালাল পণ্যের আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন বা মানসম্মত সনদ দেওয়া নিয়ে। দেশে ২০২৩ সালে ইসলামী শরিয়া মোতাবেক পণ্য উৎপাদন, আমদানি ও রপ্তানির সুবিধার্থে ‘হালাল সনদ নীতিমালা-২০২৩’ নামে একটি নতুন জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছিল, যেখানে বলা হয় পণ্যের হালাল স্বীকৃতির জন্য উৎপাদক প্রতিষ্ঠানকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কাছে আবেদন করে লোগো ও সনদ নিতে হবে। কিন্তু এর আগে ২০২১ সাল থেকেই দেশের প্রধান মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) হালাল সনদ দিয়ে আসছিল। ফলে বর্তমানে দেশের দুটি ভিন্ন সরকারি সংস্থা আলাদাভাবে হালাল সনদ দেওয়ার কাজ পরিচালনা করায় ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা ও দ্বৈততার তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বাংলাদেশ বর্তমানে বার্ষিক মাত্র ৮৫ কোটি ডলারের মতো হালাল পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করতে সক্ষম হচ্ছে, যার সিংহভাগই মূলত প্রাথমিক কৃষিভিত্তিক পণ্য। দুই সংস্থা মিলিয়ে এ পর্যন্ত দেশের প্রায় ২৮০টির মতো শিল্প প্রতিষ্ঠানকে হালাল সনদ দেওয়া সম্ভব হয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের হালাল সনদ বিভাগের উপ-পরিচালক ড. মাওলানা মো. আবু ছালেহ পাটোয়ারী এই সংকটের কথা স্বীকার করে জানিয়েছেন, হালাল খাতে বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারের সত্যিকার সুফল ঘরে তুলতে হলে সরকারকে আরও কিছু জরুরি ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। তিনি অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে জানান যে, আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের ল্যাবরেটরি ও টেস্টিং সুবিধার অভাবের কারণে বাংলাদেশ থেকে উৎপাদিত মাংস ও মাংসজাত সুস্বাদু খাদ্যসামগ্রী বর্তমানে মালদ্বীপ ছাড়া বিশ্বের অন্য কোনো উন্নত দেশে পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। এই আন্তর্জাতিক সনদ ও পরিকাঠামোগত সংকট দূর করতে দেশের অভ্যন্তরে একটি সুনির্দিষ্ট ‘হালাল অর্থনৈতিক জোন’ বা বিশেষায়িত শিল্প অঞ্চল গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। এর বাইরেও ব্যবসায়ীরা মনে করেন, মালয়েশিয়ায় শুধু হালাল খাবারের বাজারেই নয়, বরং বাংলাদেশের জন্য শরিয়াহসম্মত হালাল হোটেল, ভেষজ ও আধুনিক ওষুধের বাজার এবং মুসলিম ফ্রেন্ডলি পর্যটনেও বড় বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। এমনকি দুই দেশের শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও সমন্বিত ফান্ড গঠনের মাধ্যমে একযোগে কাজ করার বড় ক্ষেত্র তৈরি করা সম্ভব। এই সমস্ত নীতিগত ও কারিগরি সমস্যাগুলো দ্রুত চিহ্নিত করে সরকারের কাছে সমাধানের সুনির্দিষ্ট সুপারিশমালা তুলে ধরতে বিএমসিসিআই আগামী মার্চ মাসেই একটি বড় ধরনের জাতীয় হালাল সম্মেলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা দেশের সামগ্রিক হালাল শিল্পকে সঠিক ও আন্তর্জাতিক ট্র্যাকে ফেরাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা ও যুগান্তর


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category