১৯৩০ সালের দিকে কেমব্রিজে পরমাণু বিজ্ঞানের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে আবির্ভূত হন হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা। নীলস বোরের অত্যন্ত প্রিয় ছাত্র এবং আইনস্টাইন ও ওপেনহাইমারের মতো কিংবদন্তিদের সুপরিচিত এই বিজ্ঞানী ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে এক যুগান্তকারী পথ দেখান। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু যখন জ্বালানি নিয়ে শঙ্কিত, তখন ভাবা জানতেন ভারতের মাটিতে পরমাণু জ্বালানি ইউরেনিয়াম-২৩৫ এর ঘাটতি রয়েছে। কিন্তু তিনি এ-ও জানতেন যে, ভারতের ওড়িশা ও দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলের সমুদ্র সৈকতে ছড়িয়ে আছে বিশ্বের বৃহত্তম থোরিয়াম ভাণ্ডার। মোনাজাইট নামক খনিজ বালুতে থাকা এই থোরিয়ামকে কাজে লাগিয়েই ভারতকে জ্বালানিতে স্বনির্ভর করার এক মহাপরিকল্পনা সাজান তিনি।
মজার বিষয় হলো, ভারতের ওড়িশা ও কেরালা উপকূলের মতো বাংলাদেশের কক্সবাজার এবং কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতেও প্রচুর পরিমাণে মোনাজাইট বালু বা থোরিয়ামের উৎস রয়েছে। কিন্তু এই থোরিয়ামকে সরাসরি জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায় না, একে রূপান্তর করতে হয়।
ভারতের তিন ধাপের মহাপরিকল্পনা ও ঐতিহাসিক সাফল্য
ভাবার সেই মহাপরিকল্পনাটি ছিল তিনটি ধাপে বিভক্ত। প্রথম ধাপে ইউরেনিয়াম থেকে প্লুটোনিয়াম তৈরি করা; দ্বিতীয় ধাপে প্লুটোনিয়াম দিয়ে থোরিয়ামকে ইউরেনিয়াম-২৩৩ এ রূপান্তর করা এবং তৃতীয় ধাপে সেই ইউরেনিয়াম-২৩৩ দিয়ে সরাসরি থোরিয়াম পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা।
দীর্ঘ কয়েক দশকের নিরলস গবেষণার পর ভারত সম্প্রতি তাদের দ্বিতীয় ধাপটি সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। গত ৬ এপ্রিল তামিলনাড়ুর কালপাক্কামে অবস্থিত ‘প্রোটোটাইপ ফাস্ট ব্রিডার রিঅ্যাক্টর (PFBR)’ এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করে। পৃথিবীর ইতিহাসে বাণিজ্যিক পর্যায়ে প্রথমবারের মতো ভারত সফলভাবে রিঅ্যাক্টরের ভেতর প্লুটোনিয়ামকে ইউরেনিয়াম-২৩৩ তে রূপান্তর করে ফেলেছে। বর্তমানে এই কেন্দ্র থেকে প্রায় ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ভারতের জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে।
এই সাফল্যের অর্থ হলো, আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে ভারত তাদের কাঙ্ক্ষিত তৃতীয় ধাপ শুরু করবে এবং ২০৪০ সাল নাগাদ বিদ্যুতের জন্য তেল, গ্যাস বা কয়লা আমদানির প্রয়োজনীয়তা হারাবে। মধ্যপ্রাচ্য, আমেরিকা কিংবা সোলার প্যানেলের জন্য চীনের ওপর নির্ভরতা থেকে ভারত চিরতরে মুক্তি পাবে। চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, ভারতের এই রেকর্ড ব্রেকিং অগ্রগতি অর্জনে খরচ হয়েছে মাত্র ১০-১৫ হাজার কোটি টাকা। কারণ তারা বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভর না করে নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণায় বিনিয়োগ করেছে এবং দেশীয় প্রযুক্তির বিকাশ ঘটিয়েছে।
রূপপুর প্রকল্প: বাংলাদেশের বিপুল ঋণ ও পরনির্ভরতা
অন্যদিকে, বাংলাদেশের চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমরা পাবনার রূপপুরে যে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করছি, তার প্রাথমিক খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। এটি দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্প, যার ৯০ শতাংশই আসছে রাশিয়ার দেওয়া ঋণ থেকে। ৪ শতাংশ সুদ, মুদ্রাস্ফীতি এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অস্বাভাবিক অবমূল্যায়নের হিসাব কষলে এই প্রকল্পের কার্যকর খরচ ২ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
রূপপুরে উৎপাদিত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম কম হওয়ার যে প্রচারণা চালানো হয়, তা অনেক ক্ষেত্রেই বিভ্রান্তিকর। কারণ, সেখানে মূল বিনিয়োগ, ঋণের বিপুল সুদ ও মুদ্রাস্ফীতির বিশাল অঙ্কটি আড়ালে থেকে যায়। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের খরচ ওঠার আগেই যেমন তার মেয়াদ শেষ হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে, রূপপুরের ক্ষেত্রেও আশঙ্কা রয়েছে যে এটি লাভজনক হওয়ার আগেই হয়তো এর ৬০ বছরের আয়ুষ্কাল ফুরিয়ে আসবে।
গবেষণায় অনীহা ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ
ভারত যেখানে মাত্র ১০-১৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদ ও মেধা কাজে লাগিয়ে শত শত বছরের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে, সেখানে আমরা বিপুল বৈদেশিক ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে মাত্র ৬০ বছরের জন্য বিদেশি প্রযুক্তির মুখাপেক্ষী হয়ে থাকছি। ভারতের মাটিতে যেমন ইউরেনিয়াম নেই, আমাদেরও নেই। কিন্তু ভারত তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রকৌশলী, পরমাণু বিজ্ঞানী এবং প্রযুক্তিবিদদের গড়ে তোলার পেছনে বিনিয়োগ করেছে। তারা নিজেদের সমুদ্রসৈকতের বালু থেকে ‘সোনা’ ফলাতে শিখেছে।
আমাদের কক্সবাজারের বালিতেও ঠিক একই সম্ভাবনা লুকিয়ে ছিল। কিন্তু আমরা নিজস্ব সক্ষমতা ও গবেষণায় বিনিয়োগ না করে বিদেশি ঋণে কেনা চকচকে মেগা প্রকল্পেই বেশি মজেছি। ভারত যখন ২০৪০ সালে জ্বালানিতে সম্পূর্ণ স্বাধীন এক পরাশক্তি হিসেবে ডানা মেলবে, আমরা হয়তো তখন রূপপুরের মতো প্রকল্পগুলোর বিপুল ঋণের কিস্তি শোধ করতেই হিমশিম খাব।
ভারতের এই সাফল্য কেবল বিজ্ঞানের জয় নয়; এটি মূলত দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা, বিনিয়োগ এবং জাতীয় দূরদর্শিতার এক চূড়ান্ত বিজয়।