• রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৩৮ অপরাহ্ন

ভোটের সমীকরণে ১১ দলীয় ঐক্যে টানাপোড়েন

Reporter Name / ১ Time View
Update : রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিরোধী রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে নতুন এক জটিল মেরূকরণের আভাস স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাঠ এবং পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মসূচিগুলোতে একসঙ্গে রাজপথে সক্রিয় থাকার পর তৃণমূলের ক্ষমতাকেন্দ্রে আসন বণ্টন ও অংশগ্রহণের রূপরেখা নির্ধারণ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের ভেতর গুরুতর মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। জামায়াতের নীতিনির্ধারকরা যেখানে কোনো কেন্দ্রীয় জোটগত সমঝোতা ছাড়া একক শক্তিতে স্থানীয় নির্বাচনে লড়তে অনড়, সেখানে শরিক দলগুলো জোরালো দাবি তুলছে সর্বাত্মক জোটবদ্ধ অংশীদারিত্বের। এই টানাপোড়েন শুধু সাধারণ প্রার্থী মনোনয়নের দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শরিক দলগুলোর নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং দীর্ঘমেয়াদি দরকষাকষির সক্ষমতা টিকিয়ে রাখার প্রশ্ন। দুই পক্ষের এই অনমনীয় অবস্থানের কারণে কোনো কার্যকর সমঝোতা তৈরি না হলে দীর্ঘদিনের এই রাজনৈতিক মঞ্চটি ভাঙনের মুখোমুখি হতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

ঐক্যের শরিক দলগুলোর মূল ক্ষোভের কারণ হলো রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার ঘাটতি। তাদের মতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোটবদ্ধভাবে অংশগ্রহণ এবং জুলাই সনদের দাবি আদায় ও গণভোটের রায় কার্যকর করার প্রতিটি রাজপথের আন্দোলনে দলগুলো জামায়াতের পাশে থেকে একযোগে সংগ্রাম চালিয়েছে। এমন ঘনিষ্ঠ যৌথ রাজনীতির পর তৃণমূলের এই ব্যাপক নির্বাচনে এসে হঠাৎ জোটকে উপেক্ষা করা হলে তা ঐক্যের গুরুত্বকে সাধারণ মানুষের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলবে। শরিকদের যুক্তি, যে সমস্ত সংসদীয় আসনে তারা এর আগে জাতীয় নির্বাচনে লড়েছিলেন, স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনেও সেখানে মিত্রদের অকুণ্ঠ সমর্থন পাওয়া অত্যন্ত আবশ্যক। তা না হলে তৃণমূলের রাজনীতিতে তাদের সাংগঠনিক বিস্তার মুখ থুবড়ে পড়বে এবং ভবিষ্যৎ জাতীয় রাজনীতিতেও তাদের অবস্থান দুর্বল হয়ে যাবে। শরিকদের অভিযোগ, ঐক্যবদ্ধ থাকার রাজনৈতিক ফসল জামায়াত একাই ঘরে তুলছে, অথচ স্থানীয় পর্যায়ের বিস্তৃত ক্ষমতার পরিমণ্ডলে ছোট মিত্রদের প্রাপ্য জায়গা ছেড়ে দিতে তারা চরম অনীহা দেখাচ্ছে।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর এককভাবে নির্বাচনে যাওয়ার কৌশলের পেছনে কাজ করছে এক গভীর সাংগঠনিক হিসাব-নিকাশ। দলটির উচ্চপর্যায়ের নেতাদের মতে, জাতীয় নির্বাচনের কাঠামো আর ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা, পৌরসভা কিংবা সিটি করপোরেশনের তৃণমূলের সমীকরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্থানীয় স্তরে হাজার হাজার পদে কেন্দ্র থেকে কোনো নির্দিষ্ট ফর্মুলার ভিত্তিতে আসন ভাগাভাগি করা প্রায় অসম্ভব একটি কাজ। এখানে প্রার্থীর ব্যক্তিগত পরিচিতি, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, এলাকার নিজস্ব গোষ্ঠীগত গতিপ্রকৃতি এবং সাংগঠনিক শক্তিই জয়ের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। ফলে কেন্দ্র থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো সমঝোতার পরিবর্তে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার ওপরই সিদ্ধান্ত ছেড়ে দেওয়া অধিকতর বাস্তবসম্মত। জামায়াতের নীতিনির্ধারকরা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, অতীতে যখন বিএনপির সঙ্গে তাদের আনুষ্ঠানিক জোট ছিল, তখনও স্থানীয় নির্বাচনে কেন্দ্র থেকে আসন বণ্টন করা হতো না; বরং স্থানীয় পর্যায়ে নেতারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সুবিধাজনক ছাড় দিতেন।

তাছাড়া নিজেদের দলীয় নেতাকর্মীদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অসন্তোষ সামাল দেওয়াও জামায়াতের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিগত ত্রয়োদশ সংসদীয় নির্বাচনে জোটের শরিকদের সন্তুষ্ট করতে গিয়ে দলটিকে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে নিজেদের অত্যন্ত সম্ভাবনাময় দলীয় নেতাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে হয়েছিল। এর ফলে দলের তৃণমূল পর্যায়ে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল এবং অন্তত তিনটি সংসদীয় আসনে স্থানীয় নেতারা কেন্দ্রের নির্দেশ অমান্য করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। এখন তৃণমূলের এই বিশাল নির্বাচনে যদি আবারও শরিকদের জন্য দলীয় প্রার্থীদের বসিয়ে দেওয়া হয়, তবে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের দীর্ঘদিনের ত্যাগ ও প্রস্তুতি অর্থহীন হয়ে পড়বে, যা দলীয় শৃঙ্খলার ওপর মারাত্মক আঘাত হানতে পারে। এর পাশাপাশি জামায়াত চাইছে স্থানীয় নির্বাচনের মাধ্যমে সারা দেশে দলটির একক জনসমর্থনের প্রকৃত ওজন ও সাংগঠনিক ভিত্তি স্বাধীনভাবে মেপে দেখতে, যা জোটভুক্ত থাকার কারণে এতদিন পরিষ্কারভাবে যাচাই করার কোনো সুযোগ ছিল না।

জামায়াত নেতৃত্বের এমন কঠোর ও একক অবস্থানের মুখে কওমি ধারার ইসলামিক দলগুলোর ভেতরেও বিকল্প রাজনৈতিক মেরূকরণের জোর তৎপরতা শুরু হয়েছে। জামায়াতের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং নিজস্ব অবস্থান সুসংহত করতে হেফাজতে ইসলামের মধ্যস্থতায় দেওবন্দি ধারার সাতটি রাজনৈতিক দল সম্প্রতি ‘সমমনা ইসলামী দলসমূহ’ নামে একটি সম্পূর্ণ নতুন প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। গত ২২ অক্টোবর হেফাজতের মহাসচিব সাজিদুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত শীর্ষ পর্যায়ের এক বৈঠকে এই নতুন উদ্যোগের চূড়ান্ত খসড়া গৃহীত হয়। সেখানে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ঐক্যের দুই শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির শীর্ষ নেতাদের সক্রিয় উপস্থিতি রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই প্ল্যাটফর্মে আরও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন। এই দলগুলো ইতোমধ্যেই একুশ সদস্যের একটি লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করেছে এবং ডিসেম্বরের শুরুতে তাদের আনুষ্ঠানিক কর্মপন্থা নির্ধারণের কথা রয়েছে।

ঐতিহাসিকভাবে জামায়াতের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মতাদর্শের সঙ্গে দেওবন্দি বা কওমি ঘরানার একটি দীর্ঘস্থায়ী তাত্ত্বিক দূরত্ব বিদ্যমান। সেই আদর্শিক বৈপরীত্যকে একপাশে সরিয়ে রেখে সংসদ নির্বাচনে তারা আসন সমঝোতা করেছিল ঠিকই, তবে স্থানীয় নির্বাচনের মোড়ে এসে সেই পুরোনো বিভেদ আবারও দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। নতুন এই সাতদলীয় প্ল্যাটফর্মের উদ্যোক্তারা যদিও এখনই জামায়াতের ১১ দলীয় ঐক্য পুরোপুরি ভেঙে বেরিয়ে আসার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেননি, তবে স্থানীয় নির্বাচনে যৌথ প্রার্থী দেওয়ার বিষয়ে তাদের আলোচনা অনেক দূর এগিয়ে গেছে। দলগুলোর একটি অংশ এমনকি কৌশলগত কারণে একই সঙ্গে দুটি ভিন্ন প্ল্যাটফর্মে নিজেদের উপস্থিতি বজায় রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তবে কওমি ধারার এই নতুন ঐক্যপ্রক্রিয়াকেও নিষ্কণ্টক বলা যাচ্ছে না, কারণ এর অন্তর্ভুক্ত জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ঐতিহাসিকভাবে বিএনপির সঙ্গে সমঝোতায় যুক্ত, আবার ইসলামী আন্দোলন সংসদ নির্বাচনে জামায়াত কিংবা অন্য কোনো পক্ষের সঙ্গেই আসন সমঝোতায় যায়নি। ফলে এই সাতটি দলের স্থানীয় নির্বাচনকেন্দ্রিক ঐক্য কতটা স্থায়ী ও ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়েও পর্যবেক্ষকদের মধ্যে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।

জামায়াত নেতারা অবশ্য কওমি ধারার এই হঠাৎ তৎপরতাকে অত্যন্ত সতর্ক ও কিছুটা সন্দেহের চোখে দেখছেন। দলটির কোনো কোনো অভ্যন্তরীণ মহলের ধারণা, স্থানীয় নির্বাচনে ইসলামপন্থি ধারার ভোটগুলোকে বিভক্ত করে একটি নির্দিষ্ট বৃহৎ রাজনৈতিক দলের সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যেই হয়তো এই বিকল্প মেরূকরণ উৎসাহিত করা হচ্ছে। যদিও এই সন্দেহের পেছনে কোনো প্রত্যক্ষ তথ্যপ্রমাণ এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি। এদিকে মাঠের রাজনীতিতে সমীকরণটি আরও জটিল করে তুলেছে তারুণ্যনির্ভর নতুন শক্তি জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির একক নির্বাচনের ঘোষণা। দলটি সারা দেশের শতাধিক স্থানীয় সরকার ইউনিটে নিজস্ব প্রার্থী দেওয়ার বিস্তৃত প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে তারা অত্যন্ত হেভিওয়েট প্রার্থী ঘোষণা করে সরাসরি জামায়াতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেছে। ঢাকা উত্তরে এনসিপির প্রার্থী আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিপরীতে জামায়াত লড়ছে মহানগর উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিনকে নিয়ে; আবার ঢাকা দক্ষিণে এনসিপির নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়িয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী সাবেক ডাকসু ভিপি আবু সাদিক কায়েম। এই ত্রিমুখী ও চতুর্মুখী লড়াইয়ের আবহ স্পষ্টতই বলে দিচ্ছে যে, কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক মেরূকরণ একক আধিপত্য বিস্তার করতে পারছে না।

এমন ঘোলাটে পরিস্থিতির ভেতর জামায়াতে ইসলামীর চূড়ান্ত পদক্ষেপ নির্ভর করছে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের অধীনে নির্বাচনী পরিবেশ কেমন দাঁড়ায় তার ওপর। দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব ঠাকুরগাঁও-১ আসনের আসন্ন উপনির্বাচনের প্রশাসনিক আচরণ ও ভোটগ্রহণের স্বচ্ছতাকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। যদি দেখা যায় যে তৃণমূলের নির্বাচনগুলো নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হচ্ছে, তবে জামায়াত তাদের একক প্রার্থী দেওয়ার কৌশল নিয়েই পুরোপুরি সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। কিন্তু যদি প্রশাসনিক প্রভাব বা ভোট কারচুপির আশঙ্কা প্রবল হয়ে ওঠে, তবে রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে বিরোধী শক্তির বৃহত্তর ঐক্যের দিকে তাদের পুনরায় ফিরে আসার বাধ্যবাধকতা তৈরি হতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে দলটি কেন্দ্রীয় কোনো অনমনীয় জোট ঘোষণা না করে কৌশলগত অবস্থান ধরে রেখেছে, যেখানে কেন্দ্র থেকে শরিকদের কোনো ঢালাও প্রতিশ্রুতি না দিয়ে স্থানীয় নেতাদের নিজস্ব বিবেচনায় বাস্তবসম্মত আসন সমঝোতা করার একটি খোলা পথ উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করে জামায়াত তাদের শরিকদের ধরে রাখতে পারবে, নাকি ভোটের মাঠের এই টানাপোড়েন দীর্ঘদিনের ১১ দলীয় ঐক্যে চূড়ান্ত ভাঙনের সূচনা করবে, তা দেখার জন্য সবাইকে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

তথ্যসূত্র: সমকাল


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category