• রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:০১ অপরাহ্ন
Headline
দুর্নীতি মামলায় আনিসুল হকসহ চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র গ্রহণ ইলিয়াস আলী গুমের মামলায় উইং কমান্ডার সাইফুর রহমান ট্রাইব্যুনালে রুমির হাতে ‘চড় খাওয়া’ সেই মাদ্রাসাশিক্ষকের জামিন নামঞ্জুর বিএনপি জাতির সঙ্গে ধাপ্পাবাজি করেছে: শফিকুর রহমান জামায়াতের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা ফুটপাত দখলমুক্ত করার পাশাপাশি পুর্নবাসন করা হবে: রাসিক প্রশাসক মেট্রোরেল স্টেশনগুলোতে আধুনিক নিরাপত্তা সরঞ্জাম স্থাপনের সিদ্ধান্ত জাপানের জেরা’র কাছ থেকে এলএনজি কেনার প্রস্তাব আলোচনা এবারের পূজায় কেউ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেনি : পূজা উদযাপন ফ্রন্ট অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব জোরদারে স্পেন ও যুক্তরাজ্য যাচ্ছেন শামা

শ্রমশক্তিতে এগিয়ে, আয়ে তলানিতে কৃষি

Reporter Name / ১ Time View
Update : রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬

যেকোনো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনৈতিক বিবর্তনের স্বাভাবিক সূত্র হলো, শিল্প ও সেবা খাতের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সনাতন কৃষিনির্ভর শ্রমশক্তি ক্রমান্বয়ে আধুনিক উৎপাদনশীল খাতে স্থানান্তরিত হবে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সামগ্রিক অর্থনৈতিক রূপান্তরের এই ধ্রুপদী চিত্রটি এক অদ্ভুত ও বিভ্রান্তিকর প্যারাডক্সে রূপ নিয়েছে। বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপটে প্রযুক্তিগত বিপ্লবের জোয়ার চললেও দেশের অর্থনীতিতে কৃষির ওপর শ্রমনির্ভরতা না কমে বরং আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। অথচ এই বিপুল মানবসম্পদ যুক্ত থাকার পরও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে কৃষি শ্রমিকের উৎপাদনশীলতায় বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় তলানিতে অবস্থান করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপের অতীত চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০১৭ সালে যেখানে মোট জনশক্তির ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ কৃষিকাজে নিয়োজিত ছিল, বর্তমানে তা লাফিয়ে পৌঁছেছে প্রায় ৪৫ শতাংশে। বর্তমানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৩ কোটি ৮ লাখ মানুষ নিজেদের জীবিকার জন্য কৃষিজীবনের ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার এই পর্বে মাঠে কাজ করা মানুষের সংখ্যা যেমন অভাবনীয় হারে স্ফীত হয়েছে, তেমনি তাদের ব্যক্তিগত উৎপাদনশীলতার সূচকটি নেমে গেছে আশঙ্কাজনক গভীর খাদে।

অর্থনীতির পরিভাষায় কৃষি শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বলতে মূলত নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে একজন কর্মীর শারীরিক ও প্রযুক্তিগত শ্রমের মাধ্যমে সৃষ্ট ফসলের প্রকৃত মূল্য সংযোজন কিংবা উৎপাদনের মোট আর্থিক মানকে বোঝানো হয়। বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত সাম্প্রতিক বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের এই কাঠামোগত দুর্বলতার এক করুণ চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশের বহুমুখী কৃষি ব্যবস্থা প্রধানত ফসল, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ এবং হর্টিকালচার—এই চারটি মূল স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, বাংলাদেশে এই ক্ষেত্রগুলোতে কর্মরত একজন কৃষি শ্রমিকের বার্ষিক উৎপাদনশীলতার আর্থিক মূল্য মাত্র ১ হাজার ২৩৬ দশমিক ২২ মার্কিন ডলার। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা বিনিময় হার ধরে হিসাব করলে স্থানীয় মুদ্রায় এই অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় বছরে প্রায় ১ লাখ ৫২ হাজার ৫৫ টাকা। এই হিসাবে দেশের পুরো কৃষি শ্রমশক্তি মিলে বছরে প্রায় ৫২ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের উৎপাদন পরিচালনা করছে, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে ১১ দশমিক ৪ শতাংশ অবদান রাখছে। তবে সামগ্রিক জিডিপিতে এই অংকটি আপাতদৃষ্টিতে উল্লেখযোগ্য মনে হলেও, নিয়োজিত শ্রমশক্তির বিশাল আকারের বিপরীতে মাথাপিছু আয়ের এই হিসাবটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে চরম হতাশাজনক।

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনামূলক চিত্রটি সামনে আনলে আমাদের কৃষি ব্যবস্থার এই দৈন্যদশা আরও বেশি প্রকট হয়ে ওঠে। কৃষি শ্রমিকের বার্ষিক উৎপাদনশীলতার দিক থেকে এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থান দখল করে আছে ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপ। আধুনিক প্রযুক্তি, উচ্চমূল্যের ফসল ও সুবিন্যস্ত কাঠামোর কল্যাণে মালদ্বীপে একজন কৃষি শ্রমিকের বার্ষিক উৎপাদনের আর্থিক মান ৮ হাজার ৬৭২ ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১০ লাখ ৬৬ হাজার ৬৫৬ টাকার সমতুল্য। এমনকি দুর্গম পাহাড়ি ভূগোলের দেশ নেপালও এই সূচকে বাংলাদেশের চেয়ে বহু দূর এগিয়ে রয়েছে; দেশটিতে একজন কর্মীর গড় বার্ষিক উৎপাদন ৫ হাজার ৩৯ ডলার বা প্রায় ৬ লাখ ১৯ হাজার ৭৯৭ টাকা। অর্থনৈতিক সংকটের ভেতর দিয়ে যাওয়া শ্রীলঙ্কায় একজন কৃষি শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা ৩ হাজার ৩৩৪ ডলার বা ৪ লাখ ১০ হাজার টাকা। অন্যদিকে আয়তনের দিক থেকে ছোট ও প্রতিকূল ভূপ্রকৃতির দেশ ভুটানেও কৃষি শ্রমিকের বার্ষিক অর্থমূল্য ১ হাজার ৯৯০ ডলার বা প্রায় ২ লাখ ৪৪ হাজার ৭৭০ টাকা। কেবল কয়েক দশকের অন্তহীন যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় বিপর্যস্ত আফগানিস্তানের শ্রমিকের বার্ষিক উৎপাদন বাংলাদেশের নিচে অবস্থান করছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, আফগানিস্তানে একজন কৃষি শ্রমিকের উৎপাদনের পরিমাণ ১ হাজার ১৫৩ ডলার বা ১ লাখ ৪১ হাজার ১৯ টাকা। অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ার কার্যকর ও স্থিতিশীল অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের কৃষি শ্রমিকের উৎপাদনশীলতাই সবচেয়ে দুর্বল।

পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বী ও ভৌগোলিক বাস্তবতায় কাছাকাছি থাকা প্রতিবেশী দুই বৃহৎ শক্তি ভারত ও পাকিস্তানের দিকে তাকালে এই ব্যবধানের কারণ আরও পরিষ্কার হয়। পাকিস্তানে মোট শ্রমশক্তির ৩৬ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ কৃষিতে কর্মরত, যা সংখ্যার বিচারে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল প্রায় ২ কোটি ৫৬ লাখ। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের একজন কৃষি শ্রমিকের বার্ষিক উৎপাদনশীলতা ৩ হাজার ১৮৬ ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় ৩ লাখ ৯১ হাজার ৮৭৮ টাকা। অর্থাৎ বাংলাদেশের একজন কৃষকের তুলনায় পাকিস্তানের একজন কর্মী আড়াই গুণেরও বেশি সম্পদ তৈরি করছেন, যার ফলে তাদের সামগ্রিক কৃষি উৎপাদনশীলতার আর্থিক মূল্য দাঁড়িয়েছে ৯৩ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলারে। অন্যদিকে ভারতের মোট জনশক্তির ৪১ দশমিক ৬ শতাংশ কৃষিতে সম্পৃক্ত, যা বাংলাদেশের মোট হারের কাছাকাছি। অথচ সেখানে একজন কৃষি শ্রমিকের বার্ষিক গড় উৎপাদন ২ হাজার ১৫৯ ডলার বা প্রায় ২ লাখ ৬৫ হাজার ৫৫৭ টাকা, যার সামগ্রিক বার্ষিক মূল্য ৬৪২ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার। এই পরিসংখ্যানগুলো স্পষ্টভাবেই নির্দেশ করে যে, সমজাতীয় জলবায়ু ও ভৌগোলিক সুবিধা থাকা সত্ত্বেও কেবল ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় আমাদের কৃষকরা প্রতিবেশীদের তুলনায় বহুলাংশে পিছিয়ে আছেন।

বাংলাদেশের কৃষকদের এই দীর্ঘস্থায়ী পশ্চাৎপদতার পেছনে বেশ কিছু গভীর অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত কারণকে চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থার প্রতিবেদন মতে, বাংলাদেশে কৃষি জমির মাত্রাতিরিক্ত খণ্ডীকরণ সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে। পারিবারিক উত্তরাধিকার সূত্রে জমিগুলো এত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশে বিভক্ত হয়ে পড়েছে যে সেখানে আধুনিক ভারী কৃষিযন্ত্রের কার্যকর বাণিজ্যিক ব্যবহার অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু-সহনশীল উন্নত বীজের অভাব, আধুনিক সেচপ্রযুক্তির ধীরগতির বিস্তার এবং কৃষকের সরাসরি বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য। দেশের অভ্যন্তরে ফসল তোলার পর তা দ্রুত ও নিরাপদে সংরক্ষণের জন্য বিশেষায়িত কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগারের চরম সংকট রয়েছে। দুর্বল পরিবহন ও ত্রুটিপূর্ণ বিপণন ব্যবস্থার কারণে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ পচনশীল ফসল নষ্ট হয়, যার প্রত্যক্ষ লোকসান বহন করতে হয় মাঠের কৃষককে। এছাড়া কৃষকদের মধ্যে প্রচলিত ধান চাষের ওপর অতিরিক্ত মাত্রায় নির্ভর করার প্রবণতা রয়েছে। লাভজনক বহুমুখী ফসল, অর্থকরী তেলবীজ কিংবা উচ্চমূল্যের হর্টিকালচার পণ্যের দিকে না গিয়ে কেবল চিরাচরিত ধান উৎপাদনে আবদ্ধ থাকার ফলে সামগ্রিক মূল্য সংযোজন প্রত্যাশিত হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে না।

কৃষি খাতের এই শ্লথগতি নিয়ে দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরাও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। প্রখ্যাত কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলমের মতে, বাংলাদেশের কৃষি এখনো অনেকটাই কায়িক শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়ে গেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের সমন্বিত বিপ্লব। তিনি উল্লেখ করেন যে, মাঠে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার অত্যন্ত সীমিত এবং প্রান্তিক কৃষকদের এই সমস্ত আধুনিক যন্ত্রপাতি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও দক্ষতার প্রচণ্ড ঘাটতি রয়েছে। যেসব কাজ অন্যান্য দেশে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র দিয়ে অল্প সময়ে ও নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করা হচ্ছে, বাংলাদেশে তা করতে হচ্ছে ঝাঁকে ঝাঁকে দিনমজুর নামিয়ে। ফলে মাঠে মানুষের ভিড় বাড়লেও দিনশেষে পণ্যের উৎপাদন খরচ আকাশচুম্বী হচ্ছে এবং শ্রমের কার্যকর উৎপাদনশীলতা তলানিতে গিয়ে ঠেকছে। তিনি মনে করেন, প্রান্তিক পর্যায়ে প্রযুক্তির রূপান্তর নিশ্চিত করতে হলে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাত থেকেই কৃষকের কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং সহজ শর্তের কৃষিঋণের জোগান বাড়াতে হবে।

অবশ্য সরকারের পক্ষ থেকেও কৃষির এই প্রযুক্তিগত রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করা হচ্ছে। নীতিনির্ধারকদের স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ হলো, প্রযুক্তির অনুপস্থিতির কারণেই একই পরিমাণ ফসল ঘরে তুলতে যেখানে অন্য দেশে সামান্য শ্রমের প্রয়োজন হয়, সেখানে বাংলাদেশে অতিরিক্ত জনশক্তি অপচয় হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানিয়েছেন যে, সরকার কৃষিকে দ্রুত যান্ত্রিকীকরণের আওতায় নিয়ে আসতে বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। তার মতে, যেসব উন্নয়নশীল দেশ কৃষিতে এগিয়েছে, তারা মূলত শ্রমের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে যন্ত্রের ব্যবহার বাড়িয়েছে। বর্তমানে যে পরিমাণ ফসল ফলাতে মাঠে ১০ জন শ্রমিকের কায়িক শ্রম ব্যয় হচ্ছে, আধুনিক প্রযুক্তির সফল সন্নিবেশ ঘটাতে পারলে মাত্র দুজন দক্ষ কর্মী দিয়েই সেই একই উৎপাদন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। সরকার বর্তমানে খামার যান্ত্রিকীকরণ ও আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহারে জোর দিচ্ছে, যা বাস্তবায়িত হলে কৃষি শ্রমিকের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে।

তবে কৃষিতে এই অতিরিক্ত মানুষের জড়ো হওয়ার পেছনে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ব্যর্থতাকেও অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন শীর্ষ অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‌্যাপিড) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাকের মতে, জাতীয় উন্নয়ন প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি অনুসারে শিল্প কারখানা ও আধুনিক সেবা খাতে নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে কৃষির উদ্বৃত্ত শ্রমিককে শুষে নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিগত কয়েক বছরে দেশে কাক্সিক্ষত মাত্রায় শিল্পায়ন না হওয়ায় এবং আনুষ্ঠানিক খাতে নতুন কাজের সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ায় বহু মানুষ জীবিকা নির্বাহের বিকল্প কোনো পথ না পেয়ে বাধ্য হয়ে কৃষিতে আশ্রয় নিয়েছেন। অর্থাৎ কৃষিতে এই বিপুল লোকবলের উপস্থিতি কোনো স্বাভাবিক সমৃদ্ধির লক্ষণ নয়, বরং এটি অর্থনীতির অন্যান্য খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যর্থতার ফলে সৃষ্ট এক ধরনের ছদ্ম বেকারত্ব। কাজের কোনো বিকল্প ক্ষেত্র না থাকায় মানুষ বাধ্য হয়ে অনুৎপাদনশীল জমিতে কায়িক শ্রম বিলিয়ে দিচ্ছেন, যা দিনশেষে মাথাপিছু উৎপাদনশীলতার সূচককে আরও অবনমিত করছে।

কর্মসংস্থানের এই পুঞ্জীভূত কাঠামোগত সংকট নিরসনে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা তুলে ধরেছেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আব্দুর রহমান তরফদার। তিনি জানিয়েছেন, তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ ও কর্মক্ষম করে গড়ে তুলতে ডিজিটাল খাতসহ বিভিন্ন অপ্রচলিত উৎপাদনশীল ক্ষেত্রে বহুমুখী সরকারি প্রশিক্ষণ জোরদার করা হচ্ছে। দেশের বাস্তবতায় রাতারাতি কৃষির বিশাল শ্রমশক্তিকে অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়; তাই কৃষির বিদ্যমান কাঠামোকে অক্ষুণ্ন রেখেই পর্যায়ক্রমে মাঠপর্যায়ে যান্ত্রিকীকরণ ও স্বয়ংক্রিয় রূপান্তরের কাজ চালানো হবে। সরকারের লক্ষ্য হলো ধাপে ধাপে কৃষিকাজের কায়িক চাপ কমিয়ে গ্রামীণ তরুণদের প্রক্রিয়াজাতকরণ ও আধুনিক কৃষি-বাণিজ্যের সাথে যুক্ত করা, যাতে কৃষি থেকে উদ্বৃত্ত হওয়া মানবসম্পদ অন্য কোনো সম্ভাবনাময় খাতে যুক্ত হতে পারে।

পরিশেষে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট যে, কেবল শ্রমিকের সংখ্যা বাড়িয়ে আধুনিক পৃথিবীতে কোনো খাতকে লাভজনক রাখা যায় না। দেশের খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে কৃষি আমাদের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলেও, একে অনগ্রসর ও সস্তা শ্রমের আধার হিসেবে ফেলে রাখার কোনো সুযোগ নেই। খণ্ডিত জমিগুলোকে সমবায় বা প্রাতিষ্ঠানিক চুক্তির আওতায় এনে বৃহৎ পরিসরে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। একই সঙ্গে চিরাচরিত খাদ্যশস্যের বাইরে গিয়ে কৃষকদের বাণিজ্যিক ও বৈচিত্র্যময় চাষাবাদে উৎসাহিত করতে হবে। তবে এর পাশাপাশি নগর ও উপশহরগুলোতে শ্রমঘন উৎপাদনমুখী শিল্পকারখানা এবং ডিজিটাল কর্মসংস্থানের দ্বার উন্মোচন করতে না পারলে কৃষির ওপর এই মানববোঝা কমানো অসম্ভব হবে। কৃষি শ্রমিককে কেবল গায়ের জোরে খাটা দিনমজুর হিসেবে না রেখে দক্ষ প্রযুক্তি পরিচালকে রূপান্তর করতে পারলেই দক্ষিণ এশিয়ার তলানি থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশের কৃষি তার প্রকৃত সম্ভাবনার মুখ দেখতে পারবে।

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category