• শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৪৯ অপরাহ্ন
Headline
এনসিপির পালে নতুন হাওয়া: নাগরিক পার্টিতে নাম লেখালেন ইসহাক, রনি ও কাফি বিচার বিভাগের সংস্কার ও রাজনৈতিক ঐক্য নিয়ে আইনমন্ত্রীর কড়া বার্তা শিক্ষিকাকে জুতাপেটা ও বিএনপি নেতার বহিষ্কার: ভাইরাল ভিডিওর নেপথ্যের আসল ঘটনা কী? প্রেমের টানে সুদূর চীন থেকে কুষ্টিয়ায়: অনলাইনে পরিচয়, অতঃপর পরিণয় হামে ২৪ ঘণ্টায় ৭ শিশুর মৃত্যু, সন্দেহভাজন আক্রান্ত ১২১৫ তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক, কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারণেই কৃত্রিম সংকট: মির্জা ফখরুল গণভোটের রায় ও ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে ১১ দলের প্যাকেজ কর্মসূচি জ্বালানি তেল আমদানির বাড়তি ব্যয় ভোক্তার ঘাড়ে পড়বে না: বাণিজ্যমন্ত্রী ‘যারা গুপ্ত বলে, ১৭ বছর তারাই বিদেশে লুকিয়ে ছিল’: গোলাম পরওয়ারের কড়া সমালোচনা টিকার খরা ও হামের কামড়: বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের অর্জন কি এখন হুমকির মুখে?

মজুতের পাহাড়ে দাঁড়িয়েও পাম্পে হাহাকার: দেশে অকটেন সংকটের নেপথ্য কাহিনী

Reporter Name / ৩ Time View
Update : শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২৬

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে শুরু করে রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকাগুলোর চিত্র এখন অনেকটাই এক। পেট্রোল পাম্পগুলোর সামনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি, চালকদের চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ আর দীর্ঘ অপেক্ষার পর ‘তেল নেই’ বা ‘সামান্য দেওয়া হবে’—এমন ঘোষণায় চরম হতাশা। দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে বলে সরকার বারবার আশ্বস্ত করলেও, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় এর কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। পাম্প মালিকরা বলছেন সরবরাহ কম, আর সাধারণ গ্রাহকরা বলছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত অকটেন। এই ত্রিমুখী অভিযোগ আর অস্পষ্টতার বেড়াজালে আটকে পড়ে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে রাইড শেয়ারিং সেবার সাথে যুক্ত চালক ও ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকদের জন্য এই পরিস্থিতি এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। ঢাকার আসাদগেট থেকে শুরু করে সোনারবাংলা পাম্প—সবখানেই একই হাহাকার।

এই সংকটের বীজ মূলত রোপিত হয়েছিল বিশ্বজুড়ে চলা ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়, তার সরাসরি প্রভাব পড়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে মার্চ মাসে বাংলাদেশ সরকার জ্বালানি তেল রেশনিং করার একটি সাময়িক ঘোষণা দেয়। আর এই ঘোষণাই সাধারণ মানুষের মনে চরম আতঙ্কের জন্ম দেয়। শুরু হয় ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্ক থেকে অতিরিক্ত তেল কিনে মজুত করার প্রবণতা। যার যতটুকু প্রয়োজন, সে তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি তেল কিনে রাখতে শুরু করে। সরকার পরবর্তীতে রেশনিং ব্যবস্থা তুলে নেওয়ার ঘোষণা দিলেও মানুষের মন থেকে সেই আতঙ্ক আর কাটেনি। ফলে পাম্পগুলোতে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি গাড়ির চাপ তৈরি হয়, যা সামাল দিতে গিয়ে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ধস নামে।

তবে কেবল আতঙ্ককেই এই সংকটের একমাত্র কারণ হিসেবে মেনে নিতে নারাজ বাজার বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এর পেছনে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তেল বিক্রয় ও বিতরণ ব্যবস্থাপনার চরম ত্রুটি এবং অদূরদর্শিতা সমানভাবে দায়ী। বিপিসির নিজস্ব তথ্য বিশ্লেষণ করলেই এই দাবির সত্যতা মেলে। দেখা যায়, চলতি বছরের এপ্রিল মাসের প্রথম ১৯ দিনে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫৫ হাজার লিটার বা ৪৩ টন অকটেন কম বিক্রি করেছে বিপিসি, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেশ উদ্বেগজনক। তেল বণ্টনের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে চরম বৈষম্য। বিপিসির অন্যতম বিতরণ কোম্পানি যমুনা অয়েলের ফতুল্লা ডিপোর একটি তথ্যে দেখা যায়, এপ্রিলের প্রথমার্ধে মোট ৭৮টি ডিলার পাম্পের মধ্যে ঢাকা ও এর আশেপাশের মাত্র ২৮টি পাম্প সারা মাসের মোট বরাদ্দের অর্ধেকের বেশি তেল পেয়ে গেছে। অন্যদিকে, ঢাকার বাইরের ৯টিসহ মোট ১০টি পাম্প এক ফোঁটা অকটেনও পায়নি। এই অসম বণ্টনের কারণেই কিছু পাম্পে উপচে পড়া ভিড় এবং দ্রুত তেল ফুরিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে, আর অন্য পাম্পগুলো বাধ্য হয়ে দিনের পর দিন বন্ধ থাকছে।

সরবরাহ ব্যবস্থার এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে দেশে রাতারাতি গড়ে উঠেছে একটি বিশাল অসাধু চক্র। তেল নিয়ে শুরু হয়েছে জমজমাট কালোবাজারি। অনেক মোটরসাইকেল চালক এবং গ্যাসের গাড়ির চালক পাম্পে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে ১২০০ টাকার বা তার বেশি পরিমাণ অকটেন সংগ্রহ করছে। এরপর সেই তেল নিজেদের গাড়ির ট্যাঙ্ক থেকে বের করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায়, যেমন আগারগাঁও বা অন্যান্য পয়েন্টে, প্রকাশ্যে বোতলে ভরে প্রতি লিটার আড়াইশ টাকা বা তারও বেশি দামে বিক্রি করছে। যারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাম্পে লাইনে দাঁড়াতে পারছেন না, তারা বাধ্য হয়েই এই চড়া দামে কালোবাজার থেকে তেল কিনছেন। সরকার এই চক্র ভাঙতে বেশ কিছু অভিযানও পরিচালনা করেছে। গত দেড় মাসে মোবাইল কোর্ট ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে সারা দেশ থেকে পাঁচ লাখ ৭৭ হাজার লিটারের বেশি অবৈধ জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে, যার মধ্যে অকটেনের পরিমাণই প্রায় ৪১ হাজার ৮৪৬ লিটার। তারপরও এই অবৈধ মজুতদারি ও কালোবাজারি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।

দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন এবং বেসরকারি রিফাইনারিগুলোর ভূমিকাও এই সংকটে একটি বড় প্রভাব ফেলেছে। দেশে উৎপাদিত অকটেনের একটি বড় অংশ আসে একুয়া রিফাইনারিসহ বেশ কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে। সংকট শুরুর পর সরকার এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে তেল মজুত রাখার পরামর্শ দিয়েছে। একুয়া রিফাইনারির পরিচালক ইরসাদ হোসেনের মতে, সরকার হয়তো ভবিষ্যৎ দীর্ঘমেয়াদি সংকটের কথা মাথায় রেখে এই বেসরকারি স্টোরেজগুলোকে বাফার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। তবে মার্চ মাসে যখন আন্তর্জাতিক বাজারের কারণে সরকার বেশি তেল চাচ্ছিল, তখন অনেক রিফাইনারি ঠিকমতো ডেলিভারি দিতে ব্যর্থ হয়। আবার এপ্রিলে যখন তারা বেশি তেল দিতে চাইছে, তখন সরকার তা নিচ্ছে না। এই সমন্বয়হীনতার কারণে মজুত থাকলেও তা সঠিক সময়ে সঠিক স্থানে পৌঁছাচ্ছে না।

সার্বিক এই পরিস্থিতি নিয়ে সরকার ও বিপিসির অবস্থান বরাবরই এক। জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সংসদে ও সংবাদমাধ্যমে বারবার জোর দিয়ে বলেছেন যে, দেশে তেলের কোনো সংকট নেই। তার দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে বিপিসির হাতে ২৫ হাজার ৪২৩ টন অকটেনের মজুত রয়েছে, যা দিয়ে আগামী দেড় মাস অনায়াসে চলা সম্ভব। এর বাইরে আরও ২৭ হাজার টন অকটেনবাহী একটি বিশাল জাহাজ ইতিমধ্যে বাংলাদেশের জলসীমায় এসে পৌঁছেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সরকার প্রতিদিন ২০ শতাংশ অকটেন, ১০ শতাংশ পেট্রোল এবং ১০ শতাংশ ডিজেলের সরবরাহ বাড়ানোর সুস্পষ্ট নির্দেশনাও দিয়েছে। মন্ত্রীর মতে, পাম্পগুলোতে যে সমস্যা হচ্ছে তা মূলত আতঙ্কিত মানুষের অতিরিক্ত কেনার কারণে। একটি পাম্পের জন্য বরাদ্দকৃত ২৪ ঘণ্টার তেল যখন মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে বিক্রি হয়ে যায়, তখন পরবর্তী সরবরাহের আগ পর্যন্ত পাম্প বন্ধ রাখা ছাড়া মালিকদের আর কোনো উপায় থাকে না। তিনি এই সংকট সমাধানে জনগণকে সচেতন হওয়ার এবং কালোবাজারি রোধে সবাইকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

তবে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম সরকারের এই যুক্তির সাথে একেবারেই একমত নন। তিনি মনে করেন, পুরো সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর সরকারের কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণই নেই। পাম্প মালিকরা বলছেন তারা তেল পাচ্ছেন না, আর সরকার বলছে তেল আছে—এই দুই বক্তব্যের মাঝখানে যে অস্বচ্ছতা রয়েছে, তার দায়ভার বিপিসিকেই নিতে হবে। ড. আলমের মতে, পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার মতো বৃহৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো এই সংকটকালীন মুহূর্তে তাদের যথাযথ দায়িত্ব পালনে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। যদি সত্যিই পর্যাপ্ত তেল মজুত থাকে এবং তা সত্ত্বেও মানুষ তেল না পায়, তবে বুঝতে হবে মাঝপথে কেউ এই তেল কালোবাজারে পাচার করছে অথবা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ফায়দা লুটছে। সরকার তার নিজস্ব ব্যবস্থাপনা ত্রুটি আড়াল করতেই জনগণের ওপর দায় চাপাচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।

বর্তমানে অনেক পাম্পেই দেখা যাচ্ছে অদ্ভুত এক রেশনিং ব্যবস্থা। সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে রেশনিং তুলে নিলেও, পাম্পগুলো নিজেদের মতো করে নিয়ম চালু করেছে। প্রাইভেটকারগুলোকে সর্বোচ্চ দুই হাজার টাকার বা ২০ লিটার এবং মোটরসাইকেলগুলোকে বারোশ টাকার বা ৫ লিটার অকটেন দেওয়া হচ্ছে। এর মাঝেও পাম্পকর্মীদের বাড়তি কিছু টাকা ‘উৎকোচ’ বা বকশিশ দিলে বেশি তেল পাওয়ার অলিখিত নিয়মও চালু রয়েছে কোথাও কোথাও। এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, তেলের বাজার এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণহীন।

পাম্প মালিকদের সংগঠনের নেতারা এই অচলাবস্থা কাটানোর জন্য একটি ভিন্ন ও বাস্তবসম্মত সমাধানের কথা বলছেন। তাদের মতে, সরকার যদি রেশনিংয়ের চিন্তা বাদ দিয়ে টানা এক সপ্তাহ দেশের প্রতিটি পাম্পে তাদের চাহিদার সম্পূর্ণ তেল একযোগে সরবরাহ করে, তবে সাধারণ মানুষের মন থেকে ‘তেল ফুরিয়ে যাওয়ার’ আতঙ্ক একেবারেই কেটে যাবে। মানুষ যখন দেখবে যেকোনো সময় পাম্পে গেলেই তেল পাওয়া যাচ্ছে, তখন তারা আর অতিরিক্ত তেল মজুত করবে না এবং কালোবাজারিরাও তাদের ব্যবসা গোটাতে বাধ্য হবে। তবে এর আগ পর্যন্ত, ঢাকার রাজপথে পাম্পের সামনে অন্তহীন অপেক্ষা যেন থামছেই না। একদিকে বিশ্ব পরিস্থিতির দোহাই, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষ, যাদের কাছে ‘পর্যাপ্ত মজুত আছে’ কথাটি এখন কেবলই এক নির্মম পরিহাস ছাড়া আর কিছুই নয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category