দীর্ঘ ৪২ বছরের রাজনৈতিক বঞ্চনা, আশ্বাস আর টানাপোড়েনের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে দেশের প্রশাসনিক মানচিত্রে যুক্ত হতে যাচ্ছে বহুল কাঙ্ক্ষিত ‘কুমিল্লা বিভাগ’। সম্প্রতি কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার লক্ষ্মীপুর বাজার মাঠে এক বিশাল জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই বিভাগের বিষয়ে চূড়ান্ত সবুজ সংকেত দিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে আটকে থাকা এই দাবিটি বাস্তব রূপ পাওয়ায় বৃহত্তর কুমিল্লা অঞ্চলে এখন বইছে উৎসবের আমেজ। জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী প্রস্তাবিত এই নতুন বিভাগটি বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চল ভেঙে গঠিত হবে, যেখানে থাকছে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী এবং লক্ষ্মীপুর জেলা। জাতীয় সংসদে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দেওয়া তথ্যমতে, এই ছয় জেলার বিশাল ভৌগোলিক অঞ্চল নিয়ে কুমিল্লা এবং ফরিদপুর নামে দুটি নতুন বিভাগ গঠনের চূড়ান্ত প্রস্তাব এখন প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) আসন্ন বৈঠকে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
তবে এই নতুন বিভাগের পথচলা এবং সীমানা নির্ধারণ নিয়ে দেশের ভেতরে বেশ কিছু ভূরাজনৈতিক সমীকরণ ও বিতর্কও রয়েছে। জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বিগত সরকারের আমলে এই বিভাগের নাম ‘মেঘনা’ রাখার প্রস্তাব করা হলেও কুমিল্লার মানুষের তীব্র আপত্তির মুখে তা আলোর মুখ দেখেনি। এবার নিজস্ব পরিচয়ে অর্থাৎ ‘কুমিল্লা’ নামেই বিভাগ হচ্ছে—এতে স্থানীয়রা উচ্ছ্বসিত হলেও প্রস্তাবিত অন্য জেলাগুলোর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। বিশেষ করে বৃহত্তর নোয়াখালীর অধিকারকর্মীদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল আলাদা নোয়াখালী বিভাগের, অন্যদিকে ফেনী জেলার একাংশ চট্টগ্রাম বিভাগের সাথেই থেকে যাওয়ার পক্ষে মত প্রকাশ করে আসছে। তা সত্ত্বেও, প্রশাসনিক সুবিধা ও অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে সরকার এই ছয় জেলাকে নিয়েই কুমিল্লা বিভাগ চূড়ান্ত করতে যাচ্ছে। সংসদে কুমিল্লা-৫ আসনের সংসদ সদস্য জসিম উদ্দিন তাঁর আবেগময় বক্তব্যে উল্লেখ করেন, শতভাগ ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ চার দশক শুধু রাজনৈতিক কারণে কুমিল্লার এই ন্যায্য অধিকার থেকে মানুষকে বঞ্চিত রাখা হয়েছিল।
বিভাগ ঘোষণার পাশাপাশি বৃহত্তর কুমিল্লাকে ঘিরে সরকারের বিশাল অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত মহাপরিকল্পনার কথাও উঠে এসেছে। মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানিয়েছেন, কুমিল্লা শুধু ইতিহাস আর ঐতিহ্যের শহরই নয়, এটি দেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক হাব। এই অঞ্চল থেকে প্রতিদিন প্রচুর কৃষিপণ্য দেশের বিভিন্ন স্থানে যায় এবং বিদেশেও রপ্তানি হয়। অঞ্চলটির এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সরকার যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে। কুমিল্লাকে পুনরায় ‘শিক্ষানগরী’ হিসেবে গড়ে তুলতে প্রধানমন্ত্রী খুব দ্রুতই একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছেন। এর পাশাপাশি প্রশাসনিক কাঠামোগত পরিবর্তনে বুড়িচংয়ের ঐতিহাসিক ময়নামতি ইউনিয়নকে একটি পূর্ণাঙ্গ উপজেলা হিসেবে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে ময়নামতিতে বিদ্যুৎ বিভাগের প্রায় ৫০ একর পরিত্যক্ত জমিতে একটি নতুন এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (ইপিজেড) বা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল গড়ে তোলার মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বৃহত্তর কুমিল্লা অঞ্চলের লাখো বেকারের কর্মসংস্থানের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
উন্নয়নের এই রূপরেখা শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ নেই, মাঠ পর্যায়েও এর বাস্তবায়ন শুরু হয়ে গেছে। বরুড়ার জনসভা শেষেই প্রধানমন্ত্রী ছুটে যান চাঁদপুরে। সেখানে তিনি শাহরাস্তির খোরদখাল এবং সদরের ডাকাতিয়া-সংলগ্ন বিষখালী নদী পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করেন। এছাড়া কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে সরকার গঠনের মাত্র দশ দিনের মাথায় দেশের ১২ লাখ প্রান্তিক কৃষকের কৃষিঋণ মওকুফ করার মতো এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে, শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক বিভাগ নয়, বরং পুরো মধ্য-পূর্বাঞ্চলের অর্থনীতি, শিক্ষা ও শিল্পায়নে এক বিশাল পরিবর্তনের পূর্বাভাস দিচ্ছে নতুন এই কুমিল্লা বিভাগ।
তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ ২৪