• শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫০ অপরাহ্ন
Headline
নবীজির স্মৃতিধন্য জলপাই বাগান দখলে ইসরাইলিরা যত্ন অর্থনীতি বা ‘কেয়ার ইকোনমি’: বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত বাই দ্য রিভারস অব ব্যাবিলন – ৩ এনসিটিবির উপসচিব-সদস্যসহ আরও ৪ কর্মকর্তাকে বদলি তাহসিফের মৃত্যুতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাফিলতি রয়েছে: জামায়াত সশস্ত্র বাহিনী বোর্ডের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, আবেদন ফি ১৬৮ টাকা রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি সরবরাহ শুরু খাদ্যশস্য সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়াতে টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে: খাদ্যমন্ত্রী মানবতাবিরোধী অপরাধে হানিফের মৃত্যুদণ্ড, অপর তিন আসামির আমৃত্যু কারাদণ্ড চার বছরে ২ কোটি ৪০ লাখ কৃষক কার্ড দেবে সরকার

মালদ্বীপে ডলার সংকটের মুখে প্রবাসী শ্রমিকের সুরক্ষা: সক্রিয় কূটনীতিতে নতুন আর্থিক অংশীদারিত্বের সন্ধানে বাংলাদেশ

Reporter Name / ৯২ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ভারত মহাসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপে তীব্র হয়ে ওঠা বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি ও ডলার সংকট দেশটিতে কর্মরত হাজার হাজার অভিবাসী শ্রমিকের আয় এবং বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রক্রিয়াকে এক নজিরবিহীন ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে| এমন এক নাজুক পরিস্থিতিতে শুধু গতানুগতিক কনস্যুলার সেবার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে নিজেদের প্রবাসী কর্মীদের স্বার্থরক্ষা, ব্যাংকিং মাধ্যমে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ স্বাভাবিক রাখা এবং দ্বিপাক্ষিক আর্থিক বন্ধন মজবুত করতে এক দূরদর্শী ও বহুমুখী অর্থনৈতিক কূটনীতি নিয়ে মাঠে নেমেছে বাংলাদেশ| মালদ্বীপের সার্বিক অর্থনীতিতে চলমান এই জটিল মুদ্রাস্ফীতি ও তারল্য সংকটকে নীতিনির্ধারকরা কেবল একটি সংকট হিসেবে দেখছেন না, বরং এটিকে দেখছেন সক্রিয় অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং কৌশলগত দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার এক আধুনিক মডেল গড়ে তোলার কার্যকর সুযোগ হিসেবে|
মালদ্বীপ মনিটরি অথরিটির (এমএমএ) সর্বশেষ সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, দ্বীপরাষ্ট্রটি থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে পরিমাণ প্রবাসী আয় বাইরে যায়, তার একক বৃহত্তম গন্তব্য হচ্ছে বাংলাদেশ| মোট বহির্গামী রেমিট্যান্সের সিংহভাগ অর্থাৎ প্রায় ৭২ শতাংশই যায় বাংলাদেশে, যার মোট আর্থিক মূল্য ১১২ মিলিয়ন বা ১১ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলারেরও বেশি| মালদ্বীপের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই ইতিবাচক অর্জনের পেছনে বাংলাদেশ ও মালদ্বীপ সরকারের যৌথ সমন্বয়, বাংলাদেশ দূতাবাসের নিরবচ্ছিন্ন সচেতনতামূলক প্রচার এবং এনবিএল মানি ট্রান্সফার (মালদ্বীপ) প্রাইভেট লিমিটেডের মতো বৈধ আর্থিক চ্যানেলের কার্যকর উপস্থিতির ভূয়সী প্রশংসা করেছে| তবে এই ইতিবাচক ভিত্তির বিপরীতে বর্তমানে স্থানীয় বাজারে ডলারের তীব্র আকাল এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যা সাধারণ ব্যাংকিং খাতের সীমানা পেরিয়ে সরাসরি হাজার হাজার বাংলাদেশি শ্রমিকের রক্ত-ঘামে অর্জিত মাসিক আয়ের প্রকৃত মূল্যের ওপর মারাত্মক আঘাত হানছে|
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ২০২৬ সালের সর্বশেষ মূল্যায়ন অনুযায়ী, বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র সংকট, বাহ্যিক অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক রিজার্ভের ওপর বাড়তে থাকা অব্যাহত চাপই এখন মালদ্বীপের অর্থনীতির মূল মাথাব্যথা| পর্যটন খাতের ওপর ভর করে দেশটি সংকট সামাল দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালালেও বিশ্ববাজারে ক্রমাগত চড়া আমদানি ব্যয় এবং বর্তমান আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে যেকোনো ধরনের আকস্মিক বাহ্যিক ধাক্কা মোকাবেলায় দেশটির অর্থনীতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হয়ে পড়েছে| বৈদেশিক মুদ্রা সংকটের এই কঠোর বাস্তবতার সবচেয়ে নির্মম প্রকাশ ঘটেছে দেশটির সরকারি মুদ্রা বিনিময় হার এবং অবৈধ কার্ব বা সমান্তরাল মুদ্রাবাজারের মধ্যকার বিপুল ব্যবধানে| সরকারিভাবে প্রতি মার্কিন ডলারের দর ১৫ থেকে ১৬ মালদ্বীভিয়ান রুফিয়ায় স্থির রাখা হলেও খোলা বাজারে ডলারের বিনিময় মূল্য অনেক বেশি| এর প্রত্যক্ষ শিকার হচ্ছেন স্থানীয় রুফিয়ায় বেতন পাওয়া বাংলাদেশি শ্রমিকরা| দীর্ঘদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পর রুফিয়াকে ডলারে রূপান্তর করে দেশে পাঠাতে গিয়ে এই বড় ধরনের মুদ্রামান বৈষম্যের কারণে তাঁদের কষ্টার্জিত বেতনের একটি বিরাট অংশ কার্যত বাষ্পীভূত হয়ে যাচ্ছে|
এই মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঠেকাতে রাজধানী মালেতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস প্রথাগত কাজের বাইরে এসে মূল সমস্যার শেকড়ে পৌঁছানোর জন্য সক্রিয় উদ্যোগ নিয়েছে| সমস্যাটির সামগ্রিকতা অনুধাবন করতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার ব্যক্তিগতভাবে মালদ্বীপে কার্যরত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর শীর্ষ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে একের পর এক বৈঠক করেছেন| একই সঙ্গে মালদ্বীপের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এমএমএ এবং দেশটির সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক পর্যায়ের সাথেও নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে| এসব পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনার পর দূতাবাস এই বাস্তব সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, সমস্যাটি কিন্তু বৈধ রেমিট্যান্স চ্যানেলের ঘাটতি নয়| কারণ এনবিএল মানি ট্রান্সফারের মতো প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি সেখানে আগে থেকেই শক্ত অবস্থানে রয়েছে| মূল সমস্যা হলো খোলা বাজারে ডলারের সামগ্রিক অপর্যাপ্ততা বা তারল্য সংকট| সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক কর্মকর্তারা অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে উল্লেখ করেছেন যে, নতুন কোনো ব্যাংক বা শাখা খুলে হয়তো সেবার পরিধি বাড়ানো যাবে, কিন্তু তা কোনো অবস্থাতেই স্থানীয় বাজারে ডলারের জোগান তৈরি করতে পারবে না|
এই বাস্তবভিত্তিক মূল্যায়ন বাংলাদেশ সরকারকে এমন এক কৌশলের দিকে নিয়ে গেছে যা একাধারে আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং প্রবাসী শ্রমিকের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেয়| এটি মূলত বর্তমান সরকারের শ্রম কূটনীতির একটি গভীর রূপান্তরকে সামনে এনেছে, যেখানে প্রবাসীদের আর শুধু রেমিট্যান্সের উৎস হিসেবে নয়, বরং বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উপস্থিতির মূল প্রতিনিধি হিসেবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে| এই নীতির আওতায় কেবল পাসপোর্টের হেফাজত নয়, বরং শ্রমিকের আয়ের আর্থিক মান সুরক্ষা করাকেও সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে| মাঠপর্যায়ে দূতাবাস এখন নিয়মিত বাংলাদেশি কর্মী ও তাদের নিয়োগকর্তাদের সাথে বৈঠক করছে এবং যেসব প্রতিষ্ঠানে আইনগত ও ব্যবহারিকভাবে সম্ভব, সেখানে ডলার-সংযুক্ত বেতন কাঠামো নির্ধারণ অথবা অনুমোদিত চ্যানেলে শ্রমিকদের জন্য ডলারের সংস্থান করতে মালিকদের উৎসাহিত করছে|
দীর্ঘমেয়াদে এই সংকটের স্থায়ী উত্তরণ এবং ভবিষ্যতে এমন মুদ্রাবাজারের ধাক্কা প্রতিহত করতে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা নিয়ে অগ্রসর হওয়া হচ্ছে| প্রথমত, বাংলাদেশ ব্যাংক ও মালদ্বীপ মনিটরি অথরিটির মধ্যে উচ্চপর্যায়ের টেকনিক্যাল সংলাপের মাধ্যমে বাংলাদেশি কর্মীদের পাঠানো বৈধ রেমিট্যান্সের নিশ্চিত নিষ্পত্তির উপায় খোঁজা| এর অংশ হিসেবে তৃতীয় কোনো মুদ্রার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে সরাসরি রুফিয়া থেকে বাংলাদেশি টাকায় (MVR-to-BDT) স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন নিষ্পত্তি করা যায় কি না, তার কারিগরি সম্ভাব্যতা খতিয়ে দেখা| দ্বিতীয়ত, মালদ্বীপের জাতীয় মুদ্রানীতি অক্ষুণ্ন রেখেই বিদেশি শ্রমিকদের পাঠানো বৈধ আয়ের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ ডলার বা বৈদেশিক মুদ্রার বরাদ্দ নিশ্চিত করার একটি আইনি পথ তৈরি করা|
তৃতীয়ত, নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ কর্তৃক শ্রমিকদের ডলার-ভিত্তিক বেতনের নিশ্চয়তা দেওয়া বা ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলার কিনে দেওয়ার মাধ্যমে সমান্তরাল কার্ব মার্কেটের চাপ কমানো| চতুর্থত, দুই দেশের মধ্যে সামগ্রিক ব্যাংকিং সংযোগ আরও সুসংহত করা, তবে নীতি বিশ্লেষকদের মতে ব্যাংকের শাখা বাড়ানো এবং বাজারে ডলার সরবরাহ বৃদ্ধি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয় হওয়ায় দুটিকে আলাদা দৃষ্টিকোণ থেকে সামলানো| পঞ্চমত ও শেষ পর্যন্ত, বাণিজ্যের অর্থ পরিশোধ, আধুনিক আর্থিক প্রযুক্তি বা ফিনটেক এবং কাঠামোগত অর্থায়নের মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে বিস্তৃত করা| এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ অর্থনৈতিক সমীক্ষার ওপর ভিত্তি করে কৌশলগত কারণে মালদ্বীপের জন্য একটি বিশেষ ‘লাইন অব ক্রেডিট’ বা সহজ শর্তের ঋণসুবিধা চালুর বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে|
শুধু আর্থিক কাঠামোর সুরক্ষাই নয়, মালদ্বীপে অবস্থানরত বিপুলসংখ্যক অনিবন্ধিত বাংলাদেশিকে বৈধতা দেওয়া, অভিবাসী শ্রমিকের সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং নতুন কর্মসংস্থানের পথ উন্মুক্ত করার ধারাবাহিক কূটনৈতিক পদক্ষেপের অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপগুলোকে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে| নীরবে অথচ বাস্তবসম্মত কূটনীতি পরিচালনার মাধ্যমে বাংলাদেশ দূতাবাস এখন প্রবাসী শ্রমিক, মালদ্বীপ সরকার এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাঝে এক অবিচ্ছেদ্য সেতুবন্ধনে পরিণত হয়েছে| অন্যের কাছে একতরফা কোনো বিশেষ সুযোগ বা করুণা দাবি না করে স্থানীয় অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতাকে উপলব্ধি করে সহযোগিতামূলক সমাধানের যে আধুনিক পথ বাংলাদেশ দেখাচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক শ্রম কূটনীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত| এর তাৎক্ষণিক লক্ষ্য কষ্টার্জিত আয়ের অপচয় রোধ করে শ্রমিকদের অর্থ নিরাপদে পরিবারে পৌঁছে দেওয়া হলেও, চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে দুই দেশের মধ্যে একটি টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক মৈত্রী স্থাপন করা|
তথ্যসূত্র: টাইমস অব বাংলাদেশ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category