যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন হঠাৎ করে কোনো যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করতে পারে—এমন গভীর আশঙ্কা থেকে ইরানের বিরুদ্ধে নিজেদের সামরিক অভিযান আরও ত্বরান্বিত করার পরিকল্পনা নিয়েছে ইসরায়েল। আম্মান থেকে রব ম্যাকব্রাইডের পাঠানো এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন সমীকরণ। প্রকাশ্যে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ ইসরায়েলি কর্মকর্তারা মার্কিন মিত্রদের সঙ্গে ঐক্যের সুর বজায় রাখলেও, পর্দার আড়ালে তারা হোয়াইট হাউসের এই আকস্মিক কূটনৈতিক তৎপরতা নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন।
ইসরায়েলি নীতিনির্ধারকদের সবচেয়ে বড় ভয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের এই আকস্মিক কূটনীতির ফলে তাদের অত্যাবশ্যকীয় জাতীয় স্বার্থ এবং চূড়ান্ত সীমা বা ‘রেড লাইন’ লঙ্ঘিত হতে পারে।
শাসনব্যবস্থা টিকে থাকার শঙ্কা: যুদ্ধ শেষে ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা ক্ষমতায় বহাল থাকবে কি না, তা নিয়ে তেল আবিবের গভীর উদ্বেগ রয়েছে।
স্ন্যাপ সিজফায়ার বা আকস্মিক যুদ্ধবিরতি: হোয়াইট হাউসের বর্তমান কূটনৈতিক অস্থিরতায় যেকোনো মুহূর্তে একটি আকস্মিক যুদ্ধবিরতি বা ‘স্ন্যাপ সিজফায়ার’ ডাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছে না ইসরায়েল।
কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন: মার্কিন সংবাদমাধ্যমে উদ্ধৃত ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মতে, কোনো সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার আগেই কৌশলগত লক্ষ্যগুলো নিশ্চিত করার জন্য আগামী কয়েক দিনে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হবে।
এই অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যেই ইসরায়েল নিজেদের সামরিক প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতি কেবল ইরানের মূল ভূখণ্ডের লড়াইকেই নয়, বরং লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক পরিকল্পনায়ও সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
সামরিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধির অংশ হিসেবে ইসরায়েল সরকার রিজার্ভ সেনার সংখ্যা বর্তমান ২ লাখ ৮০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এই বিপুলসংখ্যক অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের বিষয়টি স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সামনের দিনগুলোতে লেবানন ও ইরান উভয় ফ্রন্টে সংঘাতের পরিধি আরও ব্যাপক ও ভয়াবহ হতে যাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ইতিমধ্যে লেবানন সীমান্তসংলগ্ন শহরগুলোর মেয়র এবং স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে তাঁদের মনোবল বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, মিত্রদের সঙ্গে আলোচনা চললেও ইসরায়েল তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যেকোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে পিছপা হবে না।
ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বর্তমান অনড় অবস্থানের কারণে এই শান্তি আলোচনা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হতে পারে। তবে কোনো ঝুঁকি না নিয়ে তারা প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগাতে চাইছেন। মূলত লিতানি নদীর ওপারে হিজবুল্লাহর অবস্থান এবং ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ওপর চূড়ান্ত আঘাত হানার লক্ষ্যেই এই ‘ত্বরান্বিত অভিযান’ পরিচালনা করা হচ্ছে। যদি কোনো কারণে যুক্তরাষ্ট্র আকস্মিক যুদ্ধবিরতির ঘোষণাও দেয়, তার আগেই ইসরায়েল শত্রুপক্ষের সর্বোচ্চ ক্ষতি করে নিজেদের অবস্থান মজবুত করতে চায়। ইসরায়েলের এই দ্বিমুখী কৌশলের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের তীব্রতা কমার বদলে আরও বৃদ্ধির ঘোর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।