মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিধ্বস্ত প্রাঙ্গণে শান্তির সুবাতাস বইয়ে দিতে জোর তৎপরতা শুরু করেছেন আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীরা। আগামী বৃহস্পতিবারের মধ্যেই চিরবৈরী দুই রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের এক টেবিলে বসানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে তুরস্ক, মিশর এবং পাকিস্তান। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটাতে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে দেওয়া মধ্যস্থতার প্রস্তাবটি ইতিমধ্যেই বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে। এমনকি খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই উদ্যোগের প্রতি তার ইতিবাচক সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। তবে এত সব আশার আলোর মধ্যেও একটি বড় শঙ্কা রয়েই গেছে; আর তা হলো, যুদ্ধ বন্ধের ইস্যুতে দুই পক্ষের বর্তমান অবস্থান এবং শর্তের মধ্যে এখনো যোজন যোজন দূরত্ব বিদ্যমান।
যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে তেহরানের কাছে সম্প্রতি ১৫ দফার একটি দীর্ঘ রূপরেখা পাঠানো হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এই শান্তি পরিকল্পনার মূল ভিত্তিগুলো মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের পুরোনো দাবিগুলোর ওপরই দাঁড় করানো। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপে ইরান যে খুব একটা সন্তুষ্ট, তা কিন্তু নয়। ইরানের এক শীর্ষ সামরিক মুখপাত্র এই উদ্যোগকে রীতিমতো কটাক্ষ করে বলেছেন, যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের ‘কৌশলগত পরাজয়’ আঁচ করতে পেরেই যুক্তরাষ্ট্র এখন সম্মান বাঁচানোর পথ খুঁজছে এবং নিজেদের সঙ্গেই নিজেরা আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তেহরানের এমন কড়া বার্তা বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, আপসের পথটি মোটেও মসৃণ নয়।
শান্তি প্রতিষ্ঠার এই উদ্যোগে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যের মিত্ররাই। ট্রাম্প প্রশাসন যখন দ্রুত একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছে, তখন উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর মধ্যে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের শীর্ষ নেতারা ট্রাম্পের ওপর প্রবল মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করছেন। তাদের সুস্পষ্ট চাওয়া হলো, ইরানকে আর্থিকভাবে এবং সামরিক দিক থেকে পুরোপুরি দুর্বল ও পঙ্গু না করা পর্যন্ত এই সামরিক অভিযান যেন কোনোভাবেই বন্ধ না হয়। মিত্রদের এই অনড় অবস্থানের কারণে ট্রাম্পের শান্তি উদ্যোগ এক ধরনের উভয়সংকটে পড়েছে।
একদিকে যখন শান্তির আলোচনা চলছে, অন্যদিকে তখন যুদ্ধের ডামাডোলও বেশ জোরেসোরেই বাজছে। পেন্টাগন সূত্রে জানা গেছে, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানকে আরও জোরদার করতে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর এলিট ফোর্স ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের প্রায় তিন হাজার চৌকস সেনাসদস্যকে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। যদিও সরাসরি ইরানের মাটিতে মার্কিন পদাতিক বাহিনী প্রবেশ করবে কি না, সে বিষয়ে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। এর মধ্যেই আবার উপসাগরীয় দেশগুলোর আকাশসীমায় নতুন করে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। বেশ কয়েকটি দেশ জানিয়েছে যে, তারা অজ্ঞাত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে। এমনকি কুয়েতের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মতো অত্যন্ত সুরক্ষিত এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাতেও এ ধরনের হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তাহীনতাকে আরও প্রকট করে তুলেছে।
যুদ্ধের এই টানাপোড়েন এবং শান্তি আলোচনার খবরের সরাসরি প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান সূচক তেলের বাজারে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেশ লক্ষণীয়ভাবে কমে এসেছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৫ ডলারের নিচে নেমে গেছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। এদিকে, মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও ট্রাম্পের ইরান নীতি নিয়ে ক্ষমতার লড়াই স্পষ্ট। ট্রাম্প যাতে ইরানে তার সামরিক অভিযান নিজের ইচ্ছামতো চালাতে না পারেন, সেজন্য মার্কিন সিনেটে তৃতীয়বারের মতো একটি আইনি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিনেট সেই প্রস্তাবটিও নাকচ করে দিয়েছে। এর ফলে ইরানে সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আপাতত আইনি বাধা থেকে মুক্তই থাকছেন।