প্রশান্ত, ভারত এবং আর্কটিক মহাসাগরের সুবিশাল তলদেশ জুড়ে ব্যাপকভাবে মানচিত্র তৈরি ও নজরদারির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে চীন। বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে একে নিছকই জলবায়ু ও সামুদ্রিক পরিবেশের গবেষণা হিসেবে দাবি করা হলেও, আন্তর্জাতিক নৌ-বিশেষজ্ঞরা একে দেখছেন সম্ভাব্য সাবমেরিন যুদ্ধের এক সুদূরপ্রসারী প্রস্তুতি হিসেবে। তাদের মতে, সমুদ্রের গভীরে লুকিয়ে থাকা ভূপ্রকৃতি, পানির তাপমাত্রা ও লবণাক্ততার মতো সংবেদনশীল তথ্যগুলো সংগ্রহ করার মাধ্যমে চীন মূলত নিজেদের সাবমেরিনগুলোকে নিরাপদে চলাচলের পথ করে দিচ্ছে এবং একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সাবমেরিনগুলো শনাক্ত করার জাল বুনছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের এক দীর্ঘ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চীনের এই সুবিশাল কর্মযজ্ঞে অন্যতম ভূমিকা রাখছে ওশান ইউনিভার্সিটি অব চায়না পরিচালিত ‘ডং ফাং হং-৩’ নামের একটি অত্যাধুনিক জাহাজ। জাহাজটি গত কয়েক বছরে তাইওয়ান, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি গুয়াম এবং ভারত মহাসাগরের অত্যন্ত কৌশলগত এলাকাগুলোতে বারবার চক্কর দিয়েছে এবং জাপানের কাছে পানির নিচে শক্তিশালী সেন্সরও পরীক্ষা করেছে। শুধু এই একটি জাহাজই নয়, গত পাঁচ বছরে অন্তত ৪২টি এমন গবেষণা জাহাজের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, তারা সমুদ্রের তলদেশে চষে বেড়িয়ে নিখুঁত মানচিত্র তৈরি করছে এবং পানির নিচে শত শত সেন্সর স্থাপন করছে।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি মূলত চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ‘সিভিল-মিলিটারি ফিউশন’ বা বেসামরিক ও সামরিক খাতের সমন্বয়ের নীতির একটি নিখুঁত উদাহরণ। সমুদ্রের তলদেশের নিখুঁত ভৌগোলিক জ্ঞান যেকোনো সাবমেরিন কমান্ডারের জন্য অমূল্য অস্ত্র। কারণ পানির নিচের পাহাড়, খাদ, স্রোত বা তাপমাত্রার ওপর ভিত্তি করে শব্দ তরঙ্গের গতিপথ বদলে যায়, যা সোনার সিস্টেমের মাধ্যমে কাজ করে। এই তথ্যগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানা থাকলে শত্রুপক্ষের সাবমেরিন ট্র্যাক করা যেমন সহজ হয়, তেমনি নিজেদের সাবমেরিনকেও রাডারের আড়ালে লুকিয়ে রাখা সম্ভব হয়।
ভৌগোলিক দিক থেকে চীনের এই সমুদ্র-জরিপের পরিধি বেশ উদ্বেগজনক। তারা বিশেষ করে ‘প্রথম দ্বীপশৃঙ্খল’ বা ফার্স্ট আইল্যান্ড চেইনের দিকে বেশি নজর দিচ্ছে, যা মূলত জাপান থেকে তাইওয়ান হয়ে বোর্নিও পর্যন্ত বিস্তৃত এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের কড়া নজরদারিতে রয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই কৌশলগত বলয় ভেঙে প্রশান্ত মহাসাগরে অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত করতে মরিয়া চীন। এর পাশাপাশি হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ ও গুয়ামের মতো মার্কিন ঘাঁটির আশপাশে, ভারত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহ রুট ‘নাইনটি ইস্ট রিজ’-এ এবং আর্কটিক অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে আলাস্কার কাছাকাছি এলাকায় তারা ব্যাপকভাবে তল্লাশি চালিয়েছে।
চীনের এই নজরদারি মিশনের কেন্দ্রে রয়েছে ২০১৪ সালে প্রস্তাবিত ‘স্বচ্ছ মহাসাগর’ নামের একটি বিপুল অর্থায়নের প্রকল্প। এই প্রকল্পের আওতায় সমুদ্রের তলদেশে এমন সব আধুনিক সেন্সর ও বয়া বসানো হচ্ছে, যা শত্রুর সাবমেরিনের গতিবিধির তথ্য বেইজিংকে সরবরাহ করতে সক্ষম। মার্কিন নৌবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন যে, এতোদিন সমুদ্রের তলদেশ সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের যে একচেটিয়া আধিপত্য ও জ্ঞান ছিল, চীনের এই বিস্তৃত উদ্যোগ তা দ্রুত ম্লান করে দিচ্ছে।