• রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬, ০৯:৫৮ পূর্বাহ্ন

ইউনূস আমলে ১২ হাজার কোটি টাকার ঘুষ-রাজত্ব

Reporter Name / ১ Time View
Update : রবিবার, ২৮ জুন, ২০২৬

ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গত বছর যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নের অঙ্গীকার নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, সেই স্বপ্নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি। সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) কর্তৃক প্রকাশিত ‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান সরকারের প্রথম বছরেই দেশের সেবা খাতে ঘুষ লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। এই অংক জাতীয় বাজেটের প্রায় দেড় শতাংশ এবং মোট জিডিপির শূন্য দশমিক ২৩ শতাংশের সমতুল্য। যেখানে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ছিল আকাশচুম্বী, সেখানে ঘুষের এই পরিসংখ্যান যেন সেই স্বপ্নের গায়ে এক বড় চপেটাঘাত।

জরিপটি ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এক বছরের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) নমুনা কাঠামো ব্যবহার করে আটটি বিভাগের ১ হাজার ১৪৯টি এলাকা থেকে সংগৃহীত এই তথ্য দেশের সামগ্রিক দুর্নীতির চিত্রকে এক নিরেট বাস্তবতায় দাঁড় করিয়েছে। দুর্নীতির এই হার ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে মানুষ আশা করেছিল ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা মুখগুলো বদলানোর পাশাপাশি প্রশাসনিক কাঠামোর দুর্নীতিও দূর হবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, ক্ষমতার মুখ বদলেছে, প্রতিশ্রুতির ভাষা বদলেছে, কিন্তু টেবিলের নিচে হাতবদল হওয়া টাকার অংক কমেনি, বরং এর পরিধি বিস্তৃত হয়েছে। রোগ বালাই সারেনি, কেবল বেড়েছে নতুন মোড়কে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুর্নীতির শীর্ষে এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছে পাসপোর্ট অফিস এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। সেবা গ্রহণকারীদের মধ্যে প্রায় ৭৬ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ পাসপোর্ট সেবা নিতে গিয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। বিআরটিএ-তে এই ভোগান্তির হার ৬৩ দশমিক ৫ শতাংশ। এরপরই রয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, কৃষি, ভূমি এবং বিচার বিভাগ। বিশ্লেষকদের মতে, এ খাতগুলোতে খানা প্রতি ঘুষের অংক সবচেয়ে চড়া। একটি চমকপ্রদ কিন্তু উদ্বেগজনক তথ্য হলো, খানা প্রতি গড় ঘুষের পরিমাণ ১০ শতাংশ কমলেও দুর্নীতির শিকার হওয়া পরিবারের হার ১৫ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এর সহজ অর্থ হলো, ঘুষের টাকার পরিমাণ কমলেও ঘুষগ্রহীতার সংখ্যা বা পরিধি বহুগুণ বেড়ে গেছে। দুর্নীতি এখন আর বিশেষ কোনো সুবিধা নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের এক অনিবার্য বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।

সবচেয়ে আতঙ্কের তথ্যটি কেবল সংখ্যাতাত্ত্বিক নয়, বরং তা মানসিকতার পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। জরিপে অংশগ্রহণকারী ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার মনে করে যে, ঘুষ ছাড়া সরকারি সেবা পাওয়া এখন অসম্ভব। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ঘুষ এখন প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হচ্ছেন গ্রামের মানুষ, নারী, আদিবাসী এবং প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী। জরিপের তথ্যমতে, গ্রামে ঘুষের শিকার হওয়ার হার ৬৬ শতাংশ, যেখানে শহরে এই হার ৫৮ দশমিক ৫ শতাংশ। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো তাদের আয়ের অনুপাতে সবচাইতে বেশি মাসুল গুণছে, যা সমাজে বৈষম্যের নতুন এক ক্ষত তৈরি করেছে। এই চিত্র স্পষ্ট করে যে, সংস্কারের যে প্রতিশ্রুতি সরকার দিয়েছিল, তা এখনো কাগজেই বন্দি রয়েছে।

দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো অভিযোগ দাখিল ও বিচার নিশ্চিত করা। কিন্তু টিআইবির জরিপ বলছে, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মধ্যে ৬১ দশমিক ৩ শতাংশ পরিবার অভিযোগই করেনি। এর মূল কারণ ব্যবস্থার ওপর মানুষের চরম অনাস্থা। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সম্পর্কে জানে মাত্র ২৯ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ। আরও শোচনীয় তথ্য হলো, সরকারি অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা ‘জিআরএস’ (GRS) সম্পর্কে জানেন মাত্র দেড় শতাংশেরও কম মানুষ। যারা সাহস করে অভিযোগ করেছেন, তাদের বড় একটি অংশের অভিযোগ সংশ্লিষ্ট দপ্তর গ্রহণই করেনি। ডিজিটাল সেবা চালু করার মাধ্যমে দুর্নীতি কমানোর পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে দালাল চক্র এখনো প্রশাসনিক দপ্তরগুলোর অলিতে-গলিতে বহাল তবিয়তে সক্রিয়।

প্রশ্ন উঠছে, তাহলে পরিবর্তনের যে গল্প সরকার শুনিয়েছিল, সেই গল্পের আসল চিত্রনাট্য কার জন্য লেখা হয়েছিল? অন্তর্বর্তী সরকার যে ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিল, এক বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর সেই স্বপ্নের ঠিকানা আজ বড়ই অস্পষ্ট। চেয়ারে বসা মানুষগুলো বদলেছে, সরকারি কর্মকর্তাদের নাম-পদবি বদলেছে, কিন্তু ঘুষের টেবিলে বসা লোকগুলো এখনো একই রয়ে গেছে। দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটগুলো এখনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতার সুযোগ নিয়ে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রেখেছে। টিআইবির এই জরিপ প্রমাণ করে যে, কেবল শাসনব্যবস্থার রদবদলই যথেষ্ট নয়, যদি না রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়।

১২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকার এই ঘুষের রাজত্ব কেবল একটি সংখ্যামাত্র নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ার সংবাদ। যখন একটি দেশের প্রায় ৮২ শতাংশ মানুষ মনে করে ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না, তখন বুঝতে হবে প্রতিষ্ঠানগুলো অকার্যকর হয়ে পড়েছে। দুর্নীতিবিরোধী এই লড়াই এখন আর কোনো বিশেষ বিভাগের কাজ নয়, এটি সমগ্র রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। সরকার যদি সত্যিই নতুন বাংলাদেশ গড়তে চায়, তবে কেবল বড় বড় সংস্কারের কথা না বলে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়া এবং দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া অপরিহার্য। নতুবা বিপ্লব ও স্বপ্নের এই বাংলাদেশ কেবল ইতিহাস ও স্লোগানেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। সময় ফুরিয়ে আসার আগেই সরকারকে এই ঘুষের অশুভ চক্র ভেঙে ফেলে মানুষের বিশ্বাস ও আস্থা পুনরুদ্ধার করতে হবে। নতুবা এই বিশাল আর্থিক দুর্নীতি ভবিষ্যতে সরকারের সব উন্নয়ন ও ইতিবাচক অর্জনকে ম্লান করে দেবে।

তথ্যসূত্র: দ্যা প্রেস


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category